প্রহসনের নির্বাচন বৈধতা পাবে!

৭ জানুয়ারি, ২০২৪ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। ভোটের পরিবেশ থাকলে ও অংশগ্রহণমূলক ভোট হলে দেশে এখন উৎসব আমেজ থাকার কথা। বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক হওয়ার কথা। প্রার্থীদের বিষয়ে আলোচনায় মুখরিত হওয়া, সরকারের বিগত দিনের কর্মকাণ্ড এবং আগামী দিনে অংশগ্রহণকারী দলসমূহ দেশকে কোন পথে নিতে চায়, সেসব বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এখন পত্রিকায় শিরোনাম হচ্ছে- ‘আসন ভাগাভাগির অপেক্ষায় শরিকরা’। ‘সিট পেতে সরকারের কাছে নতুন আগন্তুকদের ধরনা’। আলোচনায় আসছে ‘ডামি প্রার্থী’, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’। ‘জেল থেকে বেরিয়ে দলবদলের সঙ্গে সরকারদলীয় মার্কা পাওয়া’। ‘নির্বাচনে জিততে নৌকা চান শরিকরা’। বিগত দিনে সরকারকে উদ্ধার করা ‘বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে সাবালক হওয়া কথা বলা’। ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে আলোচিতদের বেহাল অবস্থা। নির্বাচন নিয়ে এরকম শত খবর। জনজীবনের অন্যান্য সংকট অনেক সময় থেকে যাচ্ছে, আলোচনার বাইরে। এর মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ, অবরোধ, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ চলছে নির্বাচন ঘিরে। দেশের রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির নানামুখী তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে নির্বাচন কেন্দ্র করে। জনমনে মূল প্রশ্ন, নির্বাচন হবে কি?  নির্বাচন হলেও চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কি হবে? নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক সংকটের কথা বললেও নিজেদের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে, গণদাবি ও জনমত উপেক্ষা করে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি না করেই তফসিল ঘোষণা করল।

বিজয়ের ৫২ বছর পার হতে চললেও ক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠী এমন নির্বাচনীব্যবস্থা করতে পারেনি, যাতে প্রজাতন্ত্রের মালিকরা নির্বিঘেœ নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন। বিগত দিনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেশ কিছু নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। নিকট অতীতে ২০১৪ ও ২০১৮ এর নির্বাচনের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ভোট নেওয়ার বা দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এ সময়ের নতুন ভোটাররা ভোট দেওয়ার অনুভূতি থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত হয়েছেন। নির্বাচনী প্রহসনের নতুন নতুন মাত্রা দেশবাসী ও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। অথচ ফলাফল ঘোষিত হয়েছে।

দুই. গণতন্ত্রের অন্যতম উপাদান ‘নির্বাচন’। অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, নিরপেক্ষ না হলে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। সর্বত্র জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশ ও মানুষের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। স্বৈরাচার, কর্র্তৃত্ববাদ, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়িত ধারা স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। ভোটাধিকার নিশ্চিত করা তাই গণতন্ত্রের যাত্রা নির্বিঘœ করার জন্যও জরুরি। আমাদের দেশে এই ঐতিহ্যের সহজ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বলা হয় ‘উৎসবের আমেজ’। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের কর্র্তৃত্বের ভিত্তি তৈরি হবে জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমে। নির্ধারিত সময় পরপর এবং প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে’। এজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঢেলে সাজানো, স্ব স্ব দেশের অবস্থা অনুযায়ী করা হয়। তারপরও কিছু সর্বজনীন মানদণ্ড থাকে। যা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের অবস্থান ঠিক করতে পারে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এসব দেশ নিজস্ব স্বার্থ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে তাদের বয়ান ঠিক করে। তারপরও কোনো দেশ সর্বজনীন মানদণ্ড উপেক্ষা করলে যার যার স্বার্থে, ঐ নির্বাচন নিয়ে কথা বলে। বর্তমান বাস্তবতায় যাকে উপেক্ষা করা সহজতর হয় না। এতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় সম্ভাবনা থাকে।

তিন. আমাদের চলমান নির্বাচনব্যবস্থাই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এজন্য আমূল সংস্কারের দাবিতে সংগ্রাম চলছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দক্ষ, দায়িত্ব পালনে সক্ষম নির্দলীয় নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকার প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তন, সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনগুলো প্রধানত সরকারের ইচ্ছার প্রতিফল ঘটানোর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। এবারের নির্বাচন কমিশনের আচরণেও তার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। নানা সময় রাজনৈতিক সংকট ও তা সমাধানের কথা বললেও শেষে বলেছেন, এক শতাংশ ভোট পড়লেও এই নির্বাচন আইনি হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের সাবধান করে বলা হচ্ছে, সিল মারার ভিডিও প্রকাশিত হলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ ‘গায়ে হাত বুলিয়ে নির্বাচন পার করা’র চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ নির্বাচনকালীন তদারকি সরকার গঠনে সরকারের সঙ্গে কথা বলার দাবি থাকলেও নির্বাচন কমিশন কোনো ভূমিকা নেয়নি। বিগত গাইবান্ধা উপনির্বাচনসহ বিভিন্ন উপনির্বাচনে এবং সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘৪৭ সেকেন্ডে ৪৪ ভোট’-এ সিল মারার ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর এদের সক্ষমতা ও কার্যক্রম নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। তবে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে নানা মতের প্রতিফলন, মত-দ্বিমত প্রকাশিত হলেও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বদলির সিদ্ধান্ত কার্যকরের বিষয়টি দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে। এ ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে চেষ্টা করা হবে। এতে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনে নতুন কোনো গ্রহণযোগ্য প্রভাব পড়বে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলা হলে, সরকারের পক্ষ থেকে ‘সংবিধানে নেই’ বলে এটাকে নাকচ করার কথা বলা হয়। অথচ মনে রাখা দরকার, প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করাও সাংবিধানিক। তাই এ দাবিকে অসাংবিধানিক বলে নাকচ করার কোনো যুক্তি নেই।  রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হলে, অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্বলতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তদারকি সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন ও কার্যকর করা মোটেও কঠিন নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা ও বিশ্বাসযোগ্য না করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধারা বহাল রাখতে হবে। এটি ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যাবে না।

চার. সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে, ৪৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৯টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তাহলে অংশগ্রহণমূলক হবে না কেন? এরা কোন ধারার নির্বাচনী রাজনৈতিক দল? এরা প্রধানত ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সহযোগী জোট। এর বাইরে নতুন নতুন তৈরি করা দল বা জোট। তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়া, বিজয়ী হওয়া, ভাগ-বাটোয়ারার জন্য রাখঢাক না করে দ্বারস্থ হচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের সভাপতির কাছে। সচেতন মহল ও দেশবাসী এটাকে দেখছে, এক দল ও তার সহযোগীদের নির্বাচন হিসেবে। একতরফা প্রহসনের নির্বাচন ছাড়া এটিকে নতুন কীই-বা বলার আছে? আছে, যদি এইভাবে ভোট সম্পন্ন হয় ও ফলাফল প্রকাশিত হয় তাহলে ‘একতরফা ও ভাগ-বাটোয়ারার’ নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে। বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, বিরোধী দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ধরপাকড় করতে গিয়ে, তাকে না পেয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের হেনস্তা করার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে চলমান ভয়ের রাজত্ব আরও বাড়িয়ে একতরফা নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে।

পাঁচ. এই নির্বাচনে অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের মতো ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনীতির নীতিহীন সুবিধাবাদী চরিত্রের নতুন নতুন রূপ দেখবে দেশবাসী। এতে হয়তো নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করা যাবে। কিন্তু কোনোভাবেই নির্বাচন নৈতিক ভিত্তি পাবে না। আন্তর্জাতিক মহল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছে। নানাভাবে নজর রাখছে। তারপরও একতরফা প্রহসনের নির্বাচন সংঘটিত হলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে না। নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

সার্বিক বিবেচনায়, এখনই নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন করে, তাদের অধীনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা ছাড়া ঘোষিত ২০২৪ এর ৭ জানুয়ারির ভাগাভাগির একতরফা নির্বাচন অধিকাংশ দেশবাসীর কাছে ও আন্তর্জাতিকভাবে যে নৈতিক বৈধতা পাবে না, তা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়।