নাঈম ইসলাম, সম্প্রতি ৩৩ সেঞ্চুরি করে হয়েছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিয়ান। ভেঙেছেন তুষার ইমরানের ৩২ সেঞ্চুরির রেকর্ড। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০ হাজার রান করা দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার নাঈম। অথচ সবশেষ টেস্ট খেলেছেন ১১ বছর হতে চলল! সিলেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের খেলা শেষে দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমানের সঙ্গে আলাপে এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান জানালেন কিসের নেশায় এখনো খেলছেন পরশ ডোগড়া, প্রিয়াঙ্ক পাঙ্কচাল, ফাইজ ফাজাল এই ক্রিকেটাররা রঞ্জি ট্রফির সর্বোচ্চ সেঞ্চুরিয়ান। এদের মধ্যে ফাইজ ছাড়া আর কেউ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারেননি। তিন ফরম্যাটেই জাতীয় দলে খেলে আপনি কি এ ক্ষেত্রে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন?
নাঈম ইসলাম : হ্যাঁ, অবশ্যই। জাতীয় দলের হয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা তো ভাগ্যের বিষয়। আলহামদুলিল্লাহ, সেই সুযোগ আমার হয়েছে। দেশের হয়ে আমি খেলতে পেরেছি।
২০১২ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে খুলনা টেস্টটি ছিল আপনার শেষ টেস্ট। এই ১১ বছরে ৬০-৭০ জন ক্রিকেটারের অভিষেক হয়েছে। আপনার কি মনে হয় না এর মধ্যে আপনাকে পারফরম্যান্স বিচারে আরও একটিবার সুযোগ দেওয়া যেত!
নাঈম ইসলাম : আমার মনে হওয়া দিয়ে তো কোনো কিছু আসবে-যাবে না। পারফরম্যান্স বিচারের কথা যদি বলেন তাহলে সেগুলোর পরিসংখ্যান তো রয়েছেই। ২০১২ সালের পর থেকে বছরের সর্বোচ্চ স্কোরারদের তালিকা দেখলেই দেখবেন এক-দুইটা বছর ছাড়া আমি সবগুলো মৌসুমেই সেরা দশ রান সংগ্রাহকের মধ্যে ছিলাম।
তাহলে কি নিজেকে কিছুটা দুর্ভাগা মনে হয়?
নাঈম ইসলাম : দুর্ভাগা মনে হয় না। আল্লাহ হয়তো এটাই নিয়তিতে রেখেছেন। যে কটা টেস্ট খেলেছি, ওগুলোই হয়তো নসিবে ছিল। এ জন্যই হয়তো আর টেস্ট খেলা হয়নি।
এনামুল হকের প্রসঙ্গ যদি আনি। এই মৌসুমে রেকর্ড ভাঙা রান করার সুবাদে তিনি জাতীয় দলে ফিরেছেন। আপনার পারফরম্যান্স ধারাবাহিক হলেও চমক জাগানো ব্যাপারটার অভাব বলেই কি এমন হতে পারে?
নাঈম ইসলাম : এটা হতে পারে। একটা নতুন ক্রিকেটার যদি মৌসুমে চারশো রান করে আর আমি যদি সাড়ে চারশো রান করি তাহলে আমার মনে হয় এটা যথেষ্ট না। আমাকে দৃষ্টি কাড়তে হলে নতুন কারও চারশো রানের বিপরীতে অন্তত সাতশো-আটশো রান করতে হবে। তার মানে এই জায়গাতে আমার পারফরম্যান্স আপ টু দ্য মার্ক ছিল না বলেই হয়তো আমি নজর কাড়তে ব্যর্থ হয়েছি। সে জন্যই আমার ডাক আসেনি হয়তো।
আপনাকে তো বেশিরভাগ সময়ই রাজশাহী বা রংপুর বিভাগের দলেই খেলতে দেখা গেছে। এবার খেলেছেন ঢাকা মেট্রো দলে। এটা কীভাবে হলো?
নাঈম ইসলাম : এবার রংপুর বিভাগ আমাকে তাদের ৩০ জনের স্কোয়াডে রাখেনি। তার কারণ পারফরম্যান্স নাকি নতুনদের সুযোগ দেওয়া, সেটা আমি বলতে পারব না। এরপর ঢাকা, ঢাকা মেট্রো এবং সিলেটের সঙ্গে আমার কথা হয়। একটা নতুন দলে খেললে সবাই কমফোর্টের বিষয়টা চিন্তা করে। সেখান থেকে মিজানুর রহমান বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার পরে ঢাকা মেট্রো দলে খেলার বিষয় চূড়ান্ত হয়।
টেস্ট না খেলেও লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটে খেলার মোটিভেশন রাখেন কীভাবে?
নাঈম ইসলাম : অফসিজন হলো পরবর্তী মৌসুমে নিজেকে প্রস্তুত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আপনি যদি নিয়মানুবর্তি হন, ভালো করার তাড়না যদি থাকে তাহলে দেখবেন ওই সময়টাতে আপনি নিজের পেছনে সময় দেবেন। নিজেকে প্রস্তুত রাখবেন, ঘাটতিগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন। মূলত ভালো করার লক্ষ্য থেকেই মোটিভেশনটা এসে থাকে। আমি নিজে এ বছর অফসিজনে পুরোটা সময় সপ্তাহে চার দিন করে মাসকো একাডেমিতে অনুশীলন করেছি। বিসিবির জিম বা ইনডোর ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিডিউলের ফাঁকে ফাঁকে ব্যবস্থা করে আমরা অনুশীলন চালিয়ে নিই।
এবারের জাতীয় লিগে ৬ ম্যাচে ৪৫৩ রান। ২২১ রানের ডাবল সেঞ্চুরির ইনিংস রয়েছে। অর্ধেকের বেশি রান সিলেটের বিপক্ষে? এবং ছোট রানের ইনিংস।
নাঈম ইসলাম : দুটো ম্যাচ আমরা খেলতেই পারিনি আবহাওয়ার কারণে। বাকি চারটা ম্যাচের দুটোই খেলেছি সিলেটের বিপক্ষে। সৌভাগ্যবশত বড় রানগুলো সিলেটের বিপক্ষেই এসেছে। ছোট ইনিংসগুলোর পেছনে কিছু কারণ তো ছিলই। আমি আসলে পুরো সিজন হলে গভীরভাবে এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি। নিজের খুঁতগুলো খুঁজে বের করি। সেগুলোর ভিত্তিতে অফসিজনে অনুশীলনে মনোযোগ দিই।
জাতীয় দলের বাইরে থেকে অনুশীলনের সুযোগ, স্কিল ও ফিটনেস ধরে রাখাটা কতটা কঠিন?
নাঈম ইসলাম : আপনি যখন জাতীয় দল, এইচপি এসবের বাইরে থাকবেন, তখন নিজের প্রস্তুতি নেওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। একদম স্বল্প অনুশীলনের সুবিধা থাকে আমাদের জন্য। ইনডোর ব্যস্ত থাকে, একাডেমির মাঠে অনুশীলন চলতে থাকে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি। এ বিষয়ে গামিনি ডি সিলভা, গ্রাউন্ডসের বাতেন ভাইÑ তাদের প্রতি খুব কৃতজ্ঞ। আমরা যখনই চেয়েছি বেশিরভাগ সময়ই গামিনি আমাদের উইকেট দিয়ে সাহায্য করেছেন। বাতেন ভাইও বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছেন। বোর্ডও সহযোগিতা করেছে। তারপরও ভালো প্রস্তুতির জন্য যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, সেটি আমরা পাই না।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট অবকাঠামো নিয়ে ভাবনা?
নাঈম ইসলাম : আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রতিটি দলের সঙ্গে অন্তত একজন করে অ্যানালিস্ট যদি থাকেন, তাহলে খুব ভালো হবে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারতে প্রথম শ্রেণিতে এই সুবিধাগুলো থাকে। আমার মনে হয় এটার প্রয়োজন। বোর্ডও আশা করি আজ হোক বা কাল এ ব্যবস্থা করবে।
এনসিএল আপনার কাছে কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট মনে হয় এবং বিসিএলের মধ্যে তুলনা?
নাঈম ইসলাম : এনসিএল এখন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট। এখন ম্যাচগুলোর ফলাফল হচ্ছে। এবার ঢাকা এক ম্যাচ হাতে রেখেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। মানে ম্যাচগুলো প্রাণবন্ত হচ্ছে। মরা খেলার পরে ড্র হচ্ছে না। আগের ধরনের থেকে এখন অনেক বদলেছে এনসিএল, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বেড়েছে।
ডিউক বল আসার পর থেকে প্রথম শ্রেণির ধরনটাই বদলে গেছে। বলে বাউন্স, সুইং থাকায় সেগুলো সামলাতে হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের। দেশের বাইরে গিয়ে খেলার জন্য ভালো প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিসিএলও অনেক বেশি কঠিন প্রতিযোগিতা। এনসিএলের চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও দুটো মিলিয়ে আমি বলব ১৮-২০। চারটি টিমে নেমে আসায় আরও ইনটেন্স বেড়ে যায় বিসিএলে।
জাতীয় দলের বাইরে থাকা পেশাদার ক্রিকেটারদের জীবনটা কেমন?
নাঈম ইসলাম : ক্রিকেটের প্রতি ভালো লাগা, ভালোবাসা আমার মধ্যে কাজ করে। আমি চাই টিমের সেরা পারফরমার হতে। সে লক্ষ্য নিয়েই আমি অনুশীলন করি। যাতে কোনো খারাপ ম্যাচ গেলে আমার মনে না হয় অনুশীলনে ঘাটতি ছিল। ক্রিকেটের প্রতি ডেডিকেশন আর ভালোবাসাই আমার ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার মূল রসদ।