রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের দুবছর হতে চলেছে। এর মধ্যে বিশ্ব রাজনীতির মধ্যে নানা ধরনের বাঁক বদল হচ্ছে, যদিও তা সাদা চোখে এখনই অতটা ধরা পড়ছে না। ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধের কারণ নিয়ে ইতিমধ্যে কম জল ঘোলা হয়নি। যুদ্ধ কী রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে, নাকি রাশিয়া ন্যাটোর মধ্যে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে সময় যতই গড়াচ্ছে বিশ্বের মধ্যে মেরুকরণ তত স্পষ্ট হচ্ছে। চাইলেও বিশ্ব আবার আগের কাঠামোতে ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না। শোনা যায়, যুদ্ধের প্রথম দিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তুর্কির মধ্যস্থতায় একটা সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ ও আশ্বাসে সেখান থেকে ইউক্রেন নিজেদের প্রত্যাহার করে যুদ্ধই শ্রেয় এমন বন্ধুর পথে এগিয়ে যায়।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ইউক্রেনকে সাহায্য ও অস্ত্র সহায়তা করেছে। সেই সাহায্যের ওপর ভিত্তি করে ইউক্রেন যুদ্ধ জয়ের মিশনে সর্বাত্মক বিনিয়োগ করেছে। এ বছরের গ্রীষ্মে পশ্চিমাদের মধ্যে প্রবল ধারণা ছিল, যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়াকে পরাস্ত করা সম্ভব। যুদ্ধ শুরুর দিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কত না আন্তরিকতার সঙ্গে আমন্ত্রিত হতেন। প্রায়ই তিনি পশ্চিমা মিডিয়ায় সামরিক কায়দায় হাজির হতেন, বিশে^র ক্ষমতাধর দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরাও জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করতে কিয়েভে উড়ে যেতেন, জেলেনস্কির ঘাড়ে হাত রেখে শুধু পরম বন্ধুত্বের পরিচয় দিতেন না একই সঙ্গে মিডিয়ার সামনেও জাহির করতেন। শোনা যায়, এমনই এক সফরে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার টেবিল থেকে তুলে এনেছিলেন। তাদের সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই এই গ্রীষ্মে ইউক্রেনীয় বাহিনী ইউক্রেনের ভূখণ্ড থেকে রাশিয়াকে বিতাড়িত করার জন্য পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।
তবে এই গ্রীষ্মটা ইউক্রেনের জন্য মোটেও ভালো যায়নি, যদিও ওয়াগনার বিদ্রোহের পর ইউক্রেনের জন্য একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। উল্টো রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতি আক্রমণে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি ক্ষয় হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়াকে মোকাবিলায় এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সৈন্য সমাবেশ করাই ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক এক সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, ইউক্রেনের সৈন্যবাহিনীর বর্তমান গড় বয়স ৪৩ বছর এবং সেনাবাহিনীতে যোগদান এড়াতে সক্ষম নাগরিকরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। যুদ্ধের এক ধরনের ক্লান্তি ভর করেছে ইউক্রেনীয়দের ওপর। আর এই ক্লান্তির কারণেই হোক বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেই হোক, এর ঢেউ যেন লেগেছে আটলান্টিক ছাড়িয়ে আমেরিকায়। গত দুই মাসে হোয়াইট হাউজের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রথমবার কংগ্রেসে এবং সর্বশেষে সিনেটে ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সাহায্য অনুমোদন করাতে ব্যর্থ হয়। এমনকি এর জেরে কংগ্রেসের স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থিকে মূলত নিজ দলের কট্টরপন্থিদের হাতে অপসারণের ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সিনেটে ইউক্রেন ও ইসরায়েলে ১০৬ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়, যার মধ্যে ইউক্রেনের জন্য প্রস্তাবিত ৬১ বিলিয়ন ডলারও ছিল। প্রস্তাবটি পাসের জন্য ৬০ জন সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন থাকলেও রিপাবলিকান দলের ৪৯ জন সদস্য এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত মিত্রদের মাধ্যমে ইউক্রেন বিভিন্নভাবে ২৩৩ বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা পেয়েছে। যার মধ্যে ৯০ বিলিয়নেরও বেশি ছিল সামরিক সহায়তা এবং এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক সহযোগিতা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বেশ জমে উঠেছে। রিপাবলিকানরা এই মুহূর্তে বাইডেনকে কোনোভাবেই হিরো বানানোর ঝুঁকি নেবেন না বলেই মনে হয়। অন্যদিক মধ্যপ্রাচ্যে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে আরেকটু যেমন জটিল করেছে, পাশাপাশি সিরিয়ার আসাদকে রক্ষা করার পর রাশিয়াকে আবার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসরায়েলকে বাইডেন প্রশাসনের শর্তহীন সমর্থনের প্রতিবাদ যখন তুঙ্গে তখন ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মঞ্চে আবার রাশিয়ার আবির্ভাব। অতি সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সফরে আসেন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে এর আগে তিনি মাত্র দুটি দেশ সফর করেন তার একটি চীন ও অন্যটি ইরান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রাশিয়াকে একঘরে করার প্রচেষ্টা যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। একই সঙ্গে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার মাধ্যমে পুতিনকে উচ্ছেদ ও রাশিয়াকে দুর্বল করার প্রকল্প খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। উল্টো রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে। ব্যবসাবাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পশ্চিমানির্ভরতা এবং একই সঙ্গে স্থবিরতা কাটিয়ে আত্মনির্ভরশীল ও একটি নিজস্ব মিত্র বলয় তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে হয়।
অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণ সক্ষম না হওয়ায় ইউক্রেনের যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে মিত্রদের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। জনবল ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি তো আছেই একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি। ইউক্রেনকে বলা হয়, ইউরোপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। অভিযোগ আছে, আমেরিকা ও পশ্চিমাদের সহায়তার একটা বড় অংশ দুর্নীতিবাজদের পকেটে ঢুকেছে, বাধ্য হয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে পশ্চিমারা যারা ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাশিয়াকে ঘায়েল করতে চেয়েছিলেন, তারা এখন আর ইউক্রেন বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ওপর ভরসাও করতে পারছে না, একই সঙ্গে রাশিয়াকে ঘায়েল করার জন্য তার ওপর নতুন করে আর বিনিয়োগও করতে চাচ্ছে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, সিনেট যদি ইউক্রেনের জন্য অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান না করেন তাহলে লাভবান হবেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।
ইউরোপের নেতৃবৃন্দও বলেছেন, সাহায্য প্রদান করার ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিপূরক হতে পারবেন না। অনুমান করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ না পেলে ইউক্রেনকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। সেক্ষেত্রে এই শীতটা ইউক্রেনের জন্য দীর্ঘ হতে যাচ্ছে। জেলেনস্কি ইতিমধ্যে বলেছেন, ইউক্রেনের ওপর থেকে আমেরিকা ও পশ্চিমারা মনোযোগ সরিয়ে ফেলেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া যে কত বড় রাজনৈতিক অপরিপক্বতা তা কিছুটা হলেও তিনি বুঝতে শুরু করেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কারও কারও জন্য একটা রোমাঞ্চের সুযোগ হলেও ইউক্রেনীয়দের জন্য কতটা বিপর্যয়কর এই মুহূর্তে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ইতিমধ্যে রাশিয়া আক্রমণের প্রকোপ বাড়িয়েছে ইউক্রেনের ওপর। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে আরও বেশি সেনা সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছেন। এই মুহূর্তে রাশিয়ার সৈন্যবাহিনীতে যোগদানের জন্য প্রায় ২০ মিলিয়ন রিজার্ভ প্রস্তুত আছে। পরিস্থিতি বলছে, আসছে শরতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়াতে পারে এবং সেই মুহূর্তে ইউক্রেন যদি পশ্চিমাদের থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য না পায় তাহলে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নেওয়াই হবে একমাত্র বিকল্প। আর সেটা হওয়া মানে, ইউক্রেনের দখল হওয়া অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণকে শিকার করে নেওয়া। অধিকন্তু ইউক্রেন যাতে ন্যাটো ও রাশিয়ার মাঝে একটি মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসেবে থাকে তার নিশ্চয়তা প্রদান করা। রাশিয়ার অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে, রাশিয়া পৃথিবী থেকে একঘরে হয়ে পড়েছে বললেও পশ্চিমা বিশ^ এই যুদ্ধ থেকে কৌশলগতভাবে লাভবান হয়নি। বরং ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো বিশ^ ক্ষমতার মঞ্চে রাশিয়ার মতো একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফরম পেয়েছে। পশ্চিমাবিরোধী দেশগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে পেরে, নতুন করে কৌশল সাজাতে পারছে। এই যুদ্ধ রাশিয়া, চীন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিকট-অতীতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, যার প্রভাব হয়তো সুদূরপ্রসারী।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com