এএফসি কাপের গ্রুপসেরা নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগে ক্লাবটেন্ট ছাড়তে হয়েছিল বসুন্ধরা কিংসের ফুটবলারদের। সাত সকালের ফ্লাইটে ঠিকঠাক কলকাতায় নামার পর থেকেই আসতে থাকে পদে পদে বাধা। কলকাতা থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার যে বিমানটির কিংসের প্রায় ৫০ জনের বহর নিয়ে ভুবনেশ্বর উড়ে আসার কথা, সময় পেরিয়ে গেলেও তার দেখা মেলেনি। পাক্কা ২ ঘণ্টা বিলম্বের পর সেই বিমান ছেড়েছে। এরপর ভুবনেশ্বরে আসার পর শুরু আরেক বিপত্তি। প্রায় এক মাস আগে বুকিং দেওয়া হোটেলে শুরুতে ফুটবলারদের বরাদ্দ দেওয়া হয় বেড-শেয়ার কক্ষ! অর্থাৎ দুজন করে ফুটবলারকে থাকতে হবে এক খাটে! পেশাদার ফুটবলে এমনটা অসম্ভব কল্পনা! সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবলার, কোচ, কর্মকর্তাদের ক্লান্তিকর সময় কাটাতে হয়েছে হোটেল লবিতে। ভুবনেশ্বরে পা রাখা, এমনকি এএফসি কাপের শুরু থেকে এরকম অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নদের। দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বিমান ভ্রমণের পর হোটেল কক্ষ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষায় খেলোয়াড়দের বিরক্তির সীমা ছিল না। তবে তা ছাপিয়ে তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে সোমবার স্বাগতিক ওড়িশা এফসিকে উড়িয়ে গ্রুপসেরা হওয়ার প্রত্যয়।
কিংসের বিড়ম্বনার শুরু আরও অনেক আগে থেকেই। প্রায় দুই মাস ধরে ভুবনেশ্বর শহরের প্রায় সাত থেকে আটটি হোটেলে জোর চেষ্টা করেও বুকিং দিতে ব্যর্থ হয় কিংস কর্র্তৃপক্ষ। আগেরবার এই শহরে মোহনবাগানের বিপক্ষে খেলতে এসে কিংস থেকেছিল ওয়েলকাম হোটেলে। সেই হোটেলে এবার একটু আগেভাগে যোগাযোগ করা হলে রহস্যজনক কারণে ভাড়া কয়েকগুণ বেশি দাবি করা হয়। সেটাও সমস্যা ছিল না। তবে এক সঙ্গে অনেকগুলো রুম কিংসকে দিতে অস্বীকৃতি জানায় হোটেল কর্তৃপক্ষ। একই রকম নেতিবাচক জবাব শুনতে হয় অন্যান্য হোটেল থেকেও। শেষ পর্যন্ত ক্রাউন হোটেল সম্মত হয় রুম দিতে স্থানীয় বেশ ক’জন ব্যক্তি জামিনদার হওয়া এবং ৭৫ শতাংশ ভাড়া অগ্রিম প্রদানের শর্তে। এসব শর্তই মেনেছে কিংস। তবে হোটেলে পৌঁছে বিড়ম্বনা এড়ানো যায়নি। ৩টায় হোটেলে প্রবেশ করা দলের ফুটবলারদের রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে লবিতে। হোটেল কর্র্তৃপক্ষ কোনোভাবেই যখন আলাদা আলাদা খাটের সংস্থান করতে পারছিল না তখন, কিংসের বেশ কজন অফিশিয়ালকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। সমন্বিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ফুটবলারদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা হয়েছে কাল রাতে। অথচ এএফসির স্পষ্ট নির্দেশনা আছে স্বাগতিক ক্লাব ও স্বাগতিক দেশের ফুটবল সংস্থার দায়িত্ব সফরকারী দলকে আবাসন জোগাড়ে সহায়তা করা। গেল দুই সপ্তাহ তাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। এমনকি কাল রাত পর্যন্ত স্বাগতিক ক্লাবের কেউ আসেনি কিংসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। এএফসিও কোনো এক রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ থাকছে বিভিন্ন ইস্যুতে। যার মধ্যে অন্যতম কিংসের নাইজেরিয়ার ফরোয়ার্ড এমফন উদোহকে ভারতীয় ভিসা না দেওয়ার বিষয়টি। গেল অক্টোবরে যখন কিংস মোহনবাগানের সঙ্গে ভুবনেশ্বরে এসেছিল খেলতে, তখন ভিসার জন্য আবেদন করা হয় এমফন উদোহর। তবে সেই ভিসা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত তাকে রেখে ভুবনেশ্বরে আসতে হয়েছে কিংসকে।
আরও একটু পেছনে তাকালে দেখা যাবে কিংসের দুর্ভোগের ভূরি ভূরি উদাহরণ। দলটির আগের চার ম্যাচের দুটি এক রেফারি দিয়ে পরিচালনা করায় এএফসি এবং মাজিয়ার বিপক্ষে মালেতে এবং ঘরের মাঠে ওড়িশার বিপক্ষে রেফারির বাঁশি বেশিরভাগ বেজেছে তাদের বিরুদ্ধে। এই ভুবনেশ্বরে বাগানের বিপক্ষে ম্যাচে খেলতে আসাও শঙ্কায় পড়েছিল ভিসা জটিলতায়। শেষ পর্যন্ত তারা ম্যাচের দুদিন আগে ভিসা পেয়ে আসতে পারে বিমানপথে অনেক ঝামেলা মোকাবিলা করে। যার ফলে ম্যাচের দুদিন আগে ট্রেনিংও করতে পারেনি। গতকালও যেমন তারা বাধ্য হয়েছে বিকেলের নির্ধারিত ট্রেনিং বাতিল করতে। দুর্ভোগের ভ্রমণ শেষে কোচ অস্কার ব্রুজোন খেলোয়াড়দের বিশ্রামকেই উপযুক্ত প্রস্তুতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন। রাতে অবশ্য হোটেলের সামনের রাস্তায় খানিকটা স্ট্রেচিং করেছে দল। এত কিছুর পরও কিংসকে রোখা যাচ্ছে না। ৪টি ম্যাচ ডে শেষে তারাই আছে চার দলের ডি গ্রুপের শীর্ষে। তাদের ঝুলিতে ১০ পয়েন্ট। স্বাগতিক ওড়িশার আছে ৯ পয়েন্ট। সোমবার কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ড্র হলেই গ্রুপসেরা হবে কিংস।
বাধা আসবে, তা মোকাবিলা করেই লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। এই মন্ত্র আগে থেকেই খেলোয়াড়দের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন ব্রুজোন। ওড়িশাকে হারিয়েই প্রথমবারের মতো তারা পা রাখতে চায় ইন্টার জোনাল প্লে-অফ সেমিফাইনালে। তাই শত বাধা আসুক, অভীষ্ট লক্ষ্য ছুঁতে একাট্টা পুরো দল। যার প্রমাণ পাবেন দলের দুই স্থানীয় ফুটবলারের কথোপকথনে। মাংসপেশিতে টান পড়ায় এক ফুটবলার খানিকটা ভুগছেন দুদিন ধরে। তার কাছে এসে আরেক ফুটবলার বললেন, ‘বেশি বেশি করে পানি খাও। দেখবে মাংসপেশির টান আর থাকবে না। তাছাড়া এই ছোটখাটো সমস্যাগুলো আমাদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে এখন। সবাইকে বোঝাতে হবে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরাই সেরা।’
কিংসের কোচিং প্যানেলের এক বিদেশী সদস্য তো বলেই দিলেন, 'যত বাধা আসবে, ততই আমাদের জন্য ভালো। কারণ দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে কাজ করে বুঝেছি, এই জাতি প্রতিকূল পরিস্থিতি শক্তহাতে মোকাবেলায় অভ্যস্থ। আমরা এ সব প্রতিকূলতাকে দেখছি ইতিবাচক দৃষ্টিতে। মাঠের বাইরের পরিবেশ প্রতিপক্ষরা যতই কঠিণ করে তুলুক, মাঠে তো তাদের আমাদের মোকাবেরা করতে হবে। সেখানেই প্রমাণ হবে কে সেরা।'
কিংসের প্রতিটি সৈনিক যে আলাদা ধাতে গড়া, তার আরেকটা প্রমাণ মিলেছে দলের সঙ্গে আসা অফিসিয়ালদের আন্তরিকতা দেখে। হোটেল কক্ষ, খাটের বিড়ম্বনায় যাতে ফুটবলারদের খুব বেশি না ভোগায় সেটা নিশ্চিতে তারা তারা নিজেদের ঘর ছেড়ে দিয়েছেন গতকাল। খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবকিছুতেই তারা থাকছেন শেষের সারিতে। এমন সমন্বিত চেষ্টার সুফলটা সোমবার যদি না মিলে, তবে কিংসের সঙ্গে প্রকৃতিই যেন একটা বড় অন্যায় করে বসবে।