মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে স্ট্যাটাস সিম্বল ছিল পুরুষের পায়ের পয়েন্টেড স্যু, মানে সুচালো জুতো। মর্যাদার শুরু জুতোর অগ্রভাগে ছয় ইঞ্চি বাড়তি সুচালো অংশ দিয়ে, বাড়তে বাড়তে তা চব্বিশ ইঞ্চি পর্যন্ত হতো। আরও বেশি বাড়ানো সম্ভব ছিল কিন্তু জুতোর পক্ষে সেই ভার বহন করা সম্ভব হয়ে উঠত না। দৃশ্যটি কল্পনা করুন: শার্লক হোমস-এর বেকার স্ট্রিটে পথচারীর ভিড় লেগেই আছে। কিন্তু সামনে সুচালো চব্বিশ ইঞ্চি ও পেছনের পথচারীর সুচালো চব্বিশ ইঞ্চি পথচারীদের পরস্পরের মধ্যে একটা বাধ্যতামূলক সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। অধিক মর্যাদার অস্বাভাবিক দীর্ঘ ও পয়েন্টেড ‘শু’ দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারলেও ‘প্লেগ’ কিংবা ‘কালোমৃত্যু’ ঠেকাতে পারেনি। ইংল্যান্ডের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ গণকবরে সমাহিত হয়েছে।
জুতোপেটা খাওয়া বরাবরই আত্মমর্যাদার ব্যাপার এমন নয়। মন্ত্রীপুত্র অপকর্মে ধরা পড়ে জনতার জুতোপেটা খেয়ে, মাকে গিয়ে বলল মন্ত্রীপুত্র বলার পরও তারা জুতোপেটা বন্ধ করেনি। ক্ষুব্ধ মা স্বামী অর্থাৎ মন্ত্রীকে বললেন, এ কেমন কথা! মগের মুল্লুক নাকি? এদেশে কি মন্ত্রীর কোনো দাম নেই?
মন্ত্রীর মন খারাপ হাতের তালু দিয়ে গালে ঠেস দিয়ে বললেন, আহা! আমি ক্ষমতায় থাকতে তারা আমার ছেলেকে জুতোপেটা করেছে, কবে না আবার অপমান করে বসে! এই অকৃতজ্ঞের দেশে জন্মগ্রহণ করাটাই ঠিক হয়নি।
এদেশীয় জনতার জুতো সেকালের বিলেতি অভিজাতদের মতো মোটেও ‘পয়েন্টেড শু’ নয়। আঘাতটাতে ‘ব্লান্ট ইনজিওরি’ হতে পারে, রক্তপাত কমই হয়। কিন্তু ইংল্যান্ডের সুচালো জুতো যখন বিভিন্ন স্থানে রক্ত ঝরাতে শুরু করল, সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিল যখন ‘ছোটলোক- ইতরজন’ জাতে ওঠার জন্য জুতোর ডগা ক্রমেই বাড়াতে শুরু করে। অভিজাতরা বাধা দেয়, দাঙ্গা বেধে যায়। জুতো-দাঙ্গা মর্যাদা বাড়ানো ও মর্যাদা ঠেকানোর লড়াইয়ে পরিণত হলে রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড (১৩১২-১৩৭৭) ইম্পেরিয়াল ফরমান জারি করতে বাধ্য হলেন। যারা আমজনতা তাদের জুতোর অগ্রভাগ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ৬ ইঞ্চি, জেন্টলম্যান বা ভদ্রলোকদের বেলায় সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ১৫ ইঞ্চি এবং অভিজাত বা নোবলম্যানদের বেলায় ১৫ ইঞ্চির বেশি কিংবা তাদের যেমন ইচ্ছা তেমন, কিন্তু ২৪ ইঞ্চির বেশি নয়।
সূচ্যগ্র বিদ্ধ করার ক্ষমতাসম্পন্ন এসব জুতো ‘ক্র্যাকো’ নামে পরিচিত, আর এ বর্ধিত অংশ বা পাওলেইন সিল্ক, ভেলভেট, কিংবা কোনো দামি টেক্সটাইল দিয়ে মুড়ে দেওয়া হতো। জুতোই বলে দিত মানুষটা কত বিত্তবান এবং কেমন মর্যাদাসম্পন্ন। বিংশ শতকে পৌঁছে ইংল্যান্ডবাসীর এ ধরনের জুতো পরার স্বাদ-আহ্লাদ মিটে গেছে। আমার বছর তিনেকের বিলেতবাস নিরাপদই ছিল, জুতো দাঙ্গার কথা শুনিনি, দু’একজন পেশাদার ও শৌখিন ক্লাউন এবং মধ্যযুগীয় নাটকের অভিনেতা ছাড়া কাউকে চোখে পড়ার মতো পয়েন্টেড শু পরতে দেখিনি।
রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড জুতোর ডগার সর্বোচ্চ মাপ নির্ধারণ করে দিয়ে ব্রিটিশদের অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের রাজা-বাদশাহরা চাটুকারদের জিহ্বার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ কত হবে তা যেমন নির্ধারণ করে দেননি তেমনি নিরাপদ মানিলন্ডারিং-এর শ্রেণিভিত্তিক সর্বোচ্চ সীমাও বেঁধে দেননি। তাহলে আজ মানিলন্ডারদের কষ্টার্জিত অর্থ উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ব্যাংকগুলো ফ্রিজ করার হুমকির ধৃষ্টতা দেখাতে পারত না। বাংলাদেশের মতো শান্তিকামী গণতন্ত্রী ‘গণপ্রজাতন্ত্র-কে’ বেকায়দায় ফেলতে তাদের ব্যাংকের কেরানিরা পর্যন্ত চিঠিপত্র লিখে জিজ্ঞেস করছে : এত টাকা কোথায় পেলে বাহে?
যদি আগেভাগেই ফরমান জারি হতো নিরীহ লন্ডারার বিপদে পড়তেন না। ফরমানে বলা হতে পারত ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ তত্ত্বে বিশ্বাস করে আমরা পৃথিবীর যেকোনো স্থানের ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আমাদের নিজগ্রামের প্রতিষ্ঠান মনে করে থাকি। লয়েডস, বার্কলেজ, চেজ ম্যানহাটান, স্ট্যানচার্ট, সুইস ব্যাংক, সব অফশোর ব্যাংক, সর্বত্রই আমাদের অ্যাকাউন্ট খোলার অধিকার রয়েছে। নিজের নামে, স্ত্রীর নামে, পুত্র-কন্যা, বউমা-জামাতা, বেয়াই-বেয়াইন, গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড সবার নামে অ্যাকাউন্ট খোলার অধিকার মানবাধিকারের আওতায় আসে। তবে সমাজকে আর্থিক অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করতে দেশীয় লন্ডারার ধরার একটা বার্ষিক সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করি। তাতে শাসনতন্ত্রে চিহ্নিত ইকুইটি এবং ইকুয়ালিটি কায়েম করা সহজ হতো। তার আগে মানবাধিকারের অধিক্ষেত্র ঈষৎ বর্ধিত করে মানি লন্ডারিংকেও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়বে।
***
ধরা যাক ফরমাল ও ইনফরমাল খাতে বিদেশে টাকা স্থানান্তরের প্রশ্নে সামাজিক মর্যাদাভিত্তিক একটা সর্বোচ্চ ক্যাপিং ফরমান জারি হলো। জমাকৃত অর্থ ক্যাপিং সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো রকম প্রশ্ন উত্থাপন করা এখতিয়ার বহির্ভূত বলে বিবেচিত হবে। এমনকি শ্বশুর সাহেবের টাকা কিনা তাও জিজ্ঞেস করা যাবে না।
আমজনতা : বার্ষিক সর্বোচ্চ ১ লাখ মার্কিন ডলার।
দলীয় সদস্য : বার্ষিক সর্বোচ্চ ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
দক্ষিণ ও উত্তরপাড়ার গুরুত্বপূর্ণ লোকজন : বার্ষিক সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও তাদের স্বজন : বার্ষিক সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
রাজা-বাদশাহ ও তাদের স্বজনদের বেলায় : এই ক্যাপিং কোনো ক্রমেই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারবে না।
(এ পর্যন্ত পাঠ করে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন আমার বিলিয়ন ট্রিলিয়ন সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে কি না। নেই, সত্যিই নেই। তবে এটুকু জানি এই নশ্বর পৃথিবী আর বড়জোর সাড়ে চার বিলিয়ন বছর টিকে থাকবে। এ পর্যন্ত বাঁচতে তাদের টাকা তো লাগবে, তাছাড়া ইনফ্লেশন নাকি টাকার দামও কমিয়ে দেয়।)
উল্লেখ থাকে যে, কিক ব্যাক হিসেবে বিদেশে নিজের বা স্বজনের অ্যাকাউন্টে যে অর্থ জমা হবে তার সিকিভাগ পার্টি ফান্ডে জমা দিলেই কেবল রাষ্ট্র সে অর্থ রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ! ফরমান জারি করতে দেরি হয়ে গেলে কিছু খেসারত তো দিতেই হবে।
***
মাত্র কদিন আগেই দু’নম্বরি এন-৯৫ মাস্ক পরা বাঙালিকে তার এলিট স্ট্যাটাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে মাস্ক খুলে জেল-টুথপেস্টে ব্রাশ করা দাঁত দেখিয়ে বলতেন, বেঁচে গেছি ভাই, কভিড নেগেটিভ। নেগেটিভ হয়েও যে পজিটিভদের ঈর্ষার কারণ হওয়া যায় কভিড-১৯ সেটা প্রমাণ করে ছাড়ল। যে প্রতীক মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তার নামই স্ট্যাটাস সিম্বল। এখনো কেউ কেউ মনে করেন হাতে লেটেস্ট আইফোনই তার স্ট্যাটাস সিম্বল।
১৮৯৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ভিলহেলম কনরাড রঞ্জেন ‘এক্স-রে’ মেশিন আবিষ্কার করলেন, এর ওপর নজর পড়ল বিত্তবান আমেরিকানদের। এই রশ্মির বিপদ ঘটানোর আশঙ্কার কথা বলার পরও তাদের নিরস্ত্র করা গেল না। তারা মেশিনের সামনে বুক চিতিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হাজির হতে শুরু করলেন এবং এক্স-রে প্লেটে নিজের মেরুদণ্ডের ছবি নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে অনেকটা ফটোফ্রেমে ফটো রাখার মতো এটা টাঙিয়ে রাখতে শুরু করলেন। এক্স-রে প্লেটে মেরুদণ্ড দেখানো হয়ে উঠলে স্ট্যাটাস সিম্বল। মায়া সভ্যতায় পুরুষের ধারালো ও সুচালো দাঁত মর্যাদা বৃদ্ধি করত। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে পুরুষ তার পৌরুষ দিয়েও মর্যাদাবান হতে পারত।
স্ট্যাটাস সিম্বল প্রাচীন বিষয় হলেও ইংরেজি ভাষায় এই শব্দযুগল প্রথম লেখা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও এক দশক পর ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৯ সালে ভ্যান্স প্যাকার্ডের লেখা ‘দ্য স্ট্যাটাস সিকার্স’ বেস্ট সেলার লিস্টে উঠে এলো। স্ট্যাটাস বাড়াতে আমেরিকানরা কত যে সব উদ্ভট কাণ্ড করেছে তার বিবরণ রয়েছে এই বইটিতে। স্ট্যাটাস বাড়াতে হাতের এক দড়িতে পিট বুল টেরিয়ার, জাপানি টোসা, ডোগো, আর্জেন্টিনো এসব জাতের কুকুর টানতেন এবং অদৃশ্য অন্য দড়িতে বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিককেও তু তু করে তাদের অনুগামী করতেন।
প্রাচীন রোমান আইনে এবং এখনো স্ট্যাটাস মানে ব্যক্তির আইনগত মর্যাদা! স্ট্যাটাস লিবারটিস বলে দেবে মানুষটি স্বাধীন না ক্রীতদাস। মুক্ত মানুষ থেকে ক্রীতদাস হওয়ার এবং ক্রীতদাস থেকে মুক্ত হয়ে মুক্ত মানুষ হওয়ারও আইনগত বিধান রয়েছে।
একটা সময় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটা ভিসা পাসপোর্টে লাগলে পুলকিত হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটত। এটাই ছিল তাৎক্ষণিক স্ট্যাটাস সিম্বল। বছরের পর বছর ধরে সেই মর্যাদা অক্ষুন্ন ছিল। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! এ বছর ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করল, বিশেষ শর্তযুক্ত কারণে কোনো কোনো ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর ভিসা রেস্ট্রিকশন বলবৎ করা হবে। এর অনেক রকম মানে, ভিসা থাকলেও তা অকার্যকর হয়ে যাবে, নতুন ভিসার আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে। নিজের ও স্বজনের অ্যাকাউন্টে অপ্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থের লেনদেন দেখা গেলে সন্দেহ পোষণ করা হবে, সে সব অর্থ অতিশীতল বরফ হয়ে যাবে, লেনদেন চলবে না।
শুরুতে মনে হয়েছিল এটা মনে হয় স্টিগমা মানে কী যে কেলেঙ্কারি! ভুল ভাঙল পারিবারিক-সামাজিক আলোচনায়। পাত্র আমেরিকায়, দেখতে ভালো, পড়াশোনায়ও ভালো, বাবা-মাও মর্যাদাবান। তখন একজন বলে উঠলেন, এটা কোনো যোগ্যতা হলো, রাম-রহিম, যদু-মধুও আমেরিকায় আছে, এমন সংখ্যা হাজার হাজার। এখন স্ট্যাটাস তাদেরই যারা ভিসা রেস্ট্রিকশন পেয়েছে। তাতে দু’টো ব্যাপার স্পষ্ট : অ্যাকাউন্টে অঢেল টাকা আছে, আর দেশেও অঢেল ক্ষমতা। তা দিয়ে গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। ভাবটা এমন যেন দেশে গণতন্ত্রের নহর বইছে। সুতরাং পাত্রীপক্ষ আমেরিকান ভিসাপ্রাপ্ত পাত্র নাকচ করে দিয়ে ‘ভিসা রেস্ট্রিকশন’ পাওয়া পাত্রের খোঁজে বিজ্ঞাপন দিতে ছুটল। পাত্রের পিতার ভিসা রেস্ট্রিকশন থাকলেও বিবেচনা করা যাবে।
এখন স্ট্যাটাস ভিসাপ্রাপ্তিতে নয়, প্রত্যাখ্যানে এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তা প্রচারে।
স্ট্যাটাস বাড়ানোর আর কোনো সুযোগ আমার হাতের কাছে নেই। কেবল দু’হাত তুলে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাছে প্রার্থনা জানাতে পারি, দিন না একটা ভিসা রেস্ট্রিকশন, প্লিজ!
পাদটীকা : উপসংহারে চাটুকারদের জিহ্বার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ কত হবে– এ নিয়ে কিছু কথা থাকলে ভালো হতো, মানি। এবার বরং থাক, গুরুত্বপূর্ণ এই শিরোনামটা আরেকটি রচনার জন্য না হয় সংরক্ষিত থাকুক।
লেখক: কথাসাহিত্যিক