সম্প্রতি ভারতের হঠাৎ ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সর্বত্র পণ্যটি নিয়ে এক তুঘলকি কাণ্ড শুরু হয়। এরপর ময়মনসিংহ শহরের পাইকারি বাজারে যে ভারতীয় পেঁয়াজ ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়, সন্ধ্যায় সেই পেঁয়াজ ১৪০ টাকা এবং পরের দিন সকালে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। আর যে দেশি পেঁয়াজ সকালে ১২০ টাকা কেজি দরে পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হয়, সেই পেঁয়াজ পরের দিন সকালে প্রতি কেজি ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে ক্রেতাদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ময়মনসিংহ শহরসহ সারা দেশে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ ২০০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম ২০০, ২৫০ টাকা কেজি হওয়াতে স্বল্প আয়ের মানুষ পড়েছে মহাবিপদে।
২০১৯ সালে ভারত সরকার ঠিক অক্টোবর মাসে এমনিভাবেই হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে সরকার ও ভোক্তাদের চরম বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়। সেই সময় পাগলা ঘোড়ার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে পেঁয়াজের দাম ৬০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে ওঠে। সরকার বিমান দিয়ে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেও অসৎ ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তবে আশার কথা, ময়মনসিংহ শহরের একজন পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী বলেন, ইতিমধ্যে বাজারে নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। আশা করা যায়, আগামী এক মাসের মধ্যে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
বাংলাদেশে বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন। দেশে বছরে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় ৩৬ লাখ মেট্রিক টন। উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশকে ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশে সিংহভাগ পেঁয়াজ শীতকালে উৎপাদিত হয় এবং উৎপাদিত পেঁয়াজ কৃষক দেশীয় পদ্ধতিতে ঘরবাড়িতে ৪ থেকে ৫ মাস সংরক্ষণ করেন। ফলে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশে পেঁয়াজ ঘাটতির এটি একটি প্রধান কারণ।
দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি কমিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় পেঁয়াজ চাষিদের মধ্যে সার, উন্নত জাতের ‘এন-৫৩’ জাতের পেঁয়াজের বীজ ও নগদ অর্থ প্রদান করছে। এন-৫৩ হলো গ্রীষ্মকালীন উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল একটি ভারতীয় পেঁয়াজের জাত। এ জাতের বীজ ভারতের দেরাদুন থেকে তিন বছর ধরে আমদানি করে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে দেশে। চলতি অর্থবছরে রাজশাহী অঞ্চলের ৯টি উপজেলার সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে সাড়ে ৮ হাজার কৃষকের মধ্যে ৮ হাজার ৫০০ কেজি এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজ বীজ বিতরণ করা হয়। এই বীজ দিয়ে কমপক্ষে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার একর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একরপ্রতি ফলন হয়েছে ১২ টন। গ্রীষ্মকালের পেঁয়াজের ভালো ফলন দেখে অন্য কৃষকরাও এ জাতের পেঁয়াজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এবার রাজশাহী অঞ্চলে ৪ হাজার একর জমিতে ৪৮ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হবে, প্রতি কেজির মূল্য ১০০ টাকা হলেও উৎপাদিত পেঁয়াজের বাজার মূল্য দাঁড়াবে ৪৮০ কোটি টাকা। বর্তমানে মাঠেই কৃষক এই জাতের পেঁয়াজ ৪ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।
দেশে প্রতি বছর ১১ থেকে ১২ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানিতে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বাণিজ্যিকভাবে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা পাবনা, ফরিদপুর, যশোর, রাজশাহী, বগুড়া, মানিকগজ্ঞ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার উঁচু জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ করে দেশের ঘাটতি পূরণ করে আমদানি নয়, রপ্তানি করা সম্ভব হবে। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগের।
সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন ও বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের বাড়িতে ২০টি পেঁয়াজ সংরক্ষণ মডেল ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। প্রতি ঘরে ১২ টন করে ২০ ঘরে প্রায় ২৪০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন কৃষক। পেঁয়াজ যত দিন খুশি ততদিন সংরক্ষণ করা যাবে এই ঘরগুলোতে। এ ক্ষেত্রে শুধু কৃষকদের বিদ্যুৎ বিল বহন করতে হবে। পেঁয়াজ সংরক্ষণের এ ধরনের মডেল ঘর দেশের অন্যান্য পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় বিনামূল্যে সরকারিভাবে নির্মাণ করে পেঁয়াজ চাষি দল গঠন করে সংরক্ষণ করতে পারলে বাংলাদেশ সহজেই পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। ভোক্তাকে আর বেশি দামে পেঁয়াজ কিনে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। এজন্য কৃষকদের প্রচুর প্রশিক্ষণ, স্বল্পসুদে
কৃষিঋণ, সংরক্ষণ সুবিধা, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য প্রদান এবং উৎপাদনের ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ গবেষণা কার্যক্রম জোরদার এবং জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলা সক্ষম উচ্চফলনশীল, রোগবালাই সহনশীল জাত উদ্ভাবন করতে হবে। এ ছাড়া পেঁয়াজের ঘাটতি পূরণ ও আমদানি নির্ভরতা হ্রাসের আর কোনো উপায় নেই। সেই সঙ্গে গ্রীষ্মকালের পেঁয়াজের আবাদ সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক প্রচার, খামার দিবস, পদ্ধতি প্রদর্শনী, ফলাফল প্রদর্শনী, শিক্ষাভ্রমণ, চাষি যোগাযোগ, পোস্টার-লিফলেট বিতরণ, ঘনঘন মাঠ পরিদর্শনের মতো সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ডগুলো আরও জোরদার ও গতিশীল করতে হবে।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
netairoy18@yahoo.com