তৃতীয় বারের মতো নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন মিসরের শাসক আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। নির্বাচনে ১০-১২ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ শেষে আগামী ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তিনি ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পথ আগেই মসৃণ করেছেন। যদিও মিসর এই মুহূর্তে অর্থনীতি ও গাজা যুদ্ধসহ বহুমুখী সমস্যায় সংকটকাল পার করছে। ২০১৩ সালের এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিসি ক্ষমতায় আসেন। এবারের নির্বাচনে বলতে গেলে তিনি একাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বল্প পরিচিত তিনজন প্রার্থী রয়েছেন। এরা হচ্ছেন বাম ঘরানার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির ফরিদ জাহরান, ন্যাশনাল ওয়াফদ পার্টির আবদেল-সানাদ ইয়ামাম ও বিপাবলিকান পিপলস পার্টির হাজেম ওমর। বিশ্লেষকরা বলছেন তারা কেউই সিসির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন না এবং তারা সিসির জন্য সত্যিকার অর্থে হুমকি নন। তাই সিসির নির্বাচিত হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
প্রতিদ্বন্দ্বী এই তিনটি দলই গত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সিসির নির্বাচনী জোটের অংশ ছিল। এদের মধ্যে পর্যটন ব্যবসায়ী হাজেম ওমরকে ২০২০ সালে সিসির সিনেটে নিয়োগ = দেওয়া হয়েছিল। ইয়ামামা সিসির প্রশংসা করে টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন। এমনকি তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে সংবিধান সংশোধন করে সিসিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের কথা বলেন। মুসলিম ব্রাদারহুড বিরোধী সেই আন্দোলনই মিসরে হোসনি মোবারক পরবর্তী সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। তবে হোসনি মোবারকের পতনের পরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সময়কালটা কোনো অংশে কম ভীতিকর ছিল না। মিসরে বসন্তকাল সে দফায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অন্যদিকে জাহরান সিসি সরকারের একজন সমালোচক এবং গণমাধ্যমে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে সরব থাকেন তবে সিসির বিরোধিতায় তিনিও একজন মধ্যপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত। অনেকে এই নির্বাচনকে একটি প্রহেলিকা বলছে।
ইতিমধ্যে আগের বারগুলোর মতো এই নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন না হওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত। নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্যাম্পেইন চলাকালে প্রশাসন বিরোধীদের দমন করেছে ও তাদের সমর্থকদের গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে মিসরের পরিচিত রাজনীতিবিদ আহম্মেদ টানটাওইকে একমাত্র যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি সরকারের একজন কট্টর সমালোচক এবং তিনি তরুণ ও যুব মিসরীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। গত সেপ্টেম্বরে গুগল ও টরেন্টো ইউনিভার্সিটির সিটিজেন ল্যাব তার মোবাইলে গোয়েন্দা নজরদারি চিহ্নিত করে।
নির্বাচনী নীতিমালা ব্যবহার করে আহম্মেদ টানটাওইকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়। আইন অনুযায়ী মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার জন্য পার্লামেন্টের ন্যূনতম ২০ জন সদস্য অথবা ২৫ হাজার ভোটারের অনুমোদন লাগে। এই অক্টোবরে সিসি প্রথমবারে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জাতীয় নির্বাচন কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সিসি ১.১ মিলিয়নেরও বেশি নাগরিকের অনুমোদন পেয়েছেন। তবে তার বিরোধীদের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতিবন্ধকতা তৈরির বিস্তর অভিযোগ আছে। অধিকারকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন আহম্মেদ টানটাওই’র অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া হয়েছে। পেটোয়া বাহিনী তার অনুমোদনকারীদের হেনস্তা করে, যদিও জাতীয় নির্বাচন কর্র্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে। এভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে ব্যর্থ হন এবং গত ১৩ অক্টোবর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে সিসির বিজয় এখন প্রায় পূর্বনির্ধারিত হয়েই থাকল, শুধু ঘোষণা দেওয়া বাকি।
অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় টানটাওই তার ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছেন অধিকারকর্মীরা। যদিও তিনি এখন মুক্ত এবং বিচারের অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু তার অনেক সমর্থক এখন কারান্তরীণ। তার নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া ও গাজায় যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগে অনেকটা নীরবেই নির্বাচনের প্রচারাভিযান শেষ হয়েছে, যার বেশিরভাগই সিসির দখলে ছিল। মিসরীয় গণমাধ্যম যার বেশিরভাগই সরকার নিয়ন্ত্রিত সিসির প্রচারণায় সরব ছিল। তবে কায়রোতে বিরোধীদের কিছু প্রচারণা লক্ষ করা যায়। এ মাসের শুরুতে দেশের বাইরে থাকা মিসরীয়রা তিন দিনব্যাপী নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন। দেশের মধ্যে সারা দেশে ১০ হাজার নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া আফ্রিকান ইউনিয়ন ও পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলীয় আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট পর্যবেক্ষণ করার কথা। গত দুই নির্বাচনে (২০১৪ ও ২০১৮) সিসি প্রায় ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন, যদিও ভোট প্রদানের হার ছিল যথাক্রমে ৪৭ ও ৪১ শতাংশ। অভিযোগ আছে এই নির্বাচনগুলোতে সিসির সমর্থকরা অর্থ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে চেয়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু ছিলে মিসরের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা। ১০৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর দেশ মিসর এই মুহূর্তে বিদেশি ঋণে নিমজ্জিত, নাগরিকদের হাতে নগদ অর্থ সংকট প্রবল, অন্যদিকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি যা ৩৩ শতাংশের থেকেও বেশি এবং খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদানের পর্যালোচনা দুইবার বাতিল করেছে। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ইউক্রেনের পর মিসর হচ্ছে ঋণ প্রদানে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সম্ভাব্য দেশ। যদিও সিসি এর দায় নিতে চান না। করোনাভাইরাস ও ইউক্রেন যুদ্ধসহ অন্যান্য বিশ্ব পরিস্থিতিকে এর জন্য দায়ী করছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন এর জন্য দায়ী অর্থনীতির ওপর সামরিক বাহিনীর বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো খাতে সরকারের বেহিসেবি ব্যয়। সাম্প্রতিক সময়ে মিসর কায়রোর বাইরে মরুভূমিতে ৫৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করে নতুন রাজধানী নির্মাণ করছে। অন্যদিকে মিসরে দারিদ্র্য বাড়ছে, মধ্যবিত্তের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। মুদ্রার মান ক্রমাগতভাবে পড়ে যাচ্ছে এবং জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন বর্তমান ফিলিস্তিনি ইস্যু সিসির জন্য কিছুটা শাপেবর হয়েছে। তিনি জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু নির্বাচনের পরে অর্থনীতি নিয়ে তাকে চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।
দ্য ওয়শিংটন পোস্ট অবলম্বনে
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com