পাকিস্তানের তারকা ক্রিকেটারদের বিকল্পের সন্ধানে ইংল্যান্ডের ‘দ্য হান্ড্রেড’ আসরে ভালো করা তুলনামূলক অপরিচিত ক্রিকেটারদের খোঁজ চলছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দশম মৌসুমের সূচি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিপিএলের সূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে গেছে পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল), দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ টি-টোয়েন্টি, অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশ লিগ, নিউজিল্যান্ডের সুপার স্ম্যাশ এবং আরব আমিরাতের আইএল টি-২০ লিগের সূচি। তাই বিপিএলের দলগুলো অনেক ক্রিকেটারই পাবে না আসরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। বিশেষ করে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের, তাদের বিকল্প হিসেবেই ইংল্যান্ডের ১০০ বলের আসর দ্য হান্ড্রেডে ভালো করা ক্রিকেটারদের দলে আনার চেষ্টা করছে বেশ কিছু বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি।
ফরচুন বরিশাল গত আসরে খেলেছে প্লে-অফে, তার আগের মৌসুমে খেলেছিল ফাইনালে। এবারও তামিম ইকবালকে আইকন খেলোয়াড় হিসেবে সই করিয়ে শোয়েব মালিক, ফখর জামান, মোহাম্মদ আমিরদের নিয়ে শক্তিশালী দল গড়েছিল ফরচুন বরিশাল কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু বিপিএলের সূচি তাদের পরিকল্পনায় বড় একটা ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। ফরচুন বরিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘আমরা তো দল গড়ি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। পিএসএল ১৩ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হলে আমাদের পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের ৭ তারিখের পরেই ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমি কীভাবে দল সাজাব, ওরা চলে গেলে আমার দলের আর থাকল কী! আসরের গুরুত্বপূর্ণ সময়েই তো সেরা খেলোয়াড়দের দলে দরকার। এখন আমাদের বিকল্প খেলোয়াড় খুঁজতে হবে।’
বিপিএলের প্লেয়ার ড্রাফটে অংশ নেওয়া অনেক ক্রিকেটারেরই নামের পাশে লেখা ছিল অ্যাভেইলেবিলিটি সাবজেক্ট টু পিএসএল অর্থাৎ পিএসএলের সূচি সাপেক্ষে তারা বিপিএলে খেলতে পারবেন। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের বেশিরভাগই পিএসএলকেই প্রাধান্য দেন। এসএ টি-টোয়েন্টি এবং আইএল টি-টোয়েন্টির বেশিরভাগ দলের মালিকানাই ভারতের আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিদের হাতে। তাই সেসবে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের জায়গা হয় না, যদিও এই সংক্রান্ত কোনো বিধিনিষেধ নেই। বিগব্যাশ লিগে বিদেশি ক্রিকেটারের সংখ্যাই আনুপাতিক হারে কম, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সংখ্যাও তাই কম। সুপার স্ম্যাশেও উপমহাদেশের ক্রিকেটারদের উপস্থিতি কম, পারিশ্রমিকের হারও খুব বেশি নয়। সাংস্কৃতিক নৈকট্য এবং পারিশ্রমিকের অঙ্ক, দুটো মিলিয়েই বিপিএল পাকিস্তান ও আফগান ক্রিকেটারদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটারদের বাইরে থাকারাও যেমন আজম খান, উসমান খানরাও বিপিএলে এসে বেশ সাফল্য পেয়ে যান। তাই পাকিস্তানের একটা বড় সংখ্যক ক্রিকেটারকে বিপিএলে খেলতে দেখা যায়। গেল মৌসুমেও বিপিএলের শেষ দিকে এসে দলগুলোকে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল, এবার সেটা করতে হবে মাঝপথেই। ২০২৩ সালে বিপিএল শুরু হয়েছিল ৬ জানুয়ারি আর পিএসএল মাঠে গড়িয়েছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি। সিলেট স্ট্রাইকার্স ফাইনালে উঠেছিল আমির-ইমাদ ওয়াসিমদের পারফরম্যান্সে ভর করেই। এই দুজন পিএসএলে চলে যাওয়ার পর তাদের শূন্যতা পূরণে বেশ কয়েকজন বিদেশিকেই পরখ করেছেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, কিন্তু ইমাদ-আমির জুটির শূন্যতা পূরণ হয়নি।
জাতীয় নির্বাচনের কারণে বিপিএল এবার একটু দেরিতে শুরু হবে সেটা আগেই জানতেন ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা। তাই এবারই প্রথম আসা দুর্দান্ত ঢাকার স্বত্বাধিকারী ও নিউটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাব খান জানালেন, তারা দেশীয় ক্রিকেটার আর শ্রীলঙ্কানদের ওপরই আস্থা রেখেছেন বেশি, ‘আমরা তাসকিন, শরিফুল, নাঈম মোসাদ্দেকদের নিয়েছি। সাদিরা সামারাবিক্রমা আর চতুরঙ্গা ডি সিলভা আছেন। পাকিস্তানের যে দুজন আছেনÑ সাইম আইয়ুব ও উসমান কাদির; তারা বলেছেন যে বিপিএলেই পুরোটা খেলবেন।’
চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সে মোহাম্মদ হারিস, নজিবুল্লাহ জাদরান এবং মোহাম্মদ হাসনাইন আছেন যাদের বিপিএলের মাঝপথেই ছেড়ে দিতে হবে পিএসএলের জন্য। ফ্র্যাঞ্চাইজি’র এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, পাকিস্তান থেকে নয়, এখন ইংল্যান্ডে ‘দ্য হান্ড্রেড’ টুর্নামেন্টে খেলা ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি, ‘আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের তারকা ক্রিকেটাররা যে অর্থ চায় আর তাদের পাওয়ার যে সূচি তার চেয়ে ইংল্যান্ডে অল্প টাকায় অনেক ভালো প্লেয়ার পাওয়া যায়। আইরিশ বা অন্য দেশের, যারা ইংল্যান্ডে খেলে; খুব পরিচিত না হলেও তারা ভালো ক্রিকেটার এবং বাংলাদেশে এরাই ভালো করে।’ উদাহরণ হিসেবে বললেন উইল জ্যাকসের কথা। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সে দারুণ একটা মৌসুম কাটিয়ে আলোচনায় আসেন এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান, এমনকি বেনি হাওয়েলও একটা সময় ছিলেন অপরিচিত অথচ এখন তারা দুজনেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে চাহিদাসম্পন্ন ক্রিকেটার। ইংল্যান্ডের অখ্যাত ক্রিকেটারদের বাংলাদেশে ভালো করার উদাহরণ হিসেবে আসবে আশহার জাইদির কথাও। ২০১৫ সালে বিপিএলের সেরা খেলোয়াড় হওয়া জাইদির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ দৌড় ছিল পাকিস্তানের ‘এ’ দল। ইংল্যান্ডেও লম্বা সময় আছেন, ব্রিটিশ পাসপোর্টও হয়েছে, তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খুব একটা চাহিদা তৈরি হয়নি। সেই জাইদি ১৭ উইকেট আর ২১৫ রান করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে শিরোপা জেতাতে রেখেছিলেন বড় ভূমিকা।
বিপিএলের গত আসরের মতোই এবারেও বিদেশি খেলোয়াড় নিবন্ধন উন্মুক্ত রাখার কথা জানিয়ে দিয়েছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। অর্থাৎ এবারও আগের বারের মতো ড্রাফট শেষে যে দল দাঁড়ায় আর আসরে যে দল খেলে তাতে বিশাল ব্যবধান থাকবে। লিগের মাঝপথে ক্রিকেটার আসবে, যাবে। পুরোই লোকাল বাসের মতো যখন তখন বিদেশি খেলোয়াড়রা আসবেন ও যাবেন বিপিএলে। কেউ অস্ট্রেলিয়া থেকে পাকিস্তান যাওয়ার পথে ঢাকায় নেমে দুটো বল খেলে দেবেন! আগের বছর এভাবেই তো হয়েছে।