দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় ফেনী-২ আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী ও তার স্ত্রী নুরজাহান বেগমের ৪ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৬৮ টাকার সম্পদ ছিল। হাজারী এমপি হওয়ার পর ২০১৮ সালের নভেম্বরে তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৭ হাজার ২০২ টাকায়। আর গত পাঁচ বছরে তাদের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৪ কোটি ৬২ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৩ টাকায়। গত ১০ বছরে তাদের সম্পদ বেড়েছে ১২০ কোটি ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৭৫ টাকার। অর্থাৎ তাদের সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা এবারের হলফনামাসহ তিন হলফনামা বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, নিজাম হাজারী ও তার স্ত্রীর ১৩০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। এর মধ্যে নিজাম হাজারীর ৩০ ভরি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ১৭ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রতি ভরির মূল্য ৫৬ হাজার ৬৬৬ টাকা। এই মূল্য অর্জনকালীন। আর তার স্ত্রীর ১০০ ভরি স্বর্ণের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ, অর্থাৎ প্রতি ভরির মূল্য ১ হাজার টাকা। হলফনামায় বলা হয়েছে, এ স্বর্ণ তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছেন। এ স্বর্ণেরও অর্জনকালীন মূল্য দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে নিজাম হাজারীর সম্পদ বহু গুণ বাড়লেও মাছের ব্যবসায় আয় কমেছে। ২০১৮ সালে তিনি মাছের ব্যবসা করে আয় করেন ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টাকা। আর ২০২৩ সালে মাছসহ অন্যান্য ব্যবসা থেকে তার আয় হয়েছে মাত্র ১৪ লাখ ৯২ হাজার ৫৬০ টাকা। হিসাব বলছে, মাছের ব্যবসা থেকে আয় কমেছে ৬ কোটি ৮৫ লাখ ৭ হাজার ১৪০ টাকা। এক কথায় তার মাছ ব্যবসায় ধস নেমেছে। নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা তিনি দাখিল করেছেন, সেখান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে নিজাম হাজারী ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে যে হিসাব দাখিল করেন, তাতে দেখা গেছে, ব্যবসা ও কৃষি খাত থেকে তার আয় ছিল ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৬৮ টাকা। তখন তার স্ত্রীর আয়ের কোনো খাত ছিল না। সে সময় তাদের ৪ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৬৮ টাকার সম্পদ ছিল। এর মধ্যে নিজাম হাজারীর ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৬৮ ও তার স্ত্রীর ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকার সম্পদ।
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই নিজাম হাজারী ও তার স্ত্রীর সম্পদ বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে তিনি যে হিসাব দাখিল করেন তাতে দেখা গেছে, মাছের ব্যবসা থেকে তার আয় ছিল ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টাকা। তখন তার নিজের আয় ছিল ৭ কোটি ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮৩ ও স্ত্রীর আয় ছিল ৭ লাখ ৮২ হাজার ৯৪৯ টাকা। ২০১৮ সালে তাদের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৭ হাজার ২০২ টাকা। এর মধ্যে নিজাম হাজারীর ২৩ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ৪৫১ ও স্ত্রীর ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫১ টাকা। এমপিত্বের প্রথম ৫ বছরে তাদের সম্পদ ২৭ কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৪ টাকা বাড়ে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একজন প্রার্থী হিসেবে গত ২৮ নভেম্বর তিনি যে হিসাব দাখিল করেছেন, তাতে মাছ ও অন্যান্য ব্যবসা থেকে আয় দেখিয়েছেন ১৪ লাখ ৯২ হাজার ৫৬০ টাকা। ২০১৮ সালের হলফনামায় বলা হয়েছিল, মাছ ব্যবসা থেকে তার আয় হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ মাছ ব্যবসায় তার আয় কমেছে ৬ কোটি ৮৫ লাখ ৭ হাজার ১৪০ টাকা। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, মাছের ব্যবসায় আয় কমলেও সম্পদ বেড়েছে তাদের। এখন তারা ১২৪ কোটি ৬২ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৩ টাকার সম্পদের মালিক।
হলফনামার তথ্যানুযায়ী, নিজাম হাজারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম। বাড়িভাড়া, ব্যবসা, ব্যাংকের সুদ, সম্মানী ভাতাসহ ৯৩ লাখ ২১ হাজার ৩৯৫ টাকা আয় হয়েছে তার। তার স্নিগ্ধা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট, স্নিগ্ধা ওভারসিজ, স্নিগ্ধা ইক্যুইটিজ ও স্নিগ্ধা ডিজাইন নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে শেয়ার রয়েছে। এসব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা নগদ ১০ কোটি ও স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ৭২ কোটি ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৫ টাকার সম্পদ রয়েছে তার। ২০১৮ সালে তিনি যে হলফনামা দাখিল করেছিলেন তাতে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ৪৫১ টাকা। আর এখন তার সম্পদের পরিমাণ ৭২ কোটি ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৫ টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ৪৮ কোটি ৭৯ লাখ ৪২ হাজার ৯৭৪ টাকা।
নিজাম হাজারীর চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধেক অংশের মালিক তার স্ত্রী। তিনি বাড়িভাড়া, মাছ চাষ, ব্যাংকের সুদ ও ব্যবসা থেকে আয় করেন ১ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা ১৯ কোটি ২৯ লাখ ১১ হাজার ১১৪ টাকাসহ স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ৫২ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৮১৮ টাকার সম্পদ রয়েছে। ২০১৮ সালে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫১ টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ৪৩ কোটি ৮৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭ টাকা।
পাঁচ বছরে তাদের দুজনের সম্পদ বেড়েছে ৯২ কোটি ৬৭ লাখ ১৯ হাজার ৪১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বছর ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮০৮ টাকার সম্পদ বেড়েছে হাজারী দম্পতির।
তথ্য অনুযায়ী, নিজাম হাজারীর স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ৭২ কোটি ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৫ ও স্ত্রীর স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ৫২ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৮১৮ টাকার সম্পদ রয়েছে। তবে নিজাম হাজারীর চেয়ে তার স্ত্রীর আয় বেশি। নিজাম হাজারীর আয় ৯৩ লাখ ২১ হাজার ৩৯৫ ও স্ত্রীর আয় ১ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা।