‘পুলিশের সহযোগিতায়’ সুনামগঞ্জের সীমান্ত থেকে ঢুকছে অবৈধ ভারতীয় চিনি

সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় ছয়টি উপজেলার সঙ্গে ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে। সম্প্রতি চিনির দাম বৃদ্ধির ফলে ওই সব সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারিরা ভারত থেকে অবৈধভাবে চিনি নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। রাতে চিনির বস্তাগুলো দেশে ঢুকাতে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সদর, বিশ্বম্ভপুর ও তাহিপুর উপজেলার সীমান্ত। বর্তমানে “ওপেন সিক্রেট” ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হোয়াইট ডায়মন্ড খ্যাত চিনির অবৈধ রমরমা ব্যবসা। আর চোরাকারবারিদের পুলিশ সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিদিন রাত ১২ টার পর প্রায় ৫০ কেজির কয়েক হাজার বস্তা চিনি দেশের বাজারে ঢুকে এই সড়ক দিয়ে। শহরের সঙ্গে সংযোগ আব্দুজ জহুর সেতু দিয়ে ত্রিপলে মুড়িয়ে ছোট বড় ট্রাক দিয়ে পাচার হয় চিনি।

সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সুনামগঞ্জের সদর উপজেলা ও বিম্বম্ভপুর উপজেলার সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন আসছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ভারতীয় চিনি। এর ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি এই সব এলাকায় দিন দিন বাড়ছে চোরাচালানকারিদের দৌরাত্ম।

অনুসন্ধনে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় বৈঠাখালী এলাকার সুরমা নদীর উপর আব্দুজ জহুর সেতু নির্মাণের পর বদলে যায় এই অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা। আগে শহরে আসতে পাড়ি দিতে হতো সুরমা নদী। কিন্তু এখন সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ার ফলে গাড়ি বা মোটরসাইকেলে করে দ্রুতই চলে আসা যায় সুনামগঞ্জ শহরে।

সরেজমিনে রাত ১২টার পর আব্দুজ জহুর সেতু থেকে বিশ্বম্ভপুর উপজেলার চালবন্দ পয়েন্ট পর্যন্ত গিয়ে দেখা যায়, শীতের কারণে চারদিকে কুয়াশার চাদরে ডাকা। এরই মধ্যে লাইন ধরে দ্রুত গতিতে সুনামগঞ্জ-সিলেট রোডের দিকে ছুটছে ট্রাক। ট্রাকের দিকে লক্ষ্য করতেই দেখা গেলো পলিথিনে মুড়ানো ট্রাক ভর্তি ভারতীয় চিনি নিয়ে যাচ্ছে চোরাকারবারিরা।

আব্দুজ জহুর সেতু থেকে সামান্য দূরে সদর উপজেলা বৈঠাখালি গ্রামের  রাধানগর পয়েন্ট।  সেই পয়েন্ট যেতেই অন্ধকারের মধ্যে চোখ পড়ল একটি মাল ভর্তি ট্রাক। সেই ট্রাকের সামনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে গিয়ে ছবি তুলতে ক্যামেরা চালু করতেই দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। তারা সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়েই ট্রাক রেখে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

ভারতীয় চিনি পাচারকারিদের ড্রাইভার শিবুল দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘গাড়িতে ভারতীয় চিনি আছে। সেগুলো জেলার জাওয়া বাজার এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে আনলোড হয়ে কই যাবে তা আমি জানি না। পুলিশ ট্রাক আটকে ছিল টাকা নেয়ার জন্য কিন্তু তারা এখানে আপনাদেরকে দেখে পালিয়ে গেছে।’

পরে রাধানগর পয়েন্ট থেকে আরও কিছু দূরে চালবন পেন্টে গিয়ে দেখা যায় অন্য চিত্র। সেখানে  গিয়ে দেখা গেল সড়কের দুই পাশে পুলিশের চেকপোস্ট বসানো। কিন্ত সেখানে দায়িত্বরত কোনো পুলিশ সদস্যকে পাওয়া যায়নি। চালবণ পয়েন্ট থেকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বড় বাজার পলাশ বাজারে চা বিক্রেতা করম আলীর সাথে কথা হয়। এই বাজারে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চায়ের ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৪ টা পর্যন্ত দোকান বেচাকেনা হয় তার। চায়ের দোকানে সব সময় লোক সমাগম থাকে। রাতের ক্রেতা মূলত চোরাকারবারিদের সহযোগী শ্রমিকরা।

করম আলী জানান, শুধু পলাশ বাজার দিয়ে চোরাকারবারিরা ভারতীয় চিনি আনে না। উপজেলার অন্য সড়ক দিয়েও প্রতিদিন ভারতীয় চিনি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাজারে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে কোটি কোটি টাকার চিনি, আলু, মসলাসহ বিভিন্ন ভারতীয় অবৈধ পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। তবে বর্তমানে চিনিটাই বেশি যাচ্ছে । রাত ১২টার পর ধনপুর, চিকারকান্দি, বাঘবেড়, চেংবিল, শরীফগঞ্জ, মতুরকান্দিসহ বেশ কয়েকটি সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ৮ থেকে ১০টি ট্রাক ভর্তি চিনির গাড়ি বের করে চোরাকারবারিরা। প্রতিটি গাড়িতে প্রায় ২০০ বস্তা ভারতীয় চিনি থাকে বলে জানা যায়।

ট্রাকগুলো সদর উপজেলার বৈঠাখালি এলাকার রাধা নগর সড়কে আসলে পুলিশকে নগদ টাকা দিয়ে ছেড়ে যায়। অনুসন্ধনে আরও জানা যায়, বিভিন্ন চেকপোস্ট পার হয় ট্রাকগুলো নির্দিষ্ট একটি টোকেন দেখিয়ে। এই টোকেন দেখানো হলে কেউ আর ট্রাক আটকায় না। পুলিশের পাশাপাশি চোরাকারবারিদের একটি চক্র মোটরসাইকেল মহড়ায় ওই সব অবৈধ ভারতীয় চিনির ট্রাক সুনামগঞ্জ পৌর শহরের প্রবেশমুখ হাসন রাজার তোরণ পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে টাকার বিনিময়ে।

অবৈধ ভারতীয় চিনি চোরাকারবারিদের একজন বিশ্বম্ভপুর উপজেলার বাসিন্দা সাইফুলের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান,‘সীমান্ত এলাকায় ২০ থেকে ২২ জন ব্যবসায়ী এই রকম ব্যবসায়ী রয়েছেন। যারা পুলিশসহ বিভিন্নজনকে ভাগ ভাটোয়রা দিয়ে এই চিনির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। ভাই আমি শুধু একা ব্যবসা করি না আরও অনেক লোকেই করে।’

সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশের তথ্য মতে, ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ অভিযানে সুনামগঞ্জে ১৯২.৯ মেট্রিক টন চিনি জব্দ করা হয়, যার বাজার মূল্য ১ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। সেই সাথে ১৯৭ জন চোরাকারবারিকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পুলিশ জড়িত থাকার বিষয়ে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ্কে দেশ রূপান্তর বলেন, ‘চোরাচালানের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা বিষটি গুরুত্বসহকারে দেখব।’