গ্যাসের জন্য হাহাকার

সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে গত জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম রেকর্ড ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সংকট দূর হয়নি। উল্টো সেই সংকট দিনে দিনে প্রকট আকার নিয়েছে। কারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশনসহ সব ধরনের গ্রাহক ধুঁকছে গ্যাস সংকটে। ভয়াবহ এ পরিস্থিতি থেকে সহসা মুক্তির কোনো আশার আলোও দেখা যাচ্ছে না এখন পর্যন্ত।

বর্তমানে দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। বিপুল পরিমাণ এ ঘাটতির কারণে কল-কারখানার উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি দিয়ে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা সীমিত হওয়ায় তাদের আয়ও কমেছে। এমনকি অনেক কারখানার মালিক ঠিকমতো বেতন দিতে পারছেন না। এতে করে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছেন তারা।

সিএনজি স্টেশনের ব্যবসাও লাটে ওঠার উপক্রম। এ ছাড়া সার কারখানা ও অন্যান্য শিল্পও গ্যাস সংকটে ধুঁকছে। গ্যাসের অভাবে বহু বাসাবাড়িতেও ঠিকমতো চুলা জ্বলে না। গ্যাস না পেলেও অনেককে গ্যাসের নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা অন্য উপায়ে রান্নার জন্য বাড়তি ব্যয়ও করতে হচ্ছে।

কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার অনুরোধ জানিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে ওই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়। এ ছাড়া ব্যবসায়ী নেতারা পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেও তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

গ্যাসের এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে কবে তা জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. নুরুল আলম গত সোমবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘কোথায় গ্যাস সংকট?’

কারখানাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে গ্যাস সংকট চলছে। প্রতিকার চেয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে পেট্রোবাংলাকে সম্প্রতি চিঠিও দিয়েছে- এমন উত্তর শুনে জ্বালানি সচিব বলেন, ‘ফোনে এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি সরাসরি দেখা করুন। তখন কথা বলব।’

প্রয়োজনীয় চাপে এবং চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বছরের অন্যান্য সময় গ্যাসের সংকট বেশি থাকলেও শীতকালে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যবহার কমে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মেলে। কিন্তু এবার শীতের শুরুতেই ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় এমনিতেই দেশে গ্যাস সংকট। তার ওপর আবার দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য একটি বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া সেচ মৌসুমের কথা চিন্তা করে বৃহৎ সার কারখানাগুলোতেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ফলে গ্যাস সংকট বেড়ে গেছে।

দেশের অন্যতম রপ্তানি খাত নিট শিল্প ক্রান্তিলগ্ন পার করছে বলে মন্তব্য করে বিকেএমইএ তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমনিতেই পুরো শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এর সঙ্গে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাসের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না। 

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, একটি মধ্যম মানের কারখানায় প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ লাখ টাকার বাড়তি ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর প্রথম সারির কারখানায় এর পরিমাণ ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার মতো। কিন্তু অনেক কারখানার মালিকের বিপুল পরিমাণ এ ডিজেল কেনার সামর্থ্য নেই। নিট শিল্পে প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। আর পরোক্ষভাবে কাজ করছেন আরও ৭০ হাজার মানুষ।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্যাস সংকট এখন চরমে। তিতাস বা সরকার কোন বিবেচনায় একটা জোনের টোটাল গ্যাস বন্ধ করে দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র আর সার কারখানায় দিচ্ছে সেটা বোধগম্য নয়। পুরো নারায়ণগঞ্জ জোনে গ্যাস বন্ধ। ২৪ ঘণ্টায় আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। গত সপ্তাহে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিও দিয়েছি। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমরা কয়েকজন গিয়ে দেখাও করেছি। কিন্তু কেউ কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি। তারা বলেছেন, ২০২৬ সালের আগে এ সংকট সমাধানের কোনো উপায় তাদের কাছে নেই।’

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়ার কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল। আমরা সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখন গ্যাস পাচ্ছি না। কারখানার উৎপাদন অনেক কমে গেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। শিপমেন্ট শিডিউল ফেইল করার কারণে বায়াররা (ক্রেতা) ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে অর্ডার ক্যানসেল করে দেওয়ার কথা বলেছে। নতুন অর্ডার দেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।’

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। ২০২৬ সাল নাগাদ ৪৬টি কূপ খনন ও সংস্কারের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তাতে সফল হলে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা কূপে গ্যাসের সন্ধানও মিলেছে। পাশাপাশি আরও এলএনজি আমদানির জন্য সরকার যে চুক্তি করেছে তাতেও ২০২৬ সালের আগে নতুন গ্যাস আমদানির কোনো সুযোগ নেই। এ কারণেই কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২৬ সালে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে।

তবে আশঙ্কার কথা জানিয়ে একাধিক কর্মকর্তা এও বলেন যে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কূপ খনন ও সংস্কার করে কাক্সিক্ষত গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, সেটা এখনই বলা মুশকিল। তাছাড়া নতুন করে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে যে বিপুল পরিমাণ ডলার দরকার সেটি জোগাড় করা না গেলে আমদানি ব্যাহত হবে। এ সময়ে দেশের পুরনো কূপ থেকে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে। ফলে চলমান সংকট কতটা দূর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ৫৬৭টি পোশাক ও ডায়িং কারখানা পৌনে দুই মাস ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ঢাকা, সাভার, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন কারখানাতেও ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। 

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক হোসেন মেহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনও দিন আছে যেদিন ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাস থাকলেও এর চাপ এতই কম থাকে, যা দিয়ে উৎপাদন করা যায় না। এতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। ওয়েস্টেজের (অপচয়) পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। অন্তত ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে গ্যাস সংকটের কারণে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে আগের চেয়ে অর্ডার নেওয়া কমিয়ে দিয়েছি। এরপরও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে বাজার নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় জরিমানা গুনতে হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।’

রড তৈরির অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আমরা ৬০ শতাংশের মতো গ্যাস পাচ্ছি। বাকি চাহিদা মেটাতে ফার্নেস অয়েল এবং ডিজেল মিশ্রণ করে উৎপাদন ঠিক রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের দাম ৩০ টাকা, সেখানে তেলের দাম ১০৫ টাকা। ফলে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।’

সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের টান পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনগুলোতে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে সংকটের কারণে অন্য সময়েও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। আবার গভীর রাতে যখন গ্যাস থাকে তখন পরিবহনে গ্যাস নেওয়ার ক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কমে যায় বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ঘোষিত বন্ধের সময়ের বাইরেও গ্যাসের অভাবে সকাল ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বেশিরভাগ স্টেশন বন্ধ থাকে। দুপুরের দিকে আর মাঝরাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও কাক্সিক্ষত চাপ থাকে না। গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় পাওয়া যায় মাত্র ২ পিএসআই। এতে গ্যাস থাকা আর না থাকা সমান কথা।’

এ খাতের ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুবই করুণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘লোকসান দিতে দিতে অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমরা সরকারের বিভিন্ন মহলে বারবার আমাদের দুর্দশার কথা জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনে না।’

আবাসিকেও গ্যাস সংকট চরমে ঠেকেছে। রাজধানীর কচুক্ষেত, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, পান্থপথ, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মাণ্ডা, বাড্ডা এবং কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক গ্রাহকরা ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। আবার কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ অনেক কম। যাতে চুলা জ্বললেও রান্না করতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।