সময়ের কারণে দেশে কৃষি অর্থনীতির কলেবর আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। অনেক কৃষিপণ্য এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তা ছাড়া পরিবেশ দূষণ বিবেচনায় বিশে^র মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানের সূচক খুবই খারাপ পর্যায়ে। গেল ২০ বছরে পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে এর সব কটিতেই দেশের অবস্থান তলানিতে। দিন দিন এই সূচক নামছে। এর একটি বড় কারণ হলো নিত্যব্যবহার্য ‘পলিথিন’।
কৃষি ও কৃষকের দেশে পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিনের এই অস্বাভাবিক উত্থান সত্যিই বিস্ময়কর। সোনালি আঁশ পাটকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে এক শ্রেণির সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী সহজলভ্য পলিথিন সামনে এনেছে। এখন নিষিদ্ধ এই পণ্য প্রকাশ্যে ছেয়েছে গোটা দেশ।
রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা থাকলেই পরিবেশ বিনষ্টকারী পলিথিন বন্ধ সম্ভব। সবার আগে একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে, তা হলো পলিথিন কৃষি, পরিবেশ, মাটি দূষণসহ জনস্বার্থের দিক থেকে মারাত্মক ক্ষতিকর। কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি উৎপাদনের বিকল্প নেই। তেমনি দূষণের হাত থেকে মুক্তি, সময়ের দাবি। এসব বিবেচনায় পলিথিন উৎপাদন বন্ধ জরুরি। পলিথিন নষ্ট হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে না। উল্টো মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। পুড়িয়ে দিলেও মাটি হয় না। প্রশ্ন হলো, পলিথিনের বিকল্প কিছু নেই? যখন ক্ষতিকর এই পণ্যটি দেশে উৎপাদন হতো না, তখন কি বিকল্প ছিল না? পলিথিনের বিকল্প হলো পাটের ব্যাগ। যা শতভাগ পরিবেশ সম্মত। স্বদিচ্ছা থাকলেই পাট উৎপাদন বাড়িয়ে ব্যাগ উৎপাদন করা সম্ভব। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইন করে পলিথিন নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি পলিথিন বন্ধ করে পাটের ব্যাগ তৈরির ঘোষণা দিয়েছিল। জেলায় জেলায় ব্যাগ সরবরাহে এজেন্ট নিয়োগেরও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সেই উদ্যোগ এখনো কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন হলো, পলিথিন বাদ দিয়ে পাটের যুগে ফেরত যেতে করণীয় কী? প্রথমত রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা। এই স্বদিচ্ছাই পারে পাটের সোনালি যুগে কৃষকদের ফিরিয়ে নিতে। এ জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আসন্ন। আগামী সাত জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগেই দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি। পলিথিন বন্ধ করে পাটের ব্যাগ বা বিকল্প পরিবেশসম্মত কিছু উৎপাদনে সব রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার প্রয়োজন। যারাই ক্ষমতায় আসবে সেই দল, অগ্রাধিকার প্রতিশ্রুতি হিসেবে তা বাস্তবায়ন করবে। বিরোধী দলগুলোও ছায়া সরকার হিসেবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করলে দ্রুত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে পলিথিন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। তাদের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ, বিপুল সংখ্যক মানুষের বেকার হওয়া থেকে শুরু করে আর্থিক ক্ষতির কথা যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। তেমনি অর্থ দিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত ঠেকানোর চেষ্টা কম হবে না। সরকার যদি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে অনঢ় থাকে, তাহলে কোনো কিছুই সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা নয়। এ ক্ষেত্রে পাটের ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পলিথিন উৎপাদনে যুক্তদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাহলে এ খাতে নিয়োজিত জনশক্তি বেকার হবে না, তেমনি বিনিয়োগকারী ব্যবসায় টিকে থাকার বিকল্প পাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, পাটের পণ্য উৎপাদনের নামে আবারও যেন পলিথিনের জন্ম না হয়। সবার আগে অগ্রাধিকার ভিত্তিক অঙ্গীকার হিসেবে সব পলিথিন উৎপাদনকারী কারখানা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। এ নিয়ে কোনো আপস নয়। তাহলে মানুষ এমনিতেই বিকল্পের দিকে যাবে। দীর্ঘ ১৫ বছরে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষায় ওয়ান টাইম পাটের ব্যাগের প্রচলন করা অসম্ভব ছিল না। বাজারে নিত্যপণ্য বহনের ক্ষেত্রে পলিথিনের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। যা পাটের ব্যাগ দিয়ে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সম্ভব। পলিথিন বন্ধ করে পাট উৎপাদনে যেতে পারলে কৃষকরা এই পণ্য উৎপাদনে ঝুঁকবে। এ কাজে তাদের উৎসাহ যেমন বাড়বে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবেন। উৎপাদন বাড়লে জেলায় জেলায় ছোট ছোট পাটের বেগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা, খাল ও নদী ভরাট হচ্ছে পলিথিনের কারণে। এখানেই শেষ নয়, সাগর ও নদীর তলদেশে পলিথিন জমায় মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক জীবের ক্ষতি করে এবং যেসব প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহারের অনুপযোগী, তা মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে। প্লাস্টিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে, প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে এবং ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্লাস্টিক দূষণে বিশ্বের মধ্যে দশম বাংলাদেশ। সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া হয়। এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এটি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ হাজার প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ লাখের বেশি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। পরিবেশসংক্রান্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির একটি পজিশন পেপার থেকে জানা যায়, পলিথিন বা প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। শেষ কথা হলো, কিছু পণ্য বাজারজাত করতে পলিথিন উৎপাদনের অনুমতি রয়েছে। এই বিবেচনায় সরকারের তরফ থেকে এই পণ্যের শতভাগ উৎপাদন বন্ধ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়। যদিও এটি মেনে নেওয়ার মতো যুক্তি নয়। প্রাথমিকভাবে যদি নিত্যপণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বিকল্প হিসেবে পর্যায়ক্রমে পাটের ব্যাগের প্রচলন মোটেই দূরূহ কাজ নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rajan0192@gmail.com