১৯৭১ সাল ছিল পাকিস্তানের জন্য মহাবিপর্যয়ের একটি বছর। বাংলাদেশের মাটিতে লজ্জাজনক পরাজয়, ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি আর ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে পাকিস্তানে বিরাজ করছিল ভয়াবহ অস্থিরতা। ১৬ ডিসেম্বরে পরাজয়ের পরও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চেষ্টা করেছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। তবে পাকিস্তানিদের প্রবল ক্ষোভ ও সেনাবাহিনীর আক্রোশে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন ইয়াহিয়া খান। ১৮ ডিসেম্বর পাকিস্তান এয়ারলাইনসের বিশেষ বিমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় একাত্তরের আরেক খলনায়ক জুলফিকার আলি ভুট্টোকে দেশে ফেরত আনার জন্য। দেশে ফিরেই ২০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন ভুট্টো। এদিকে দেশে ফেরার পথে ভুট্টোর বিমান লন্ডনে একটি যাত্রাবিরতি করেছিল। যেখানে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ভুট্টো। সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন একটি টিভি চ্যানেলকেও। চার মিনিট ছয় সেকেন্ডের একটি সাক্ষাৎকার এখন ইউটিউবে পাওয়া যায়। যে সাক্ষাৎকারে তিনি তখনো দাবি করেছিলেন, পাকিস্তান এখনো অখণ্ড রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সেই সাক্ষাৎকারটি দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ ও ভূমিকা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজ।
উপস্থাপক : জনাব ভুট্টো, আপনি কি মনে করেন, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের এখন ক্ষমতা আপনার হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : এখানে বসে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া একটু কঠিন। এই বিষয়ে কথা বলতে হলে আমাকে আগে পাকিস্তানে যেতে হবে। আমি পাকিস্তানে ফিরে এ নিয়ে মন্তব্য করব।
উপস্থাপক : আপনার কি মনে হয়, আপনার এখন দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় এসেছে?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : দেখুন, আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। যদি মঙ্গলগ্রহ থেকে কাউকে নিয়ে এসে ক্ষমতায় বসানো যায় সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু পাকিস্তানের মানুষের উদ্বেগের জায়গাটা দেখুন। তারা এক বছর আগেই তাদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আমাকে নির্বাচিত করেছে।
উপস্থাপক : পাকিস্তানের বাইরে আপনি বলছেন, এই সরকার কিছু ভুল করেছে।
জুলফিকার আলি ভুট্টো : অবশ্যই।
উপস্থাপক : কী ধরনের ভুল?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : এই যুগে এসেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অযথা-অযৌক্তিক বিলম্ব করা হচ্ছে। আমার মনে হয় এটা চরম অন্যায়। ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা আরও আগেই ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
উপস্থাপক : কাদের হাতে?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : আমাদের কাছে। নির্বাচিতদের কাছে। নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং ফলাফলও ঘোষিত হয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবেও একটা মীমাংসা করতে পারতাম। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে যদি সামরিক শাসনের প্রয়োজন হয়, আমি বলব না যে এটা ভুল কিছু। প্রত্যেক দেশই এই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আবারও রাজনৈতিক কার্যকলাপের আশ্রয় নিতে হতো। রাজনৈতিকভাবেই একটা ফয়সালায় যেতে হতো।
উপস্থাপক : পাকিস্তানের অবস্থা এখন কেমন মনে হয়?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : খুব বাজে পরিস্থিতি। কিন্তু আমরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসব। আমি আশা করছি এবং বিশ্বাস করি, সারা বিশ্ব আমাদের অবস্থানকে সমর্থন করবে। সাধারণ পরিষদে এরইমধ্যে রাজনৈতিকভাবেও আমাদের জয় হয়েছে। আমরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াব। আমি এ ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী।
উপস্থাপক : যুদ্ধপরবর্তী পাকিস্তানের নতুন পরিস্থিতি আপনি কীভাবে সামলাবেন?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : প্রথমত, আমাদের কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কিছু মৌলিক বিষয়ের সংস্কার করতে হবে। পাকিস্তানের দরিদ্র মানুষেরা নিজেদের দেশে যাতে একটু ভালো থাকতে পারে, এটি নিশ্চিত করতে হবে।
উপস্থাপক : আপনি কি এখনো পাকিস্তানকে একটি দেশ হিসেবে দেখেন?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : অবশ্যই। দেশ একটাই।
উপস্থাপক : এটি কি বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : অবশ্যই বাস্তবসম্মত। বাস্তবতা কী তাহলে? সাময়িক পরিস্থিতি কখনো বাস্তবতা হতে পারে না। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের ধারণা, পাকিস্তানের আদর্শ এভাবে ধ্বংস হতে পারে না।
উপস্থাপক : পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটেছে, সেখানকার জনগণ আলাদা হতে চায়, তাদের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ কি এখনো বুঝতে পারছেন না?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : না। তারা সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল। আর সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন এবং বিচ্ছিন্নতার মধ্যে একটা চিকন সীমারেখা আছে। আবার এই সীমারেখাকে ছোট করেও দেখানো যায়।
উপস্থাপক : বিশ্বের যেসব দেশের সরকার বাংলাদেশের সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
জুলফিকার আলি ভুট্টো : এটা এক ধরনের শত্রুতাপূর্ণ আচরণ। দেখুন, ব্রিটিশরা খুব মহান জাতি। তাদের প্রতি আমাদের মুগ্ধতা আছে। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের সরকার যেভাবে সব সময় অন্যায্য পক্ষপাত করেছে, তা নিয়ে আমি ভয় পাই। পুরো ঘটনা বলতে গেলে আলোচনা দীর্ঘ হবে।
উপস্থাপক : শেষদিকে ভারতের পদক্ষেপকে ব্রিটিশরা সমর্থন করেনি...
জুলফিকার আলি ভুট্টো : দেখুন, ভারতীয়রা প্রতিনিয়ত মিসাইল ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র পাচ্ছিল। ব্রিটিশ কারখানাগুলোতে দিনরাত কাজ করে অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছিল এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতকে উসকে দেওয়া হয়েছিল।
উপস্থাপক : কিন্তু ব্রিটিশরা তো তাদের বিদ্যমান চুক্তির শর্তপূরণ করছিল...
জুলফিকার আলি ভুট্টো : হ্যাঁ, চুক্তির শর্ত প্রতিপালন হচ্ছিল। কিন্তু কিছু চুক্তি ভাঙাও হচ্ছিল। আমি জানি না, কূটনীতির ইতিহাসে বিভিন্ন ইস্যুতে কয়টা শর্ত মানতে হয়, কয়টা মানতে হয় না। সত্যি কথা বলতে, আইন টেনে আপনি আমাদের নির্দয় বলতে পারেন। আমি আপনাকে এমন অনেক উদাহরণ দেখাতে পারি, যেখানে ব্রিটিশরা অনেককেই দায়মুক্তি দিতে আইন ভেঙেছে। সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু ব্রিটেন মনে করে, উপমহাদেশ ভাগ করে তারা সম্ভবত ভুল করেছিল। আর সেই ভুলের খেসারত দিতেই এখন এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এখানে চায়ের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। পাটের স্বার্থ জড়িয়েছে। পাশাপাশি জড়িয়ে আছে বাণিজ্যিক স্বার্থ। কিন্তু আমি এত কথা বলতে চাই না। বড়দিনের উৎসব চলছে। ব্রিটিশদের প্রতি রইল বড়দিনের শুভেচ্ছা।