দেশের কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ছাদে অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুতের প্যানেল বসানোর সুযোগ রয়েছে। যার মাধ্যমে বছরে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১১ হাজার ৩২ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গত সোমবার প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যে হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে এবং আগামী বছর আরও বাড়লে, তাতে করে ছাদে সৌর প্যানেল বসানো ভবন মালিকদের জন্য বেশ লাভজনক হবে। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এর সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অর্থনৈতিক সুবিধা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারের অর্থনৈতিক সুবিধা স্পষ্ট হলেওগ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, বিনিয়োগ ঝুঁকি নিয়ে দুশ্চিন্তা, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও চলমান আর্থিক সংকটের কারণে এই খাতটি এখনো প্রারম্ভিক পর্যায়ে আছে বলে উল্লেখ করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ফ্যার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার কারণে প্রতি বছর পিডিবির বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি হয়। তাই যদি শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে ২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরপ্যানেল বসানো হয়, তাহলে বিপিডিবি বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কেনা বাবদ ৪৭৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ছাদে সৌরপ্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে মাত্র ১৬০ দশমিক ৬৩ মেগাওয়াট। ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধা ছাড়া এক মেগাওয়াট অনগ্রিড সৌরবিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় হয় পাঁচ টাকা। শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় যথাক্রমে নয় টাকা ৯০ পয়সা ও ১০ টাকা ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে প্রতি ইউনিটের বিপরীতে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে চার টাকা ৯০ পয়সা থেকে পাঁচ টাকা ৫৫ পয়সা সাশ্রয় করা সম্ভব।
গবেষণাটির প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, এ ধরনের সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার জাতীয় গ্রিডের ওপর অনেক চাপ কমাবে। যেমন- ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ মাসের মধ্যে আট মাস দৈনিক এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি সময় লোডশেডিং হয়েছে। ওই সময় যদি অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট রুফটপ সোলার থাকতো, তবে লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হতো না, কমতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারও।
এভাবে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ দেশের শিল্প উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে সহযোগিতা করবে, একইসঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানির পরিমাণ কমিয়ে রিজার্ভ স্থিতিশীল রেখে অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে বলে মনে করেন এই গবেষণা-প্রধান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার জন্য অতীতে বহু ভবনের ছাদে নিম্নমানের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছিল, যা ভবন মালিকদের নতুন করে এ ধরনের প্যানেল স্থাপনের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত সোলার হোম সিস্টেমগুলো গ্রিডের বাইরে থাকা দুই কোটি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। কিন্তু এর সুযোগ নিয়ে বাজারে কমদামের ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ছড়িয়ে পড়ায় ওই অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে।
সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানি খরচ কমানোর সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের কর-ব্যবস্থা ছাদের সৌরবিদ্যুৎকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে।