আগে নিজের দিকে তাকাই

হজরত আলী (রা.)-এর একটি মহান উক্তি ‘যখন দেখবে দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছে, ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছে, মূর্খরা মঞ্চে বসে আছে, জ্ঞানীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, শাসকরা মিথ্যা কথা বলছে তখন বুঝবে একটি দেশ ও সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে।’ সম্প্রতি ৯০ ডিগ্রি পাল্টিয়ে যাওয়া নীতিভ্রষ্ট এক ব্যক্তির কথা উঠতেই সহমর্মী এক বন্ধু বঙ্গবন্ধুর একটি মহান উক্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে পুরোটা সঠিকভাবে স্মরণে আনতে পারলেন না। হাতের কাছে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’টাও ছিল না। ফলে যতটা মনে করতে পারলেন তার মর্মার্থ হলো ‘নীতিহীন রাজনীতিকদের নিয়ে জনকল্যাণের কাজে নামতে নেই।’ অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের আগে ও পরে, দলবদল ও সরকার গঠনের নাটকীয় মুহূর্তগুলো বঙ্গবন্ধু তুলে ধরেছেন স্বচ্ছ আয়নার মতো। এ সময়কার আরেকজন বর্ণচোরা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির বয়ান, নাম বলা নিষেধ বিধায় প্রতীকী হিসেবে তুলে ধরলে এমন দাঁড়ায় মেঘনা-গোমতীর তীরঘেঁষে একটি গ্রাম, নাম তার সুবর্ণগ্রাম। সেই গ্রামের এক সময়ের সুশীল পড়ুয়া সুকোমল বসাক প্রথম জীবনে স্থানীয় হাইস্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। গ্রামেগঞ্জে তখন কার্ল মার্কস চর্চা জোরেশোরে সবে শুরু হয়েছে। ওস্তাদ-সাগরেদরা ও উঠতি আঁতেলরা সে সময় সেরখানেক ফিদেল ক্যাস্ত্রো, আধা কেজি পরিমাণ ট্রটস্কি, পরিমাণ মতো টিটো, মাও সেতুং ও মার্টিন লুথার কিং, চার চা চামচ চৌচেস্কু ইত্যাদিদের অধ্যয়নে সময় কাটাত। সুকোমল গাঁও-গেরামের অর্থনীতির আলোচনায় আঁতেল ভাবই শুধু প্রকাশ করত তা নয়, ঢাউস প্রকৃতির বই লেখার পাঁয়তারাও ছিল তার। তার ছিল সুবর্ণগ্রাম হাইস্কুলের হেডমাস্টার হওয়ার বড় শখ, কিন্তু স্কুলে হঠাৎ করে তো কেউ হেডমাস্টার হতে পারে না এবং তখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এত উন্নতি সাধিত হয়নি যে, কেউ তদবির-তেলেসমাতিতে বা বিশেষ ক্ষমতাবলে হেডমাস্টার কেন, কয়েক বছর পড়িয়েই প্রফেসর হতে পারেন। তাই তিনি হঠাৎ হোমরা-চোমরা হওয়ার জন্য গ্রামের চৌধুরীবাড়ির বড় কেরানির চাকরিতে নাম লেখালেন। গোটা গ্রামে তখন চৌধুরী পরিবারের প্রতিপত্তি যেমন ছিল, একই সঙ্গে নিবু নিবু অবস্থায় ছিল মুখুজ্জেদেরও প্রভাব।

বড় চৌধুরী হরিচরণ বাবু হঠাৎ হার্টফেল করলেন। সর্বেসর্বা ক্ষমতাধরের এমন অন্তর্ধানে চৌধুরীপাড়ায় তো বটেই, গোটা মোকামে মড়ক লেগেছে ঠাহর হলো। সবাই হতভম্ব। এমন অবস্থায় মদন মুখুজ্জেদের মুখে চন্দন, কমলকান্ত মুখুজ্জে তার প্রভাব প্রতিপত্তির পসার সাজানো শুরু করেছে। চৌধুরীদের দহলিজ থেকে মুখুজ্জেদের দস্তরখানায় পাত্র নিলেন বসাক বাবু। তার এই রাতারাতি ভোল পাল্টানোয় সবাই আশ্চর্য হলো বৈ কী। শুধু তিনি একা নন, সুকোমল বাবুদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে কমল বাবুর সভায় স্থান করে নিয়েছে। কমলকান্ত গ্রামের উন্নয়নের নামে বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিলেন। তিনি নিজেই উন্নয়নের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মানুষের উন্নতি কীভাবে হবে, কীভাবে মানুষ সহজে সুপেয় পানি পাবে, বিদ্যুৎ পাবে, গোলাভরা ধান পাবে, পুকুরভরা মাছ পাবে, আরও কত কী স্বপ্ন দেখা ও দেখানো শুরু হয়ে গেল সুবর্ণগ্রামে। কমল বাবুর কর্মসূচির মধ্যে গ্রামের যত খানাখন্দ, পুকুর-পুষ্করিণী, খাল-বিল সবটাকে খনন করে সেখানে সুপেয় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। খনন করা খাল ও পুকুর পাড়ে লাগানো শুরু হয়ে গেল ফল, ফসল, পাট ও ধান। সঙ্গে শুরু হলো মাছ চাষের আর্ট ও গান। এসব কাজ-কর্মে কমল বাবু আর সুকোমল বসাক হঠাৎ করে যেন পরস্পরের ভাবশিষ্য ও হরিহর আত্মা হয়ে গেলেন। রাত-দিন খাল খনন কাজে সুকোমল বসাক এমনভাবে নিজেকে জড়ালেন যেন মনে হচ্ছিল কমল মুখুজ্জের এমন ভক্ত কুশিলব ভূভারতে আর জন্মায়নি। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। তাতে বসাক বাবুর পসারও বাড়তে লাগল। তরতর করে পেয়ে গেলেন পদোন্নতি। তিনি হোমরা-চোমরা হয়ে মাঝে মধ্যে বড় বড় বিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিতে যান। মোটামুটি একজন বুদ্ধিদীপ্ত কামলার পর্যায়ে উঠে গেলেন তিনি।

কমলাকান্ত বাবু চাপাডাঙ্গায় নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে বর্ষণমুখর ভোরে খুন হলেন। এই অদৈব দুর্বিপাক দুর্ঘটনায় মুখুজ্জেদের বাড়িতে সবাই মুষড়ে পড়লেন। উপায়ান্তর না দেখে বসাক বাবু এই সুবাদে তীর্থযাত্রী হওয়ার বাসনা বা ফন্দি আঁটলেন। মথুরায় তার এক পিসি থাকত। তার আমন্ত্রণে তিনি মথুরায় পাড়ি জমালেন। সেখানে তিনি তার পসার বাড়াতে চেষ্টিত হলেন। বসাক বাবু বরাবরই মেধাবী, চৌকস, বাগ্মী ও বাক্যালাপে বেজায় শব্দ নির্মাণের শক্তি তার ছিল। সে সব চালবাজি খাটিয়ে বসাক বাবু প্রায় আট বছর মথুরায় কাটিয়ে আবার গাঁয়ে ফিরলেন। এবার মনে হলো এ যেন খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। গ্রামে তখন আবার চৌধুরীদের প্রভাব জাগতে শুরু করেছে। সবাই বিস্ময়ে একদিন দেখল কমল মুখুজ্জের কাছের কামলা খাটা সেই বসাক বাবু হঠাৎ করে চৌধুরীবাড়ির বড় দিদিমণির প্রেমে পড়ে গেলেন। হরিচরণ চৌধুরীর মেধাবী মেয়ে বিদেশে কূটকৌশল রপ্ত করে গ্রামে ফিরে এসেছে। ক্রমে ক্রমে সবার দিদিমণি গ্রামের মাথার মণি হওয়ার পথে। দিদিমণির ডাকসাইটে সহযোগী হওয়ার বাসনা বসাক বাবুর মধ্যে জেগে উঠল তীব্রভাবে। মোক্ষম এ সময় দিদিমণির ভালোবাসা লাভের আকাক্সক্ষায় সুকোমল বসাক গ্রামের সুবোধ ও সুশীল কুল ব্রাহ্মণদের ‘শ্রীকৃষ্ণের বাঁশরী সুরে উতলা’ হতে উদ্বুদ্ধ করলেন। শেষমেশ কৃষ্ণরূপী বসাক বাবুর বাঁশরী শুনে সব সুশীলরা ঘরের বের হলো। হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালার মতো গাঁয়ের যত ছোট-বড় মুটে মজুররা তার পিছু নিল। গাঁয়ের সবাই প্রমাদ গুনল। সুশীলদের মর্যাদা, মান্যি গন্যি সব হাওয়ায় উড়ে গেল। হঠাৎ করে বড়-ছোট জ্ঞান সকাল-বিকেলের পালাবদলে দুধ ও ঘোল তেল ও ঘির মধ্যে একাকার হতে শুরু করল। বাড়ির লক্ষ্মী ঘরের লক্ষ্মী সুশীলদের এভাবে একূল-ওকূল বরণের খেলায় সবাই আঁতকে উঠল। এভাবে চৌধুরীরা যে তালুক পেল সেই তালুকে ভোল পাল্টানোয় পটীয়সী বসাক বাবু সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন। ঘরের সৌন্দর্য যেসব ললনারা তার কথা শুনে যারা জাতকুলের মান খেয়ে কৃষ্ণের বাঁশি শুনে বের হয়েছিল তাদের বেশ এনাম দিয়ে পুরস্কৃত করা হলো। আর যারা তার কথা রাখেনি তাদের ঘরছাড়া করা শুরু হয়ে গেল। যা হোক, বছর পাঁচেক পর মুখুজ্জে বাড়ির বৌ সুদামণি দেবী চৌধুরীবাড়ির দিদিমণির বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে গেল। অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে প্রথম বেকায়দায় পড়লেন বসাক বাবু নিজে। এখন বসাক বাবু কোথায় দাঁড়াবেন? বারবার পক্ষ ত্যাগ করায় ওস্তাদ বর্ণচোরাদের মতো বসাক বাবুর এবার একঘরে হওয়ার জোগাড়। কমলকান্ত বাবুর সঙ্গে তার এক সময়কার সখ্যের সূত্রধরে তার কুলরক্ষা হলো না এবার। তিনি এ-গাঁ সে-গাঁয় গা-ঢাকা দিয়ে বেড়ান। কয়েক বছরের মাথায় বেজায়নক গোলমাল বেঁধে গেল গ্রামে। ফণী মন্ডলের ছেলে ননিগোপাল হঠাৎ করে মাতব্বরি নিয়ে নিল সুবর্ণগ্রামের। তখন তার দাপট আর দেখে কে! সে প্রথমে এসে বসাক বাবুদের মতো বসন্তের কোকিলদের কাবু করতে একঘরে আটকাল। সে ঘরে বসাক বাবুকে যে কদিন যেভাবে রাখা হয়েছিল বাবু তার বর্ণনা করে তিনি নিজেই একখানা বই লিখে ফেললেন। তাকে কীভাবে কথায় কথায় ঠাট্টা-মশকরায় মাথায় ঘোল ঢেলে দিয়ে হেনস্তা ও অপমান করা হয়েছে সে সব কথা সবাইকে বলার বাসনা থেকে তিনি বইটা ছাপার উদ্যোগ নিলেন। তবে বাবুর মনে হলো এ কদিনে তার মাথায় নতুন অনেক বুদ্ধিও গজিয়েছে। এসব হেনস্তায় একবার তার ধারণা হলো তার শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়া উচিত। বারবার ভোল পাল্টিয়ে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তা নিয়ে একখানা ভালো পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে পারবেন তিনি। বাল্য ও কিশোরকালে যে নোট বই তিনি বা তানারা পড়তেন তার সেই বইয়ে জিপিএ ফাইভ না হলেও অন্তত প্রশ্ন ফাঁস রোধের দাওয়াই হিসেবে কাজে লাগতে পারে।

এই বই একজন অভিজ্ঞ হেডমাস্টারের তাজ তার মাথায় পরাতে পারে। বাবু এটাও তবক নিলেন যে কীভাবে টাকাপয়সা নয়-ছয় করা যায়, না আঁচিয়ে কামানো যায়, সরানো যায়, বাঁচানো যায়। বসাক বাবুর দিব্যচোখ খুলে গেল। ব্যস, ইতিমধ্যে চৌধুরীরা আবার সুবর্ণগ্রামের প্রভু হয়ে উঠল। তারা বসাক বাবুর প্রতি মুখ ফেরালেন। বাবুর জ্যোতি বেড়ে গেল। এবার বয়োবৃদ্ধ বাবু ক্ষমতায় থাকার সুবাদে টাকাপয়সা সরানোর ব্যবসায় নাম লেখালেন। গ্রামের বড় বড় ব্যবসায়ী, কন্ট্রাক্টর ও সরল মানুষের টাকা নয়-ছয় করার কাজে ও লেনদেনের ব্যবসায় বাবু বেশ বিশ্বস্ত ও এক্সপার্ট হেডমাস্টার হয়ে উঠলেন। ঘরের টাকাপয়সা গয়নাগাটি হাতিয়ে নেওয়ার কাজে তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একদিন তিনি সবাইকে পথে বসিয়ে ছাড়লেন। স্কুলের চাকরি পাওয়ার বয়স তার আর নেই। তথাপি সবাই তাকে হেডমাস্টার হিসেবে মান্যি গন্যি করতে করতে সবাই গালমন্দ করতে শুরু করল। বর্ণচোরাদের বন্যায় বসাক বাবু ভেসে গেলেন যেন। বাবুর মাথায় গজাল মস্তবড় উপলব্ধি এই ডিজিটাল যুগেও সবাইকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে নিজেকে চালাক ভেবে বিজয়ী হতে হলে আসলে আগে নিজের দিকে তাকানো প্রয়োজন। যেমন কথায় আছে না, চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম।

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক

mazid.muhammad@gmail.com