ওয়ানডেতে আর ভালো নেই বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ওয়ানডেতে ভালো দল, কথাটা শোনা গেছে অনেকের কণ্ঠেই। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল থেকে শুরু করে অনেকেই অনেক সময় বলেছেন যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিনটি সংস্করণের ভেতর ওয়ানডেতেই ভালো বাংলাদেশ। টেস্টের সংস্কৃতি নেই কিংবা টি-টোয়েন্টির উপযোগী শারীরিক শক্তিমত্তার অভাবের প্রসঙ্গ যেমন এসেছে তেমনি সমান্তরালে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ৫০ ওভারের ক্রিকেটের চর্চার কথাও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশকে আর ওয়ানডেতে ভালো দল বলার উপায় নেই। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৩১টা ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ, বাকি আছে মাত্র একটি (নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে, কাল)। বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র ১০ ম্যাচ, যার ৪টাই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে।

ঠিক আগের বছরেই বাংলাদেশ ১৫ ওয়ানডে খেলে জয়ী হয়েছিল ১০ ম্যাচে। এই বছর ম্যাচ সংখ্যাটা দ্বিগুণের বেশি হলেও জয়ের সংখ্যা সমান। এশিয়া কাপ এবং বিশ্বকাপের বছরে আরেকটু সাফল্য প্রত্যাশিত থাকলেও উলটো পতন হয়েছে বাংলাদেশ দলের। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান এবং নিউজিল্যান্ডের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ। এশিয়া কাপে নিয়মরক্ষার সবশেষ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জয় আর বিশ্বকাপে আফগানিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ে কোনোরকমে অষ্টম হয়ে আসর শেষ করা বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী সময়টাও ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি। নিউজিল্যান্ড সফরে দুটো ম্যাচেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে না তুলেই হেরেছে বাংলাদেশ।

ওয়ানডে সুপার লিগের শীর্ষে ওঠা, সেজন্য আইসিসির প্রশংসা কিংবা ক্রিকেটারদের কথায় যে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা; সেই কল্পনার ফানুস উবে গেছে বিশ্বকাপে। এরপর সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে একটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ওয়ানডে দল পারছে না প্রত্যাশিত ফল করতে। তবে এজন্য খেলোয়াড়দের খুব একটা দায় দেখছেন না ক্রিকেট বিশ্লেষক নাজমুল আবেদীন ফাহিম। বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক কোচ ফাহিম মনে করেন, ক্রিকেটের পরিবর্তিত নিয়মের সঙ্গে আর পেরে উঠছে না বাংলাদেশ, ‘বাংলাদেশ একটা সময় ওয়ানডেতে ভালো দল ছিল, বিশেষ করে ২০১৬-১৭ এই সময়টায়। তবে সেটা একটা বিশেষ কন্ডিশনে। দেশের বাইরে তখনো আমাদের পারফরম্যান্স যে খুব ভালো ছিল তা নয়, দেশের মাটিতে ভালো ছিল। এখন আর তা নেই।’ কেন এই অধঃপতন তার কারণ ব্যাখ্যায় ফাহিম বলেছেন, ‘ওয়ানডেতে দুটো নতুন বলের ব্যবহার বাংলাদেশের সামর্থ্যকে কমিয়ে দিয়েছে। দুটো নতুন বল মানে পেসাররা সুবিধা পাবে, স্পিনাররা কম পাবে। বাংলাদেশে এই সময়ে বেশ ক’জন পেসারকে দেখা গেলেও আমাদের বোলিংটা মূলত স্পিন নির্ভর। সেই স্পিনারদের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং-এর প্রভাব পড়ছে ওয়ানডেতে। বড় দলগুলোর খেলোয়াড়রা বছর জুড়েই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে টি-টোয়েন্টি খেলে, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সেই সুযোগটাও কম হয়। এর ফলে অন্য দলগুলো যে গতিতে রান তুলছে, বাংলাদেশ সেটা পারছে না।’

বাংলাদেশে ক্রিকেট চর্চার বেশিরভাগটা জুড়েই ৫০ ওভারের ক্রিকেট। দেশের প্রধান ক্রিকেট প্রতিযোগিতা ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ হয় ৫০ ওভারের সংস্করণে। সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯ সংক্রমণের জন্য ২০২১ সালে এই লিগ টি-টোয়েন্টি সংস্করণে আয়োজন করা হয়েছিল। এর বাইরে বেশিরভাগ জেলার লিগগুলোও হয় ওয়ানডে ক্রিকেট সংস্করণে। ঢাকা লিগে খেলতে ওয়াসিম আকরাম, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, নেইল ফেয়ারব্রাদারের মতো ক্রিকেটাররা একসময় এলেও এখন ভারতের মাঝারি স্তরের কিংবা অনামি ক্রিকেটারদেরই বেশি খেলতে আসতে দেখা যায়। ঢাকা লিগের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষয়িষ্ণু মানও বাংলাদেশের ওয়ানডেতে ক্রমশ খারাপ করার পেছনে দায়ী বলে মনে করেন ফাহিম, ‘ঢাকা লিগে আগের চেয়ে খেলোয়াড়দের টাকা-পয়সা বেড়েছে, বেশি টাকা দেওয়া দলও বেড়েছে কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়েনি। বরং কমেছে। ঢাকা লিগে আগে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা ছিল এখন আর সেটা নেই। খেলোয়াড়রা নিজেদের জন্য খেলে, প্রতিটা ম্যাচই তাদের কাছে সিলেকশন ম্যাচ। সবাই খেলে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য।’ সেই সঙ্গে প্রকৃত অর্থে প্রতিভার মূল্যায়নও করা হচ্ছে না বলে মনে করেন ফাহিম, ‘শুধু কে কত রান পেল আর উইকেট পেল এই সব দেখার জন্যই লিগ না। লিগে কোন খেলোয়াড় কোন পরিস্থিতিতে, কাদের বিপক্ষে রান করেছে সেটাও দেখা দরকার। কেউ হয়তো অল্প রান করেছে, কিন্তু দলকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে জিতিয়েছে। এসবেরও মূল্যায়ন হচ্ছে না।’

এই বছর সবচেয়ে বেশি ৩৬টা ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চলমান ম্যাচের আগ পর্যন্ত ৩৫ ম্যাচে ভারত জিতেছে ২৬ ম্যাচ। হারজিতের অনুপাত ৩.৭১৪। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ২২ ম্যাচের ভেতর জিতেছে ১৪টি, নিউজিল্যান্ড জিতেছে ৩২ ম্যাচের ১৫টি। এমনকি ক্ষয়িষ্ণু শ্রীলঙ্কা, যাদের বাছাইপর্ব পার করে বিশ্বকাপে আসতে হয়েছে তারাও ৩১ ম্যাচের ভেতর জিতেছে ১৬টি। ৩১ ম্যাচে বাংলাদেশের ১০ জয়ের বিপরীতে ১৮ হার আর ৩টি ম্যাচ হয়েছে পরিত্যক্ত। বিশ্বকাপের এই বছরটা বাংলাদেশের জন্য হতে পারত প্রাপ্তির, কিন্তু হয়ে গেল চরম হতাশার।