দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থী হয়েছেন ১ হাজার ৮৯৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ৩৮২ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে ১৫২ জন প্রার্থীই ঈগল প্রতীক বেছে নিয়েছেন। আর ৭০ জন ট্রাক। বাকিরা অন্য প্রতীকে। এই বিশাল স্বতন্ত্রের বহর হঠাৎ করেই এবারের নির্বাচনের বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। রাজনীতির মাঠে বড় দল বিএনপির নির্বাচনে অনুপস্থিতিতে নির্বাচন অর্থবহ করতে সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবার ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। যেহেতু অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে বিদেশিদের চাপ রয়েছে। এই চাপ কমাতে এবং বিএনপিবিহীন নির্বাচন অর্থবহ করতে ও শরিক দলগুলোর দাপট কমাতে বিপুল পরিমাণে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে এবার নির্বাচনের মাঠে এনেছে। যার মধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নবঞ্চিতরাই বেশি। মূলত আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নবঞ্চিতরাই স্বতন্ত্র হিসেবে ঈগল প্রতীকে লড়ছেন। যেন ভোটের মাঠে অন্যদের কাছে থেকে আলাদা করা করা যায়। কিন্তু কেন এই কৌশল?
নির্বাচন মানেই তো বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা। তা-ই হওয়ার কথা নির্বাচনের মাঠে। বিরোধী দলগুলো সরকার পরিবর্তনের জন্য লড়াইয়ে নামবে। এ কারণে সরকারকেও কঠিন লড়াই করতে হবে আবারও ক্ষমতায় আসার জন্য। বিগত দুই সংসদ নির্বাচনে তেমনি ঘটেনি। এবারও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরকার পরিবর্তনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিল তিন হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে থেকে ২৬৩ জনকে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এর বাইরে ১৪ দলীয় শরিক দলগুলোর মধ্যে ৬টি এবং ২৬ আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫টি আসনে আওয়ামী লীগের নির্ভরতা স্বতন্ত্ররা। যদিও ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী তিন শতাধিক। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট দলগুলোকে নিজেদের মতো করে নির্বাচন করার জন্য চাপ দিয়েছে। এ লক্ষ্যেই দলের মনোনয়নবঞ্চিতদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা দেয়নি। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো সবাই চেয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে। বিশেষ করে ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টি। যেটা গত দুটি নির্বাচনে হয়ে এসেছে। কারণ আসন ভাগাভাগি করলে নির্বাচিত হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এ কারণে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দেনদরবার দরকষাকষি হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। তখনো দলীয় স্বতন্ত্রদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কৌশল জানত না অন্য দলগুলো। এই গুমর ফাঁস হয় প্রতীক বরাদ্দের পর। যেখানে স্বতন্ত্ররা একটি দল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছোট দলগুলোর শঙ্কা আরও বাড়ল। কারণ আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া আসনগুলোতে নির্ভার ছিল ছোট দলগুলোর। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে তো আর রফাদফা হয়নি। আবার আওয়ামী লীগও বলেনি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ছাড় দেওয়া আসনগুলোতে লড়বে না। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া আসনের স্বতন্ত্ররা মূলত লড়বে অন্য দলগুলোর সঙ্গে। যেটা আওয়ামী লীগেরই ছায়া দল মাত্র। এতে কিছু আসন চলে যেতে পারে আওয়ামী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে।
কিছু দিন ধরেই আলোচনা চলছে বিরোধী দলের আসনে কে বসতে যাচ্ছে এ নিয়ে। মূলত বিএনপির পর বড় দল বলতে গত দুই সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে এবারও ধরা হচ্ছিল বিরোধী দল হিসেবে। যদিও সরকারি দলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে গত দুই নির্বাচনে বিরোধী দলের আসনে বসেছে দলটি। এবারও তারা তাই করেছে। কিন্তু শঙ্কা থেকে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্রদের ঘিরে। মূলত আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিএনপিকে নির্বাচনের আনার চেষ্টা যেমন ছিল, তেমনি বিএনপি ছাড়া কীভাবে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ করা যায় সে চেষ্টাও করেছে। এ চেষ্টার ফসল তৃণমূল বিএনপি। বিএনপির সাবেক দুই নেতা তৈমূর আলম খন্দকার ও শমসের মবিন চৌধুরীকে দিয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। তৃণমূল বিএনপি আশা করেছিল বিএনপি থেকে অনেকে নির্বাচন করতে মুখিয়ে আছে এবং তাদের আহ্বানে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী সাড়া দেবে। কিন্তু কার্যত যা ঘটেছে ঠিক উল্টো। তৃণমূল বিএনপি সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি। এমকি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত ১৩৩ আসনের বেশি প্রার্থী দিতে পারেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট বিএনএফ মাত্র ৪৫টি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে। তাদের দিয়ে নির্বাচনে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত তৈরি করা সম্ভব না। নির্বাচনের মাঠে তাদের পরিচয় কিংস পার্টি হিসেবে। যাদের হাঁক-ডাক আছে কিন্তু জনসমর্থন নেই। ভোটের মাঠে তাদের অবস্থান প্রায় শূন্য।
গেল বছর মার্কিন ভিসানীতি ঘোষণার পর সরকার পতন ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামে বিএনপি। সারা দেশে সমাবেশ করতে পারলেও ঢাকায় বড় জমায়েত হতে দেয়নি সরকার। ওই সমাবেশ পণ্ড হয় এবং দলের সিনিয়র নেতারা জেলেও যায়। এরপর থেকে বিপুল পরিমাণে নেতাকর্মীদের নামে মামলা-ধরপাকড় চলে দেশ জুড়ে। এ অবস্থার মধ্যেই চলতি বছরও দলটি আন্দোলন করে গেছে। নির্বাচন ঠেকাতে বিদেশিদের সহায়তা নিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা প্রকাশ্যেই বিএনপির হয়ে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই বলে আসছে, বাংলাদেশে অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় তারা। এ লক্ষ্যে বিরোধী দলকে রাজনীতির মাঠে সমান সুযোগ তৈরি করাও তাদের লক্ষ্য। চলতি বছরের শুরু থেকে বিএনপি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরেছে। তাদের এ দাবির সঙ্গে কয়েকটি সমমনা দলও একাত্মতা পোষণ করেছে।
তবে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সরকারের চেষ্টাও কম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষনেতারা বিএনপিকে নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। একদিকে আহ্বান, অন্যদিকে মামলা, গ্রেপ্তার ও সাজার মাধ্যমে বিএনপির ওপর চাপ প্রয়োগও করেছে। সব শেষ গত ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টনের জনসভা পন্ড হওয়ার পর দলের শীর্ষনেতারা গ্রেপ্তার হতে থাকে। সারা দেশে মামলা-ধরপাকড় বেড়ে যায়। এই মামলা-ধরপাকড় করে সরকার আসলে চেয়েছে বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করতে। সম্প্রতি সরকারের কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তো বলেই ফেলেছেন, ‘বারবার বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন থেকে, তারা (বিএনপি) যদি নির্বাচনে আসে, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হবে এবং পিছিয়ে দেওয়াই না, বলা হয়েছে সবাইকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ আর এ ধরনের প্রস্তাব নাকি বিএনপিকে দেওয়াও হয়েছিল। সরকারের এ টোপ শুধু একজন গিলেছেন। তিনি বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর। যিনি ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নের সদস্য। বিএনপির হয়ে নির্বাচনগুলো লড়েছেন এবং সংসদ সদস্যও হয়েছেন। ছিলেন মন্ত্রীও। গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে একজন পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৫ নভেম্বর ২০২৩ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ৩০ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ধার্য হয়। শাহজাহান ওমর ২৯ নভেম্বর জেলখানা থেকে মুক্তি পান। ৩০ নভেম্বর আওয়ামী লীগে যোগদান করে তার আসন ঝালকাঠি-১ থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ করেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য সরকার এবার মূলত তিনটি কৌশল নিয়েছিল। এক. বিএনপিকে আহ্বান জানিয়ে চাপে ফেলে নির্বাচনে আনা, দুই, কিংস পার্টি তৈরি করে বিএনপির বিকল্প শক্তি দাঁড় করানো, তিন. নিজ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাধ্যমে নির্বাচন জমিয়ে তোলা। সরকারের এই তিন কৌশলের দুই আপাতদৃষ্টিতে সফল হয়নি বলেই ধরা যায়। কারণ বিএনপিকে বিভিন্ন কৌশলে নানা চাপেও নির্বাচনমুখী করতে পারেনি। কিংস পার্টিদের দিয়ে বিএনপির ভাঙন বা বিএনপির বিকল্প শক্তি দাঁড় করাতে পারেনি। এখন দেখার বিষয়, দলীয় তৃতীয় কৌশল স্বতন্ত্রদের দিয়ে নির্বাচন কতটা জমজমাট করতে পারে। স্বতন্ত্রদের দিয়ে নির্বাচন জমিয়ে তোলার অর্থ হচ্ছে আওয়ামী লীগের বিকল্প বের করে আনা নয়, মূলত বিরোধী দলে কে বসবে সেই লড়াই জাগিয়ে তোলা। ফলে নির্বাচনে মূল লক্ষ্য এখন সরকার পরিবর্তন কিংবা ভোটারের রায়ে সরকার বেছে নেওয়া নয়। সেটা এবারের নির্বাচনে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে আগামীতে শাসক হিসেবে থাকছে। আর অন্য সবাই লড়াই করে বিরোধী দলে বসবে। হয়তো বিএনপি নির্বাচনে এলেও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে পারত। তখন সেটা হতো সরকারে কে বসবে তার লড়াই। বিএনপি নির্বাচনে না থাকায় এবং বড় কোনো দল নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দাঁড়ানোর ফলে এই নির্বাচন প্রকৃত অর্থেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিহাস যেমনি আছে, তেমনি ব্যর্থ নির্বাচনের নজিরও আছে। আবার ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্রদের বিরোধী দলের ভূমিকায়ও দেখা গেছে। ফলে এবারও যদি স্বতন্ত্ররা বিরোধী দলের আসনে বসে সেটা নতুন কোনো ঘটনা হবে না। শুধু কিছু প্রশ্ন থেকে যাবে আর, ‘প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরও তো জানা’।
লেখক: সাংবাদিক
zakpol74@gmail.com