পাহাড়ে ঝুঁকি

নজর দিন উৎসে, প্রতিবিধানে হন নির্মোহ

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ১১:৫০ পিএম

প্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে তাতে অভিঘাত করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় এবং এর অনেক মর্মন্তুদ নজির আমাদের সামনে আছে। ঋতুচক্রের স্বাভাবিক নিয়মেই আষাঢ়ে বৃষ্টি হবে, শ্রাবণে আকাশ থেকে নেমে আসবে অঝোর ধারা, এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতির এসব স্বাভাবিকতার মাঝে অস্বাভাবিকতা হলো পাহাড়ের ধসে পড়া। এর পেছনে রয়েছে বহুবিধ মনুষ্যসৃষ্ট কারণ। ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই গীতিপঙ্ক্তির মর্মার্থ রূপক অর্থে যতটা বাক্সময়, দৃশ্যমান সৌন্দর্য এর চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। কিন্তু ‘আকাশে হেলান দিয়ে’ ঘুমানো পাহাড়ের ধসে পড়ার মাঝে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। নির্বিচারে ক্রমাগত পাহাড়ের গায়ে অত্যাচার আর বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে বলবানদের লোভের গ্রাসে পড়েছে দেশের বৃহদাংশ পাহাড় আর ফিরে ফিরে এরই নির্মম বলি হচ্ছে মানুষ। 

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের মনে পড়ে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান রচিত, খোন্দকার নূরুল আলম সুরাপিত সুবীর নন্দীর কণ্ঠে গীত সেই জনপ্রিয় গানটির লিরিক্স ‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বলো/ঐ পাহাড়টা বোবা বলেই কিছু বলে না...।’ বিগত কয়েক দশকে দেশে পাহাড়ধসে বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, এরপর প্রতিবারই সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের তরফে কঠোর প্রতিবিধানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হলেও এর যে কোনো সুফল দৃশ্যমান হয়নি তারই ফের সাক্ষ্য মিলেছে ২৩ জুন দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ‘মৃত্যু যেখানে নিত্যসঙ্গী’ ও ‘টেকনাফে পাহাড় ধসের শংকা : ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের সরাতে মাইকিং’ শিরোনামের প্রতিবেদনগুলোতে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে প্রশ্ন জাগে জীবন-মৃত্যুর খতিয়ান প্রতিকারহীনতা ও নিয়ম ভঙ্গের কারণে আর কত দীর্ঘ হবে! বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড় নিয়ে আমাদের আতঙ্কের পারদ হতে থাকে ঊর্ধ্বমুখী। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটছে না।

আমরা জানি, গত কয়েক বছরে যেভাবে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে সেখানে প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে মানব সৃষ্ট কারণও যে রয়েছে তা তো তর্কাতীত। নিশ্চয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমানো পাহাড় এমনি এমনি ধসে পড়ে না। পাহাড়কে ক্রমাগত দুর্বল করে তোলা হচ্ছে বলেই ধসে পড়ে। যেভাবে নির্বিচারে উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা হয়, পাহাড়ের গাছ কাটা হয়, কতিপয় ব্যক্তির বস্তি-বাণিজ্যের কারণে ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে পাহাড়। ফলে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড় নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারাচ্ছে। নির্বিচারে গাছ কাটায়, পাহাড় কাটায় পাহাড় তার ভূতাত্ত্বিক চরিত্র হারাচ্ছে। মাটি তার দৃঢ়তা হারাচ্ছে। গাছের শেকড় যেভাবে মাটিকে আঁকড়ে রাখত, গাছের সংখ্যা কমায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পাহাড়ধসের প্রবণতাও বাড়ছে। 

পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা বসবাস করেছে তাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের কেউ কেউ নিজেরা পাহাড় কেটে বসতি গড়েছে  আবার প্রভাবশালীরাও অনেকে পাহাড়ে বাড়ি তৈরি করে নি¤œ আয়ের মানুষকে ভাড়া দিয়েছে। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অনেকের পক্ষেই নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে যে প্রচার, আমরা তা আমলে নেওয়ার জন্য দাবি জানাই। আমাদের স্মরণে আছে, চট্টগ্রামের মতিরঝরনায় ২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনার পর একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ৩০টি সুপারিশ করেছিল। এরপরও আরও কিছু সুপারিশ ছিল এ ব্যাপারে। আমরা প্রশ্নও রাখতে চাই, সেই সুপারিশগুলো কি বাস্তবায়িত হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে কেন হয়নি, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা জরুরি এবং এই প্রেক্ষাপটে যা কিছু করণীয় তা নির্মোহ অবস্থান নিয়ে করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

যারা নিরুপায় হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অতি ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করে তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন ছাড়া কেবল উচ্ছেদ স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। পাহাড়ধসে করুণ মৃত্যুর মর্মস্পর্শী খবর আমরা আর শুনতে চাই না। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী মানুষকে সচেতন করার জন্য শুধু প্রচারণাই নয়, তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, তাদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি কেউ যেন পাহাড় কেটে প্রকৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করতে না পারে এ জন্য সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অধিক জরুরি। এ নিয়ে কথা হয়েছে বিস্তর আর কথা নয়; আমরা কাজের কাজ দেখতে চাই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, সচেতনতা এবং সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমেই সম্ভব প্রকৃতি এবং মানুষের সহাবস্থান বজায় রাখা।    

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত