বাস্তবতা বুঝিয়ে দিয়েছে এশিয়ান গেমস

২০২৩ সালের শেষে এসে জোরেশোরে স্মার্ট বাংলাদেশের পাশাপাশি স্মার্ট ক্রীড়াঙ্গন গড়ে তোলার রব উঠেছে। দেশব্যাপী হয়েছে সভা-সেমিনার-র‌্যালি। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ আওড়াচ্ছেন স্মার্ট হওয়ার বুলি। তবে বছরটা কিন্তু সে-রকম কোনো বার্তা দেয়নি। বাস্তবতা আর মুখের কথায় যে আকাশ-পাতাল ফারাক তার তরতাজা উদাহরণ হ্যাংঝু এশিয়ান গেমস। এই একটি গেমসেই পরিষ্কার হয়ে যায় অনেক কিছু। দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রীড়াঙ্গন যে এগুচ্ছে না তা তো বেশ বোঝা গেছে এশিয়াডের চরম ব্যর্থতায়।

চীনের হ্যাংঝু শহরে বসেছিল এশিয়ার সর্ববৃহৎ ক্রীড়া আসর এশিয়ান গেমস। প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশ সেই আসরে অংশ নেয় বড়সড় এক বহর নিয়ে। রীতিমতো ভ্রমণ বিলাসে মেতেছিলেন কর্মকর্তারা। দল বেঁধে তারা গেছেন চীনের চাকচিক্য গায়ে মাখতে। অথচ বড় মঞ্চে তাদের ক্রীড়াবিদরা রীতিমতো খাবি খেয়েছে প্রায় প্রতিটি খেলায়। ১৭টি ডিসিপ্লিনে ক্রীড়াবিদ, কোচ, ম্যানেজারসহ ২৪০ জনের বিশাল বহর নিয়ে চীনে গিয়েছিল বাংলাদেশ।

অথচ সাফল্য মাত্র দুটি ব্রোঞ্জপদক এবং দুটিই এসেছে পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের কৃতিত্বে। বাকি ১৬ ইভেন্টে তো কিছুই জুটেনি। পুরুষ এবং নারী ফুটবলারদের বিদায় গ্রুপপর্ব থেকে। প্রত্যাশা ছিল কাবাডি নিয়ে। জাপানকে হারিয়ে শুরুর পর তারা টানা দুই ম্যাচ হেরে বসে ভারত ও চাইনিজ তাইপের কাছে। শেষ গ্রুপ ম্যাচে থাইল্যান্ডকে হারালেও সেমিফাইনালে যাওয়া হয়নি তাদের। মেয়ে কাবাডি দলের অবস্থা আরও করুণ। তারা প্রথম ম্যাচে চাইনিজ তাইপের কাছে হারের পর ইরানের বিপক্ষে বাজেভাবে হারের লজ্জা নিয়ে দেশে ফিরতে হয় মেয়েদের।

বিশ্বকাপ শুটিংয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে বছরের শুরুতে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের কোয়ালিফাইংয়ে ৬২৮.৪ স্কোর করে ষষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশের প্রথম শুটার হিসাবে বৈশ্বিক কোনো আসরের ফাইনালে ওঠেন কামরুন নাহার কলি। তবে এশিয়ান গেমসে এসে কিছুই করতে পারেননি কলি। পারেননি অন্যরাও। আরচাররাও পারেননি প্রত্যাশা পূরণ করতে। ১৫ আরচার অংশ নিয়েছিলেন ১০ ইভেন্টে। তবে পদকের খুব কাছে গিয়েও রিকার্ভ পুরুষ দল হতাশ করেছে। ব্রোঞ্জপদক নির্ধারণী ম্যাচে তারা হেরে যায় ই্ন্দোনেশিয়ার কাছে।

এর বাইরে পদকের আশা ছিল না অন্য কোনো ডিসিপ্লিনে। তবে এ বছর এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতায় স্প্রিন্টার ইমরানুর রহমানকে ঘিরে ছিল ভালো কিছুর আশা। সেই আশা তিনি অবশ্য পূরণ করতে পারেননি বক্সার সেলিম হোসেন। ৫৭ কেজিতে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তবে জাপানের প্রতিপক্ষের কাছে হেরে ছিয়শির মোশাররফ হওয়া হয়নি সেলিমের।

এছাড়া দাবা, সাঁতার, তায়কোয়ান্দো, জিমন্যাস্টিক্স, ব্রিজ, ফেন্সিং, গলফ ও ভারোত্তোলনে ব্যর্থ হয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। কাতারে ঘটেছে লজ্জাজনক ঘটনা কোচ-ম্যানেজার ঘুম থেকে উঠতে দেরি করায় একজন কারাতেকা নির্ধারিত ইভেন্টে অংশই নিতে পারেননি। হকিতেও হতাশ হতে হয়েছে। বাংলাদেশ দল হয়েছে অষ্টম।

এশিয়ান গেমসে যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়েই নিজেদের অবস্থাটা বুঝিয়ে দিয়েছেন ক্রীড়াবিদরা। বছর জুড়ে তাদের বিচ্ছিন্ন সাফল্যগুলো ঢাকা পড়ে গেছে তাতে। যেমন জানুয়ারিতে ওমানের মাসকটে অনুষ্ঠিত এএইচএফ কাপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ জাতীয় হকি দল। যদিও এ বছরও হকি ফেডারেশন পারেনি প্রিমিয়ার হকি লিগ আয়োজন করতে। প্রিমিয়ার লিগ না হলেও পাঁচ বছর পর হয়েছে প্রথম বিভাগ হকি লিগ। ঊষা ক্রীড়া চক্র ৩৮ বছর পর প্রথম বিভাগে খেলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার লিগে ওঠে।

মেয়েদের হকিতে একটা নতুন সূচনা হয়েছে এ বছর। গঠিত হয়েছে জাতীয় দল। আগস্টে নেপালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়া রিজিওনাল জুনিয়র ব্যাডমিন্টনে প্রতিযোগিতায় তিন স্বর্ণসহ ১১টি পদক জেতেন বাংলাদেশের শাটলাররা। জাপানের প্যারা ব্যাডমিন্টনে ব্রোঞ্জ জিতেছেন বাংলাদেশের দুই প্রতিবন্ধী শাটলার ইমাম আলী ও জয়তু ধর। এ বছর বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আন্তর্জাতিক কাবাডি ছাড়াও কাবাডি ফেডারেশন নারী করপোরেট লিগ আয়োজন করে। যাতে চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা টুয়েলভ।

কাজাখস্তানে অনুষ্ঠিত হয় এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে ৬০ মিটার স্প্রিন্টে ৬.৫৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্রুততম মানব হন ইমরানুর রহমান। এরপর হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে অংশ নেন ইমরানুর রহমান। প্রিলিমিনারি রাউন্ড উতরে যান সেরা হয়ে। তবে হিটের দ্বিতীয় পর্বে ১০.৪১ সেকেন্ড সময় নিয়ে সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হন তিনি।

এশিয়ান গেমসের জন্য ফেডারেশনগুলোকে নানাভাবে সহায়তা দেওয়া ছাড়াও এ বছর শুরুতে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করে দ্বিতীয় শেখ কামাল বাংলাদেশ যুব গেমস। জানুয়ারিতে প্রথমপর্ব হয় ২৪টি ডিসিপ্লিনের ১৯৮টি ইভেন্টের মধ্য দিয়ে। পরে জাতীয় পর্যায়ের খেলা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ কামাল জাতীয় যুব গেমসে ৪৯টি স্বর্ণ, ৪০টি রুপা ও ৫৭টি ব্রোঞ্জ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় চট্টগ্রাম বিভাগ।