৯৯ রানে রানআউট হলে কেমন লাগে ব্যাটসম্যানের? ১ রানের আক্ষেপ যেভাবে ৯৯টা রানের সব পরিশ্রম আর কৃতিত্বকে ঢেকে দেয়, ২০২৩ সালটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য তেমনি একটা বছর। এই সময়ে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, টেস্ট জিতেছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আর বাংলাদেশের যুব ক্রিকেটাররা জিতেছে এশিয়া কাপ। নারী ক্রিকেট দেখেছে প্রথম সেঞ্চুরি। অনেক কীর্তি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে, কিন্তু বিশ্বকাপ ব্যর্থতা যে মধ্যদুপুরের সূর্যের মতোই উজ্জ্বল। যার প্রখরতায় মøান অন্য সব কিছুই।
বছরের শুরুটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের একটি সাক্ষাৎকারে। যেখানে তিনি বলেন যে, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল একে অন্যের সঙ্গে কথা বলেন না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের আগে তামিম সংবাদ সম্মেলনে একঘেয়ে ভাবে ‘নাথিং এলস ম্যাটারস’ বলে গেলেও বিতর্ক আড়াল করতে পারেননি। বরং আফগানিস্তান সিরিজের প্রথম ওয়ানডের পর তামিমের আচমকা অবসরের ঘোষণা, কান্নাভেজা সংবাদ সম্মেলন এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার হস্তক্ষেপে তার সিদ্ধান্ত বদলের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গোটা ক্রিকেটাঙ্গনে। তামিমের খেলা, না খেলা, অধিনায়কত্ব ছাড়া, এসব নিয়ে অনিশ্চয়তার ধাক্কা লাগে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতেও। তামিম কোমরের চোটের চিকিৎসায় ইংল্যান্ড গেলেন, খেললেন না এশিয়া কাপে। সাকিব ফের হলেন ওয়ানডে অধিনায়ক। এশিয়া কাপে বাংলাদেশ জিতল দুটো ম্যাচ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে আর ভারতের বিপক্ষে। দেশে নিউজিল্যান্ড সিরিজে অনেকেই বিশ্রামে, তামিম ফিরলেন দলে। দুটো ম্যাচ খেলে ফের গেলেন বিশ্রামে। এরপর হঠাৎই রাতের বেলায় সাকিব আর চন্ডিকা হাথুরুসিংহে ছুটলেন নাজমুল হাসানের গুলশানের বাসায়। বিশ্বকাপ দলে দেখা গেল না তামিম ইকবালকে। প্রধান নির্বাচক বললেন তামিম চোটগ্রস্ত, তামিম নিজে ভিডিও বার্তায় বললেন অন্য কথা। এর মধ্যে আবার সাকিব একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে এমন সব কথা বললেন তামিমকে নিয়ে সেগুলো যে কোনো পেশাদার ক্রিকেটার নিজের সতীর্থকে নিয়ে কখনো বলতে পারেন সেটাই ছিল ধারণার বাইরে। ‘তামিম শিশুতোষ মানসিকতার’, ‘ব্যাট আমার আমি আগে ব্যাটিং করব’, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে দেখি সেনাপতি নেই’... এসব বলে বিশ্বকাপ খেলতে দল নিয়ে চলে গেলেন সাকিব। তামিমের ছোড়া ইটের জবাবে পাটকেল মেরে।
বিশ্বকাপে আফগানদের হারিয়ে শুরুটা হয়েছিল ভালোই, এরপরই বিপত্তি। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারতে হারতে নেদারল্যান্ডসের কাছেও ইডেনে হেরে গেল বাংলাদেশ। এতেই হয়েছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। ২০১৯ বিশ্বকাপেও ৩ জয় আর বৃষ্টিবিঘিœত ম্যাচ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ১ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ হয়েছিল অষ্টম। এবারও জোড়া জয়, আফগানিস্তান আর শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে সেই অষ্টমই। তবুও বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যর্থতার ভাঙা রেকর্ড বাজছে সেটা ঐ নেদারল্যান্ডসের কাছে হারের কারণেই। বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার মতো দল নয়, সেটা দেশের কিছু উগ্র ক্রিকেট সমর্থক এবং তাদের ঢোলে বাড়ি দেওয়া কিছু ইউটিউবার বাদে কেউই বিশ্বাস করেনি। খোদ কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে বলেছেন যে, এমন স্বপ্ন কেউ দেখলে তার ঘুম থেকে জেগে ওঠা উচিত। তবুও কেউ কেউ বাংলাদেশের ওয়ানডে সুপার লিগ এবং আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পারফরম্যান্সের মানদ-ে আকাশ-কুসুম কল্পনায় মেতেছেন, দিনশেষে ধসে পড়েছে সেই রঙ্গিলা দালান। বিশ্বকাপ ব্যর্থতা নিয়ে ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ হয়েছে, সেই কমিটির সদস্যরা অধিনায়ক বাদে বাকি সবার সঙ্গে আলাপ করেছেন। অনেকটা মাংস ছাড়াই বিরিয়ানি রান্নার মতো ব্যাপার!
বিশ্বকাপে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই দলে ঢুকে যান মাহমুদউল্লাহ। লম্বা সময় ধরে দলের বাইরে ছিলেন, দলে ফিরে নিজের কাজটা অন্তত করেছেন মন দিয়ে। কোনো বাড়তি মনোযোগ দাবি করেননি, কোনো অজুহাতও দাঁড় করাননি। বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করেছেন, অবশ্য তাতে খেলা শেষ হতে দেরি হওয়া ছাড়া কিছু হয়নি। বিশ্বকাপের পর আবারও দলে নেই মাহমুদউল্লাহ, হয়তো আগামীতে আর তাকে দেখাও যাবে না লাল-সবুজের জার্সিতে। তামিমও নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে। বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নির্বাচনের পর আলাপ করবেন, এরপর সিদ্ধান্ত নেবেন। আপাতত তিনিও মাঠের বাইরে। সাকিব ব্যস্ত নির্বাচনী প্রচারণায়। মাশরাফীর দেখানো পথে সাকিবও সাংসদ হওয়ার দৌড়ে। পা-বদের প্রস্থানপর্বে এখনো মাঠে কেবল মুশফিকুর রহিম।
অস্তাচলে পুরনোরা। নতুনরা আভাস দিচ্ছেন সোনালি সম্ভাবনার। নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে সিলেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে জিতেছে বাংলাদেশ। নেপিয়ারে জিতেছে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ আর অর্জনের খেরোখাতাকে ছুড়ে ফেলে দল হিসেবে সফল হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন তরুণরা। প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি জয় এসেছে তাদেরই হাত ধরে।
নারী ক্রিকেটে অনেক অর্জনই এসেছে ২০২৩ সালে। দেশে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে জয়, ওয়ানডে সিরিজ ড্র, ফারজানা হক পিঙ্কির দেশে ও দক্ষিণ আফ্রিকায় শতরান, পাকিস্তানের মেয়েদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়, ওয়ানডে সিরিজ ড্র, দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচে জয়... এমন অনেক সাফল্যই এসেছে বিদায়ী বছরে। মেয়েদের যুব দল অনূর্ধ-১৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে উঠেছিল সুপার সিক্সে। সব মিলিয়ে নারী ক্রিকেটে ২০২৩ ছিল সফল একটা বছর।
বছরের শেষ দিকে, বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল দুবাই থেকে জিতে আসে যুব এশিয়া কাপ। যেখানে তারা সেমিফাইনালে হারায় ভারতকে। গ্রুপপর্বে হারায় শ্রীলঙ্কাকে আর ফাইনালে আরব আমিরাতকে। তরুণ এই ক্রিকেটারদের চোখে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। যে আসরটা হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়, আগামী বছরের শুরুতেই।
সাকিব-তামিম বিতর্ক বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা ঝড় তুলে সাময়িকভাবে খানিকটা হতাশা সৃষ্টি করলেও আদতে তাতে লাভই হয়েছে। তারকাতোষণ নীতি, সিনিয়রদের খেয়ালখুশি এমন অনেক কিছুই এসেছে প্রকাশ্যে। আর সেসব ক্ষতিকারক উপাদানকে বাইরে রাখলেই যে দল হিসেবে বাংলাদেশ ভালো করে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল তিন সংস্করণেই।