রূপগঞ্জ যেন গাজীগঞ্জ

ঢাকার পাশেই রূপগঞ্জ। এখানকার প্রতিটি গ্রামের সবুজ শ্যামল পরিবেশ আর প্রাকৃতিক মুগ্ধতা আকৃষ্ট করতো যে কাউকে। ঘরের গোলার চাল আর নিজেদের ফলানো সবজি, মাছ মাংস খেয়েই তৃপ্ত ছিল গ্রামীণ জনপদ। অথচ মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে ধূসর মরুভূমি আর জবরদখলে বিলুপ্ত প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য।

মাত্র একটি পরিবারের কারণে রূপ হারিয়েছে স্বর্গরূপের রূপগঞ্জ। রূপগঞ্জে এখন চোখ মেললেই শুধু গাজী আর গাজী। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী গোটা রূপগঞ্জকে এমনভাবে গিলে খেয়েছেন, সেখানে আর কিছু দেখার ফুসরত নেই। এখানে গাজী মানেই শেষ সিদ্ধান্ত। অস্ত্রবাজ, মাদক, সন্ত্রাস, হত্যা, খুন, গুম, জবরদখল সবই হয় তার ইশারায়। এমনকি রূপগঞ্জের প্রতিটি বালুর দানার হিসাবও গাজীর বাড়িতে হয়।

স্থানীয়রা বলেছেন, অত্যাচার, নিপীড়ন, দখলবাজিতে এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, এটি এখন আর রূপগঞ্জ নয়, যেন গাজীগঞ্জে রূপ নিয়েছে। মন্ত্রী গাজীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করার দুঃসাহস দেখালে ভাগ্যে জোটে মামলা, হামলা আর শারীরিক নির্যাতন। জমি দখল ও সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে খুন-গুমের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ উঠে আসছে তার বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধান বলছে, সাধারণ নিরীহ মানুষের আবাদি জমিতে গাজী স্টেডিয়ামের সাইনবোর্ড বসিয়ে বালু ভরাট করে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। কোথাও আবার আবাদী জমি ও বসতভিটা দখল করে গাজী গ্রুপের বিভিন্ন কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। করা হয়েছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসন প্রকল্পসহ আরও অনেক কিছু। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছে অনেক মুসলিম ও সংখ্যালঘু পরিবারকে। গাজীর অত্যাচার থেকে বাদ পড়েনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। 

অনুসন্ধানে আরোও জানা গেছে, রূপগঞ্জের কেয়ারিয়া, পর্শি, বাড়িয়াছনি, কুমারপাড়া এলাকায় শতশত হিন্দু পরিবারের বসবাস। সেখানকার শতকরা ৮০ শতাংশ হিন্দু মানুষের জমি জিপার্ক (গাজীপার্ক) নামে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেড়াও বালু ভরাট করে রেখেছেন। জিপার্কের জরবদখলের দায়িত্বে রয়েছেন বাঘবেড় সিটি মার্কেট এলাকার ইমান আলীর ছেলে ভূমিদস্যু ইমন হাসান খোকন।

কে এই ভূমিদস্যু খোকন? তার বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমে জানা গেল, খোকন হলো মন্ত্রী গাজীর বিশ্বস্ত ভূমিদস্যুদের একজন। নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করতে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করছে সে, অন্যথায় ভুয়া দাতা বানিয়ে কমিশন রেজিস্ট্রির মাধ্যমে জাল দলিল সৃজন করছে। তারা সর্বোচ্চ দেড়’শ বিঘা জমি কিনে প্রায় ৫ থেকে ৬’শ বিঘা জমি দখল করে রেখেছে। যার প্রতি শতাংশ জমির মূল্য প্রায় বিশ লাখ টাকা। প্রতিবাদ করলে পালিত সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ভুক্তভোগীদের বাড়ি ঘরে হামলা ভাঙচুর করে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন। খোকনের বাবা একসময় এলাকায় মানুষের বাড়িতে মাটি কাটার কাজ করতেন। অথচ মন্ত্রীর ক্ষমতা প্রয়োগ করে জবরদখলের মাধ্যমে মাত্র ৭ থেকে ৮ বছরের ব্যবধানে বিকাশ এজেন্ট থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন খোকন।

রূপগঞ্জের খাদুন এলাকায় বড় জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি। অনুসন্ধান বলছে, এখানকার অবস্থা কর্নগোপের চেয়েও ভয়াবহ। ফ্যাক্টরির প্রায় ৮০ ভাগ জমিই জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। আয়েত আলী ভুঁইয়ার পুত্র হাজী আমজাদ আলী ভুঁইয়ার ১৯ বিঘা ৮ শতাংশ, হাজী আব্দুল হাইয়ের ৪ বিঘা, মোবারক হোসেনের দেড় বিঘা, আব্দুল বারী ভুঁইয়ার ২ বিঘা, নূর মোহাম্মদের ১ বিঘা, ইসমাইল খাঁর ৪ বিঘা, সিরাজ খাঁর ৪ থেকে ৫ বিঘা, শাহ আলমের প্রায় ৭০ শতাংশ, জুলহাস ভুঁইয়ার ৭১ শতাংশ ও আপেল মাহমুদ এর আড়াই বিঘা জমি জোরপূর্বক দখল করে খাদুনে গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি তৈরি করা হয়েছে।

পাশা গ্রুপের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করে বলেন, ম্যানেজার এই ফেক্টরির স্টাফ কোয়ার্টার বানিয়েছেন পাশা গ্রুপের ১৩৯ শতাংশ জমি ওপর। পাশা গ্রুপের ৫ তলা ভবনসহ জমি দখলের অভিযোগে গাজীর বিরুদ্ধে মামলাও করে পাশা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানের জমি রক্ষা করতে গিয়ে নির্মম হামলার শিকার হন খোরশেদ আলম। তিনি আয়েত আলী টেক্সটাইলের কেয়ার টেকার। জমি দখলের প্রতিবাদ করায় কুপিয়ে জখম করা হয় তাকে। মাথায় ২৬টি সেলাই করতে হয়েছিল তার। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের পদ এবং মন্ত্রীত্বের প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার বিরাব, কাঞ্চন, ভালুকাব, টেংরারটেক, পোনাব, আমলাব, কেশরাব, আধুরিয়া, পুর্বগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় দেড় হাজার বিঘা হিন্দু-মুসলিমদের মালিকানা জমি ও খাস জমি দখলে নিয়েছেন গোলাম দস্তগীর গাজী ও তার ছেলে পাপ্পা। 

শুধু জমি দখলই নয়, ধর্ষণ এবং খুনের পেছনেও রয়েছে এই মন্ত্রীর ইন্ধন। গণমাধ্যমের সামনে আতঙ্কে কেউ না মুখ খুললেও এই গল্প ঘুরছে স্থানীয়দের মুখে মুখে। অনুসন্ধান বলছে, মন্ত্রীর করাল থাবায় পুরো রূপগঞ্জ উপজেলা  এখন বৈধ-অবৈধ অস্ত্র আর মাদকের ডিপোতে পরিণত হয়েছে। আর এসব নিয়ন্ত্রণ করেন মন্ত্রীপুত্র পাপ্পা ও মন্ত্রীর এপিএস দাদা এমদাদ।

অর্থায়নে সরকার, নামে গাজী আর গাজী

সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয় বিভিন্ন স্থাপনা বা অবকাঠামো। অথচ চারিদিকে তাকালে গাজী ছাড়া আর কোন নাম দেখা যায় না। সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা গাজীর নামকরণের মধ্য দিয়ে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। রূপগঞ্জের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থায়নে অডিটোরিয়াম নির্মাণ হলেও নামকরণ হয়েছে মন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাতা সদস্যদের বাদ দিয়ে হয়েছেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয় সরকারি অর্থায়নে

শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুকে গাজী সেতু, সড়ককে গাজী সড়ক, কালবার্টকে গাজী কালবার্ট, স্কুলকে বীরপ্রতীক গাজী হাইস্কুল, পূর্বাচল উপশহরের মুক্তিযোদ্ধা চত্বরকে গাজী চত্বর, ন্যাংটা মাজার এলাকাকে গাজী এভিনিউ, গাজী স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানে শুধু মন্ত্রীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। দলীয় পদ-পদবী বাগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও কম যায়নি গাজী পরিবার। মন্ত্রীত্বের প্রভাব খাটিয়ে একই পরিবারে বাবা মন্ত্রী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ছেলে সিনিয়র সহ-সভাপতি, মা উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র পদ দখল করে আছেন। মন্ত্রীর চামচামি না করায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা থাকেন ভাড়া বাসায়। অথচ মন্ত্রীর জবরদখল বাহিনীর সদস্য হওয়ায় মাত্র ৫২ বছর বয়সেই কাঞ্চন পৌর এলাকার ইঞ্জিনিয়ার শেখ সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সনদ।

গাজীর যত সন্ত্রাসী বাহিনী

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গাজীর সন্ত্রাসী বাহিনীর বিস্তর তথ্য। রূপগঞ্জকে তিনি পরিণত করেছেন গাজীগঞ্জে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, রূপগঞ্জে এখন আর কোনো আওয়ামী লীগ নেতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে গঠিত এমপির গাজীলীগ বাহিনী। এই সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরাই বা কারা, সে বিষয়ে পাওয়া গেছে নানা তথ্য। স্থানীয় এলাকাবাসীও বলেছেন, সন্ত্রাসী বাহিনী গাজীলীগের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জকে রীতিমতো অপরাধের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছেন এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী। কায়েম করেছেন ত্রাসের রাজত্ব। এই গাজী লীগের অত্যাচার থেকে বাঁচতে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, গাজীর সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে রয়েছে কালাদি গ্রামের মোজাম্মেলের ছেলে শাহীন ওরফে লোহা শাহীন। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও ইয়াবা ব্যবসার জন্য এক নামে চেনে তাকে। রূপগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। একই গ্রামের আলফাজের ছেলে আনিসুর রহমান খোকন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে রূপগঞ্জ থানায় ২টি মামলা রয়েছে। মাছিমপুর গ্রামের মৃত নজরুল্লাহ মুন্সির ছেলে মো. নোমান। সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। একই গ্রামের শামসুল হকের ছেলে রাকিব ওরফে গুই রাকিব। তার বিরুদ্ধে আছে ৪টি মামলা এবং ১টি সাধারন ডায়রি। মাছিমপুরের আরেক সন্ত্রাসী লাল মিয়ার ছেলে হামিদ। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে ১টি মামলা। কেন্দুয়াটেক এলাকার আব্দুল লতিফের ছেলে মতিউরের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় ৫টি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও মাদক ব্যবসার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। মাছিমপুরের আরেক সন্ত্রাসী রনি। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় ৪টি মামলা রয়েছে। চরপাড়ার শুকুর আলীর ছেলে মতিনের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা রয়েছে। মাছিমপুরের আরজুর ছেলে মামুনের নামে আছে ৪টি মামলা। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ইয়াবা ব্যবসার তথ্য জানা গেছে। নছুরুল্লাহর ছেলে আলমাছের বিরুদ্ধেও মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রূপগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে ১টি মামলা রয়েছে। কালাদি গ্রামের সুরুজ মিয়ার ছেলে আলী বান্দার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও জুয়ার অভিযোগে ১টি মামলা রয়েছে। মাছিমপুরের জাহাঙ্গীরের ছেলে ফরিদের বিরুদ্ধে আছে ৪টি মামলা। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বহু অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আফসার উদ্দিনের ছেলে তাওলাদ মেম্বারের নামে আছে অসংখ্য অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় ৭টি মামলা, একটি জিডি এবং সোনারগাঁও থানায় ১টি মামলা রয়েছে।

চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র ও কায়েতপাড়া ইউনিয়নের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা

বহুল আলোচিত চনপাড়ায় মন্ত্রী গাজীর শীর্ষ সন্ত্রাসী হলো শমসের আলী খান ওরফে ডাকু শমসের। হাসমত আলী ওরফে হাসমত দয়ালের ছেলে ডাকু শমসেরের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। মাদক ব্যবসা, অস্ত্র, অপহরন, খুন, ছিনতাই, লুটপাটসহ বিস্তর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। রূপগঞ্জ থানায় রয়েছে ১৫টি মামলা। এ এলাকায় মন্ত্রী গাজীর অন্য সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে রয়েছে রফিকের ছেলে শাহাবুদ্দিন। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ডাকু শমসেরের নেতৃত্বে এখানে বিশাল একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে।  

গোলাকান্দাইল ইউনিয়নে গাজীর সন্ত্রাসী বাহিনী

স্থানীয় গোলাকান্দাইল ইউনিয়নেও রয়েছে মন্ত্রী গাজীর বিশাল একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এদের মধ্যে আছেন গোলাকান্দাইল দক্ষিণপাড়ার আব্দুল আউয়ালের ছেলে নুর আলম ওরফে ডাক্তার নুর আলম, নিজামুদ্দিন মোল্লার ছেলে মোহাম্মদ শফিউল্লাহ মোল্লা, গোলাকান্দাইল নাগেরবাগের মনসুরের ছেলে মোহাম্মদ বিদ্যুৎ, ফজলের ছেলে আকাশ নিলয়, গোলাকান্দাইল নতুন বাজারের মৃত মামুদালীর ছেলে হানিফ মিয়া, জাহার আলীর ছেলে পনির মিয়া, আনোয়ারের ছেলে তানভীর, কুদর আলীর ছেলে মাসুদ মিয়া, নজরুলের ছেলে রাজু, গোলাকান্দাইল কবরস্থান এলাকার মাসুম বিল্লাহ, গোলাকান্দাইল উত্তরপাড়ার হাবি চৌধুরীর ছেলে সৌরভ চৌধুরী ও সিয়াম চৌধুরী, সিংলাবোর ইমরান হোসেন, কামাল হোসেন, বলাইঘার আলামিন, ফয়সাল।

যা বলছেন স্থানীয় নেতারা

মন্ত্রী গাজীর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলেছেন, ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসাসহ খুন-গুমে নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জকে অপরাধের স্বর্গরাজ্য বানিয়েছেন মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। কায়েম করেছেন ত্রাসের রাজত্ব। মন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মলিন হচ্ছে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ। এমন অত্যাচার থেকে বাঁচতে তারা প্রধামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

অনুসন্ধানে গেলে কথা হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। তাদের দাবি, গাজীর দখলদারিত্ব থেকে বাদ যান না খোদ আওয়ামী নেতারাও। শুধু তাই নয়, গাজীর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নাকি নেমে আসে নানা হয়রানি-নির্যাতন। এদিকে রূপগঞ্জকে গাজীগঞ্জ বানানোর ষড়যন্ত্র হিসেবে সরকারি সম্পত্তিতে কিভাবে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার ব্যবহার করছেন গাজী, সে সম্পর্কেও একটা ধারণা দেন নেতারা। গাজীর এসব একক সিদ্ধান্ত আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে নাকি নৌকা ডুবতে বসেছে রূপগঞ্জে-এমন অভিযোগও তাদের।

রূপগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান মুন্সী বলেন, ‘গোলাম দস্তগীর গাজী তো হিসেবে শুক্র-শুক্র ৮ দিন ধরে আওয়ামী লীগ করে। উনাকে তো আমরা পদ দিয়ে সংসদ সদস্য বানিয়ে আওয়ামী লীগে আনছি। এর আগে আওয়ামী লীগে উনার কি পরিচয় আছে আমার জানা নাই। বঙ্গবন্ধুর জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু নামটা বাদ দিয়ে যেন আমার নামটা কয় জয় গাজী।’

দখলবাজির প্রসঙ্গে এ নেতা বলেন, ‘আমার জমি আমি একটা জমির মধ্যে সাড়ে ৫ শতাংশ জায়গা উনার কাছে বিক্রি করেছি, মানে আমি যতটুকু পাওনা। ওই জমিটা হল সাড়ে ৩৯ শতাংশ। আমি উনাকে একদিন বললাম আপনি এখানে যে পুরো সম্পত্তির মধ্যে সাইনবোর্ড লাগাইলেন আমি তো আপনার কাছে বিক্রি করছি সাড়ে ৫ শতাংশ। জায়গাটা তো হল ৩৯ আপনি এটা দিলেন? উনি কয়, তুই ওগো ক আমারে দিয়া দিত। আমি আপনাকে যেই দামে দিয়েছি ওরা তো ওই দামে দেবে না। কয় থাক তাইলে। এখন ওখানে এক মুঠ বালুও কেউ ফেলাইতে পারে না ওই তিনটা মৌজার মধ্যে। কেউ ঘরবাড়ি করতে পারে না। করলেই ওনার ব্যক্তিগত বাহিনী গিয়া ভয় দেখায়। সবার তো সেই সাহস নাই তাকে মোকাবেলা করার।’

রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য গবেষণা সম্পাদক মোহাম্মদ কামাল হোসেন কমল বলেন, ‘অনেক নেতা কর্মীকে এই ১৫ বছরে অনেক হামলা মামলার শিকার হতে হয়েছে। আজকে আমি আওয়ামী লীগের লোক হয়েও আমাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক স্কুলে উনার ছেলে সভাপতি, এক স্কুলে উনি সভাপতি, একই স্কুলে উনার স্ত্রী সভাপতি। এক স্কুলে ওনার ছেলের শাশুড়ি সভাপতি। এগুলো আমাদের রূপগঞ্জের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। দেখেন আজকে যে গাজী সেতু আমরা পার হয়ে আসি। আমরা রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ মন থেকে চেয়েছিলাম এই সেতুরটার নাম শেখ রাসেল সেতু দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমরা পারিনি উনার সাথে।’

তারাবো পৌর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, ‘২০০৮ সালে গোলাম দস্তগীর গাজী যখন এমপি নির্বাচিত হলেন, এর পরে আওয়ামী লীগের সাবেক যারা আছে প্রকৃত যারা আওয়ামী লীগ করে তাদের অস্তিত্ব নাই। তাদের নাম নিশানা নাই। উনার অত্যাচারে রূপগঞ্জবাসী অতিষ্ঠ।’

গাজীর অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের কাছে এসব কথা বলতেও নাকি জীবনের নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে। এ বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে আলতাফ বলেন, ‘আজকে আমি আপনার সামনে সাক্ষাৎকার দিছি। দুইদিন পরে আমাকে হাসপাতালেও দেখতে পারেন, কবরস্থানে দেখতে পারেন ঠিক নাই।’

মুড়াপাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোজাম্মেল সরকার বলেন, ‘আমরা রূপগঞ্জবাসী একটা বাহিনীর কাছে জিম্মি। সে বাহিনীটার নাম হলো গাজী বাহিনী। আমার একটা কথা বলে রাখি যদি কখনো মারা যাই দেশবাসীর কাছে অনুরোধ সন্ত্রাসীর হাতে মৃত্যুবরণ করলে আপনাদের সাংবাদিকদের মাধ্যমে মিডিয়ার মাধ্যমে বলতে চাই এটার বিচার যেন আমি পাই।’