নতুন বছরের প্রথম দিনেই শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ জনে। ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্তরা তীব্র শীতের মোকাবিলা করছেন। বেশ কয়েকটি শহরে কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কিছু মানুষ আটকা পড়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন এমন লোকদের সন্ধান করছেন, কিন্তু অবরুদ্ধ রাস্তা, ভাঙা গাড়ি ও বিধ্বস্ত বাড়িঘর উদ্ধারকাজে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই অনুসন্ধানকে ‘সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা।
নতুন বছরের প্রথম দিন সোমবার (১ জানুয়ারি) ৭.৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প নোতো উপদ্বীপে আঘাত হানে। ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে করে এসব অঞ্চলে অতি প্রয়োজনীয় ত্রাণ সরবরাহে বিঘœ হচ্ছে। এরই মধ্যে বুধবার ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তর, এতে করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভূমিধসের। যা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারের প্রচেষ্টাকে আরও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভেঙে পড়া রাস্তা, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর এবং দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোর অবস্থান প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ার কারণে উদ্ধার প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এতে ভূমিকম্পের দুই দিন পার হলেও হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ণয় করা যায়নি। সোমবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর থেকে ছোট ছোট শ’খানেক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে উপদ্বীপটিতে। এছাড়া আরও ভূমিকম্পের আশঙ্কা করছে কর্র্তৃপক্ষ।
জাপানে ভূমিকম্প কোনো নতুন ঘটনা নয়। ফুকুশিমার একটি পারমাণবিক কেন্দ্রে দুর্ঘটনার সূত্রপাত ঘটানো বিধ্বংসী সে ভূমিকম্প ও সুনামির ১৩ বছর হতে চলল। কিন্তু জাপানিদের মনে সে দুর্যোগের স্মৃতি আজও তাজা। সোমবার ইশিকাওয়াতে ভূকম্পন শুরু ও সুনামির সংকেত বাজতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে সবাই নিশ্চয় স্মৃতির জানালা দিয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে ছিল ১৩ বছর আগের সে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ও সুনামির দিকে। ভূমিকম্প ও সুনামির সংকেত বেজে ওঠা জাপানের জন্য অস্বাভাবিক ও কালেভদ্রে ঘটা কোনো বিষয় নয়। যখন প্রথম জাপানে যাই, তখন আমাদের বিল্ডিংয়ের সামান্য ঝাঁকুনিতে আমি প্রায় সময়ই বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠতাম। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই আমি কম্পনের মধ্যেও ঘুমিয়ে পড়তে পারছিলাম। জাপানে ভূমিকম্প খুব দ্রুতই জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। আপনার কাজ হবে শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এ সবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া। তথাপি আপনার হৃদয়ের তলানিতে সবসময় বিরক্তিকর ও ভীতিকর একটা নুড়িপাথর পড়ে থাকবেই। বারবার মনে হবে, না জানি কখন বড় ভূমিকম্প এসে যায় আর সুনামি তাণ্ডবলীলা চালায়। আমাদের বিল্ডিং এসব দুর্যোগ মোকাবিলার উপযুক্ত তো?
১১ মার্চ ২০১১ সালে বর্তমান প্রজন্ম এমন এক ভয়ের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছিল। পুরো দুই মিনিট ধরে পৃথিবী এমন ভয়ংকরভাবে কাঁপছিল যে, কেউই তার জীবদ্দশায় এমন কম্পনের সম্মুখীন হননি। মনে হচ্ছিল যেন দীর্ঘকাল ধরে পৃথিবীতে একাধারে কম্পন চলছে। যারা সে দুঃসহ দুর্যোগের মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে পেরেছেন, কেবল তারাই বলতে পারবেন তারা তখন ঠিক কোথায়, কীভাবে ছিলেন এবং কতটা আতঙ্কিত হয়েছিলেন। পরিস্থিতির শেষদৃশ্য এখানেই শেষ নয়। প্রথম ৪০ মিনিটের মধ্যেই সুনামি উপকূলে চলে আসছিল। সমুদ্র-প্রাচীরের ওপর দিয়ে বিপুল বেগে আছড়ে পড়ছিল জনপদে। জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূল বরাবর শত শত কিলোমিটার ধরে শহর ও গ্রামগুলোকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। সেন্দাই শহরের ওপর দিয়ে একটি নিউজ হেলিকপ্টার ঘুরে ঘুরে টিভিতে পরিস্থিতির সরাসরি সম্প্রচার করছিল। পরের দিন ছিল আরও ভয়ংকর। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। ফুকুশিমা জুড়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে কয়েক হাজার মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি টোকিও শহরও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
সেদিনের জাপান যেন ছিল এক মৃত্যু-উপত্যকা। যার ছাপ একটি গভীর ও সম্মিলিত মানসিক আঘাত রেখে গেছে। সুনামির পরের দিনগুলোতে আমি টোকিওতে থাকার জন্য একটি নতুন জায়গা খুঁজছিলাম। আমার স্ত্রী ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র ঘেঁটে ঘেঁটে নদী থেকে দূরে এবং উঁচুস্থানে সবচেয়ে শক্তিশালী মাটি বা বেডরক (মাটির কোমল স্তরের নিম্নবর্তী পাথরের স্তর) কোথায় পাওয়া যাবে খুঁজছিলেন। এবং তিনি বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাল নিয়ে বেশি সচেতন হয়ে উঠছিলেন। তার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল : ‘আমরা ১৯৮১ সালের আগে নির্মিত কোনো বিল্ডিংয়ে উঠব না’। এরপর আমরা ১৯৮৫ সালে নির্মিত একটা বিল্ডিংয়ের সন্ধান পাই এবং সেখানে উঠি। খাবার ও পানি মজুদ করতে শুরু করি। সেখানে বাথরুমের সিঙ্কের নিচে একটা তাক-সহ কিছু প্রস্তুত কার্টনের বাক্স চাপা পড়ে ছিল, যেগুলোর মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
২০১১ সালের আতঙ্ক ও বিভীষিকা ২০২৪ সালের প্রথম দিন সোমবারে হয়ে যাওয়া ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ফিরে আসতে পারত। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে, ব্রিজ গুঁড়িয়ে গেছে। শতাধিক ভবন ধসে পড়েছে, নিচে মানুষ আটকা পড়েছে। ভূমিকম্পের ফলে ব্যাপক ভূমিধসও হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ভবন এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তোয়ামা এবং কানাজাওয়ার বড় শহরগুলোতে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে জীবনযাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে বলে মনে হচ্ছে। আমি কাছের শহর কাশিওয়াজাকির এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেন, ‘নববর্ষের দিনটি সত্যিই ভয়ংকর ছিল। এখন পর্যন্ত আমি এখানে এরচেয়ে বড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। আমাদের উপকূল থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছিল। তবে এখন আমরা বাড়িতে ফিরে এসেছি।’
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সোমবারের ভূমিকম্পের পর দুর্যোগ প্রশমনে জাপান যে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, তা অসাধারণ ও প্রশংসনীয়। জাপান ম্যাগনিচ্যুড বা তীব্রতার দ্বারা ভূমিকম্পের প্রতিবেদন তৈরি করে না। বরং মাটি কতটা কেঁপে ওঠে তার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে। এ পরিমাপের স্কেল ১ থেকে ৭ পর্যন্ত। সোমবার ইশিকাওয়াতে সর্বোচ্চ তথা ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত করে। ১৯২৩ সালে টোকিওতে আঘাত হানা বিশাল ভূমিকম্পের সঙ্গে সোমবারের বিপর্যয়ের পরের ঘটনাকে তুলনা করলে জাপানের প্রকৌশল-বিজ্ঞানের সাফল্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রেট কান্টো কম্পন হিসেবে পরিচিত সে ভূমিকম্প শহরের বিশাল অংশকে বিধ্বস্ত সমতল ভূমিতে পরিণত করেছিল। ইউরোপীয় লাইন বরাবর নির্মিত আধুনিক ইটের ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জাপানের প্রথম ভূমিকম্প-প্রতিরোধী বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়। তারপর থেকে নতুন ভবনগুলোকে ইস্পাত এবং কংক্রিট দিয়ে শক্তিশালী করে তৈরি করা হয়েছে। কাঠের বিল্ডিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছে মোটা বিম।
দেশটিতে যতবার বড় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, ততবারই ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি বিল্ডিংকোড ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের আইনে প্রয়োজন অনুসারে নতুনত্ব আনা হয়েছে। ১৯৮১ সালে সবচেয়ে বড় কম্পন ঘটেছিল, যার পরে সমস্ত নতুন ভবনের জন্য সিসমিক আইসোলেশন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এরপর ১৯৯৫ কোবে ভূমিকম্পের পর জনজীবনের নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভূমিকম্প প্রতিরোধী আরও ব্যাপক গবেষণা হয়। দুর্যোগ প্রশমন ও প্রতিরোধে জাপানের সাফল্যের একটি নমুনা হলো ২০১১ সালে যখন ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তখন টোকিওতে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫। এটি ১৯২৩ সালে জাপানের রাজধানীতে হওয়া ভূমিকম্পের সমান। কিন্তু ১৯২৩ সালে গোটা শহর সমতল ভূমিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল এবং এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০১১ সালে বিশাল আকাশচুম্বী দালানগুলো দুলে উঠেছে, জানালা ভেঙে গেছে, কিন্তু কোনো বড় ভবন ধসে পড়েনি। তখন সুনামি হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিলেও ভূমিকম্প তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি।
পৃথিবীতে এমন দ্বিতীয় কোনো দেশ নেই, যেখানে সোমবারের ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগের পরও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখা সম্ভব। বরং এমন ভূমিকম্পের পর সারা দেশই দুর্যোগ, অভাব, ধ্বংস ও মৃত্যুর বধ্যভূমিতে পরিণত হতো।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি
লেখক: বিবিসির সাবেক টোকিও সংবাদদাতা