রাজনীতির সঙ্গে ভারতের সিনেমা জগতের পরিচয় বা চেনা-জানা অনেক আগে থেকেই। অনেকেই অভিনয় থেকে রাজনীতিতে গেছেন এবং ভীষণ সফল হয়েছেন। বলিউড-কলিউডের সেই সিনে-যোগের গল্প এখানে...
ভারতীয় চলচ্চিত্রের সাথে রাজনীতির যোগ অনেক পুরনো। বিভিন্ন সময় চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীরা বিধানসভা, ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ (রাজ্যসভা), ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ (লোকসভা), এমনকী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদও অলঙ্কৃত করেছেন।
ভারতীয় বিভিন্ন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির অনেক অভিনয়শিল্পই অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর, কেউ কেউ অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। হয়েছেন মন্ত্রী, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীও।
ভারতীয় মানচিত্রের নিচের দিক থেকে উঠে আসা যাক। প্রথমেই নেওয়া যাক দক্ষিণী ফিল্মপাড়ার খবর। দক্ষিণের ফিল্মপাড়া শাসনকারী নায়ক-নায়িকাদের মধ্যে দুজন একসময় হয়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে সবার আগে যে নাম আসবে তিনি আর কেউ নন- মারুথ গোপাল রামচন্দ্র (এম জি রামচন্দ্র, সংক্ষেপে এম জি আর)। তিনি ছিলেন তামিলনাড়ুভিত্তিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল 'অল ইন্ডিয়া আনা দ্রাবিড় মুনেত্রা জাঝাগাম'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সাধারণ সম্পাদক। তিনি ১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যু (১৯৮৭) পর্যন্ত তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। অনন্য অভিনয়দক্ষতা আর দুর্দান্ত এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ১৯৮৮ ভারত সরকার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারত রত্নে ভূষিত করে।
এর পর যার নাম আসবে তিনি আর কেউ নন, সুন্দরীতমা জয়ারাম জয়ললিতা। তিনি ছিলেন দক্ষিণী সিনেমার অন্যতম সেরা নৃত্য ও অভিনয়শিল্পী। তিনি তার সহঅভিনেতার (এম জি আর) অনুপ্রেরণায় ১৯৮২ সালে তারই গড়া রাজনৈতিক দলে যোগ দেন। তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে ১৯৯১ সাল থেকে মৃত্যু (০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬) পর্যন্ত ছয়বার (১৪ বছর) তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন। সর্বভারতীয় একটি পরিসংখ্যানে তিনি ছিলেন স্বাধীনতাপরবর্তী ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী।
তবে চলচ্চিত্র জীবনে ভীষণ সফল মানুষ কমল হাসান রাজনৈতিক জীবনে দারুণ ব্যর্থ ছিলেন। ২০০৭ সালে রাজনীতিতে নাম লেখান চিরঞ্জীবি। অন্ধ্র প্রদেশের প্রজা রাজ্য পার্টির এই নেতা বর্তমানে ওই প্রদেশের রাজ্যসভার (ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ) সদস্য। এদিকে পবন কল্যাণ ছিলেন তার সময়ের গুগল সার্চে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানাভিত্তিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জন সেনা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তিনি। ২০১৪ সালে এই রাজনৈতিক দলটি গঠন করেন তিনি।
সম্প্রতি প্রয়াত হলেন দক্ষিণী সিনেমায় অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ বিজয়কান্ত। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল 'দেশীয় মুপোক্কু দ্রাবিড় কাঝাগাম' গঠন করেন তিনি। একাধারে ভীষণ জনপ্রিয় অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন তামিলনাড়ুর বিরোধীদলীয় নেতা ও নিম্নকক্ষ সদস্য নারায়ণ বিজয়রাজ ওরফে বিজয়কান্ত।
এবার আসা যাক বলিউডে। রাজ বব্বরকে দিয়ে শুরু করতে হবে এ লেখা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এই তিনবারের লোকসভা সদস্য কিন্তু দুবার রাজ্যসভার সদস্যও নির্বাচিত হন। বলিউড ও পাঞ্জাবি সিনেমার এই সুপারস্টার উত্তর প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির রাজ্য সভাপতিও ছিলেন।
বলিউডের দুটি পরিবার ভীষণরকম রাজতীতিঘেঁষা। একটি দত্ত, আরেকটি বচ্চন পরিবার। প্রথমে আসা যাক বচ্চন পরিবারে। ভারতের চলচ্চিত্র ও রাজনৈতিক পাড়ায় খুব জনপ্রিয় একটি নাম এই বচ্চন পরিবার। এই পরিবারে এখন চলছে চতুর্থ প্রজন্ম। অমিতাভ বচ্চন ছিলেন একজন আবেগী রাজনীতিবিদ। ১৯৮৪ সালে অভিনয় জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে পারিবারিক বন্ধু ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধীর সমর্থনে যোগ দেন রাজনীতিতে। এলাহাবাদ থেকে কংগ্রেসের টিকিটে ভোটে দাঁড়ান। বিশাল ব্যবধানে জেতেনও। কিন্তু রাজনীতি হয়তো তাকে তেমন টানেনি। ফলে তিন বছর পরেই বিদায় জানান এই জগৎকে।
তবে তার স্ত্রী ও বলিউড কাঁপানো অভিনেত্রী জয়া বচ্চন কিন্তু একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ। তিনি সমাজবাদী পার্টির হয়ে রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। রেকর্ড ৯বার ফিল্মফেয়ার জেতা এই অভিনেতা-রাজনীতিবিদ ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীতে ভূষিত।
এবার আসা যাক দত্ত পরিবারের গল্পে। এই পরিবারের গল্প শুরু হয় সুনীল দত্তকে দিয়ে। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক-প্রযোজক এবং রাজনীতিবিদ। অসংখ্য সুপারহিট ছবির এই অভিনেতা ছিলেন পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, মুম্বাই উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্র থেকে। ১৯৮৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেওয়া এই তারকা ছিলেন সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিপরিষদের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী। তিনি ছিলেন 'মুম্বাই শেরিফ'ও। তার সন্তান ও আরেক বলিউড সুপারস্টার সঞ্জয় দত্তের রাজনীতিতে আসা নিয়ে অনেক কথা হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি রাজনীতিতে আসেননি। তবে সুনীল দত্তের স্ত্রী ও ভারতীয় সিনেমার ল্যাস্যময়ী অভিনেত্রী 'মাদার ইন্ডিয়া' নার্গিস ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য।
বলিউড সুপারস্টার সানি দেওল ২৩ এপ্রিল ২০১৯ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে নামেন। তিনি পাঞ্জাব থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তার বাবা বলিউডের দ্বিতীয় প্রজন্মের সুপারস্টার ধর্মেন্দ্রও ছিলেন রাজনীতিবিদ। তিনিও ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির থেকে ১৫তম লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে রাজস্থানের একটি কেন্দ্র থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
এবার আসা যাক স্মৃতি ইরানির প্রসঙ্গে। একাধারে অভিনেত্রী, মডেল, টিভি প্রযোজক ও রাজনীতিবিদ স্মৃতি। তিনি ২০১১ সাল থেকে গুজরাটের রাজ্যসভার সদস্য। বিজেপি বা ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম জনপ্রিয় নেতা তিনি। তিনি বিজেপি মহিলা মোর্চার কেন্দ্রীয় সভাপতি। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাকে নির্বাচনে পরিজিত করেন। তিনি একাধিক মন্ত্রিত্ব সামলেছেন। যার মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, টেক্সটাইল, তথ্য ও সম্প্রচার। সেই সঙ্গে প্রথম অমুসলিম হিসেবে তিনি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও হন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেকেন্ড মিনিস্ট্রির সবচেয়ে কমবয়সনী মন্ত্রী।
বলিউড তারকা রাজেশ খান্না ছিলেন একজন রাজনীতিবিদও। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে একটি লোকসভা নির্বাচন লড়েন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিজেপি নেতা এল কে আদভানি। পরে ভোটে কারচুপির জন্য সেই নির্বাচনটি বাতিল হয়। পরে সেই আসনে উপনির্বাচনে রাজেশ খান্নার বিরুদ্ধে লড়েন আরেক বলিউড অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা। সেই নির্বাচনে রাজেশ জেতেন ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। যিনি হারেন অর্থাৎ শত্রুঘ্ন সিনহা পরে দুবার লোকসভার সদস্য হন। সদস্য হন রাজ্যসভারও। অটল বিহারী রাজপেয়ির মন্ত্রিসভায় তিনি পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণায়লের ইউনিয়ন ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন।
আরেক বলিউড সুপারস্টার বিনোদ খান্না (অমিতাভ ও রাজেশ খান্নার রাজত্বেও তিনি সুপারস্টার) রাজনীতিতে পার রেখেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনিও অটল বিহারী বাজপেয়ির মন্ত্রিসভায় প্রথমে সংস্কৃতি ও পর্যটন ও পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক মন্ত্রী হন।
বলিউড ডিভা রাখী মসাওয়ান্ত নিজেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেন। তবে ফল ভালো না হওয়ায় পরে ইনি রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়ায় যোগ দেন। জনপ্রিয় অভিনেতা ও কমেডিয়ান স্যার পরেশ রাওয়াল বিজেপির টিকিটে ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওদিকে নানা টানাপড়েনে গেছে বলিউড অভিনেত্রী জয়াপ্রদার রাজনৈতিক জীবন। তার রাজনীতি নিয়ে আছে নানা সমালোচনাও। তবে তিনি উত্তর প্রদেশের রামপুর থেকে তেলুগু দেশম পার্টির ব্যানারে ১০ বছর (২০০৪ থেকে ২০১৪) সংসদ সদস্য ছিলেন।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনে লড়ে ২০০৪ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন বলিউডের সুপার অ্যাক্টর অ্যান্ড ড্যান্সার গোবিন্দ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মুস্বাই উত্তর থেকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচন করে হেরে যান বলিউড অভিনেত্রী ও সেক্স বম্ব উর্মিলা মাতন্ডকর।
একসময় বলিউড সৌন্দর্যের অপর নাম ছিলেন হেমা মালিনী। ১৯৯৯ সালে বিনোদ খান্নার জন্য রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন করার সময় রাজনীতিতে আগ্রহ জন্মায় তার। পরে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন তিনি। টানা ছয় বছর সংসদ সদস্য ছিলেন, রাজ্যসভার। সে সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন ড. এ পি জে আবদুল কালাম।