ঝড় তুলে ‘বিরোধী’ স্বতন্ত্র

ভোটের মাঠে প্রচারণায় নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাতে মনে হয়েছে একশর কাছাকাছি আসন পাবে স্বতন্ত্ররা। ভোটের মাঠে উৎসবের আমেজ এনে দেওয়া আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঝড়ের সঙ্গেই তুলনা করা হচ্ছিল। ভোটের ফলে দ্বিতীয় স্থানে থেকে ‘বিরোধী’ দলে বসার আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে।

গতকাল রবিবার রাত ১টা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া ২৮৩টি আসনের ফলাফলে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৫। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জিতেছেন ২২৩টি আসনে।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছিল ততই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ছিল। মনে করা হচ্ছিল ৬০-৭০টি আসনে তারা জিততে পারে। আর ১০০ আসনে চ্যালেঞ্জ করতে পারে নৌকা প্রার্থীকে।

বিভিন্ন সংসদীয় আসন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা ভোটের মাঠে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে থাকলেও ব্যালটে নৌকা প্রতীকেই সিল মেরেছেন তারা।

রাজশাহী-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা রায়হানুল হক রায়হান তার পরাজয় নিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের ফল আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। আমি বিস্তারিত জেনে পরে কথা বলব।’ এ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে পিছিয়ে থাকা প্রার্থী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বিজয়ী হয়েছেন।

খুলনা-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার পরাজয় অস্বাভাবিক। এ আসনের সবাই আমার সঙ্গে ভোট করেছে।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যা হওয়ার কথা ছিল, হয়েছে তাই। তারা বলেন, মূলত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখতে, নির্বাচন উৎসবমুখর রাখতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে মাঠে আনা হয়েছে। কৌশলের অংশ হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী করা হয়েছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে শাস্তি না দিয়ে বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে উৎসাহিত করা হয়েছে, তুলে নেওয়া হয়েছে বিধিনিষেধ।

ভোটের ফল ঘোষণার পর স্বতন্ত্র একাধিক প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈরী পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে এ কৌশল গ্রহণ করা না হলে বিএনপিবিহীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জমানো অসম্ভব হয়ে যেত। তবে তারা বলছেন, এ সুযোগে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা বর্তমান সংসদ সদস্যদের (এমপি) শায়েস্তা করা যেত। এতে ‘সাপও মরত লাঠিও ভাঙত না’ বলে তারা মনে করেন।

বিএনপিবিহীন নির্বাচনে সারা দেশে অসংখ্য আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। এলাকার মানুষ বর্তমান এমপিদের অনেকের ওপর বিরক্তও ছিলেন। তবুও তাদের জিতে আসাকে কিছুটা অস্বাভাবিক দাবি করেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ভোটের আগপর্যন্ত প্রচারণায় হাতেগোনা কয়েকটি আসন বাদে প্রায় সব আসনেই স্বতন্ত্র প্রার্থী নৌকার প্রার্থীদের জন্য দেয়াল সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল, নির্বাচনী মাঠে জোটের শরিক দল ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকলেও তাদের নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না নৌকার মাঝিদের। সবার চিন্তা ছিল স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে।

প্রচারণার মাঠে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকেই ঝুঁকে ছিলেন অনেক এলাকার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়ে পরাজিত হতে পারেন, এমন দুর্ভাবনা অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মাথায় আনেননি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী অনেক সংসদীয় আসনেই নৌকা হারাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বিজয়ী করতে উঠেপড়ে চেষ্টা করেছিলেন। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসতে আসতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যাপারে বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকেন নৌকার প্রার্থীরা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বতন্ত্র প্রায় সব প্রার্থী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিপাকে পড়েছিল। তবে বড় অংশ ঝুঁকেছিল স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে। বর্তমান এমপিদের অতীত কর্মকান্ডের কারণে ভোটের মাঠে নেতাকর্মীরা তাদের কাছ থেকে দূরে ছিলেন। ফলে নিজের দল করা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণায় হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন নৌকার প্রার্থীরা।

অনেক আসনে প্রচারণা শুরুর আগেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠ দখলে নিতে সক্ষম হলেও ভোটের ফলাফল মাঠের চিত্রকে তাই পরাজিতরা সন্দেহের চোখে দেখছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো সবই ভোট জমে ওঠার জন্য। আমরা চেয়েছি ভোট জমে উঠুক, সেটাই হয়েছে। বাকি সব মিটে যাবে সময় হলে।’

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান এমপি যারা আবারও নৌকা প্রতীক পেয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ পুরনো হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক চর্চা শুরু হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত বর্তমান এমপিরা। তাছাড়া দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, একজনকে কতবার ভোট দেব?

তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজনকে ভোট দেব কতবার সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই প্রশ্ন জন্মেছে। আবার এমপি থাকা অবস্থায় কী করেছেন তিনি সেটাও হিসাবে রাখছেন ভোটাররা। নিজের দলের নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ চাওয়া-পাওয়ার হিসাব করতে শুরু করেছেন। নির্বাচনী এলাকায় প্রচার ছিল দুই-তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন মানুষের জন্য কী করেছেন তিনি? এ ছাড়া বর্তমান এমপি যারাই নির্বাচন করেছেন তাদের সবার বিরুদ্ধে এলাকায় দলের মধ্যে বিভাজন করেছে এমন অভিযোগ ভোটের মাঠে বেশ আলোচনায় রয়েছে। এক অংশকে সুবিধা দিয়ে আরেক অংশকে দমনপীড়ন করেছে এসব নিয়েও চলছে কানাঘুষা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা আরও বলেন, এসব হিসাব মেলাতে গিয়ে নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। ফলে ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে যেতে শুরু করেন।

বিভিন্ন জেলায় দেখা গেছে, স্থানীয় নেতাকর্মীদের টানাটানি করেছেন নৌকা ও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নানারকম লোভ দেখিয়েছেন উভয়পক্ষকে। এ অবস্থায় নেতাকর্মীদের কদরও বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব ঠিক আছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।’