দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র, জল্পনা-কল্পনা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে যাত্রা শুরু করেছে নতুন সরকার, নতুন মন্ত্রিসভা। পূর্বের সরকারের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করলেন শেখ হাসিনা।
এবারের মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো স্থান পেয়েছেন আব্দুস শহীদ, র. আ. ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, আব্দুর রহমান, আব্দুস সালাম, জিল্লুল হাকিম, নাজমুল হাসান পাপন ও টেকনোক্র্যাট কোটায় ডা. সামন্তলাল সেন। তারা প্রত্যেকে পূর্ণ মন্ত্রী। তাদের সঙ্গে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছেন (তারা আগেও মন্ত্রিসভায় ছিলেন) আবুল হাসান মাহমুদ আলী, মুহাম্মদ ফারুক খান, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সাবের হোসেন চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর কবির নানক।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন সিমিন হোসেন রিমি, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, মহিবুর রহমান, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, রুমানা আলী, শফিকুর রহমান ও আহসানুল ইসলাম টিটু। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হয়েছেন ফরহাদ হোসেন, ফরিদুল হক ও মহিবুল হাসান চৌধুরী।
২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ১১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত শেখ হাসিনা সরকারের এই মেয়াদের মন্ত্রিসভা বেশ চমৎকার। নিজেদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, অতিকথনসহ নানা কারণে আলোচনায় থাকা শেষ মেয়াদের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে বাদ পড়েছেন ১৫ জন মন্ত্রী ও ১৩ জন প্রতিমন্ত্রী।
টানা চতুর্থ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পঞ্চম মেয়াদের সরকারের কাছে এখন জনআকাঙ্খা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে টানা ১৫ বছর সরকার পরিচালনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে যে উন্নয়ন করেছে সেটি নিয়ে কারো মনে কোনো প্রশ্ন নেই। স্বাধীনতার পর এত উন্নয়ন এর আগে কোনো সরকারের আমলেই হয়নি।
মানুষ উন্নয়নটা খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছে। শুধু উন্নয়নই নয়, দেশকে ডিজিটালাইজড করা থেকে শুরু করে অবকাঠামোসহ সকল ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে। ঢাকাবাসীকে যানজট থেকে স্বস্তি দিতে মেট্রোরেল ছিল একেবারে জাদুর মতো। এর বাইরে দেশ জুড়ে সড়ক প্রশস্তকরণ, রেল যোগাযোগকে আরও সম্প্রসারিত করা, কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা, পদ্মা সেতু; পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো রেল সেবার আওতায় আনা, কর্ণফুলীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, নতুন সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণসহ বহু উন্নয়ন ঘটেছে গত ১৫ বছরে।
এর পাশাপাশি কৃষিখাতে ভর্তুকিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কৃষিতে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ করা আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বড় সাফল্য। ভূমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধা নিবাস নির্মাণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তার আওতায় নিয়ে আসাসহ রয়েছে আরও নানামুখী জনবান্ধব কর্মকাণ্ড।
এতসব উন্নয়ন এবং জনবান্ধব কর্মকাণ্ডের পরও জনআকাঙ্খা পূরণে একটা বড় ঘাটতি রয়েই গেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে দেশের মানুষের একটি বড় চাওয়া হচ্ছে দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত একটি সুস্ঠু ও সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেটি গত ১৫ বছর ধরে মানুষের চাওয়ার সঙ্গে মিলছে না।
জনআকাঙ্খার এই বিষয়টি যেন এক অদৃশ্য কারণে সফলতার মুখ দেখছে না বা দেখতে পারছে না। যদিও ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছিল দেশকে দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত করা হবে। ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন।
তারপরও দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল হওয়া তো দূরের কথা, তার লাগাম পর্যন্ত টেনে ধরা যায়নি। সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি একটা ব্যাধির মতো রূপ ধারণ করেছে। এই দুর্নীতির লাগাম টেনে না ধরলে ভবিষ্যতে দেশকে চড়া মূল্য দিতে হবে। তাই এই মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকারের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
শেখ হাসিনার সরকারের টানা ১৫ বছরের মেয়াদে বাজার ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে গত প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময়। এই সময়ে মানুষ অভাবনীয় সংকটে পড়েছে নিত্যপণ্যের মূল্যের অস্বাভাবিক দামের কারণে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে শেষ বেলায় পেঁয়াজ, আলুর মতো পণ্যের দামও ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একটা হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন দেশের সিংহভাগ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের অবস্থা ছিল নাজুক। এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ সরকারের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে গালমন্দ করেছে। গ্রাম পর্যায়ের বহু মানুষের কথা বলে তাদের মুখের ভাষাটা জানার চেষ্টা করেছি। তাদের সবার একটাই বক্তব্য ছিল- উন্নয়ন করেন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সবার আগে মানুষকে খেয়ে-পরে বাঁচতে দেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। বাজারের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন। কিন্তু মানুষের এই আর্তনাদ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে ঠিকমত পৌঁছাতে পেরেছে কিনা জানি না।
এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, উন্নয়ন নিয়ে দেশের মানুষের কোনো আপত্তি নেই। এটি তারা খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। শেখের বেটির কাছে তাদের একটাই চাওয়া- বাজারটাকে সামলান।
নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। তাদের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে বড়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা, মানুষকে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, সুশাসন নিশ্চিত করা অন্যতম। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়াটা হচ্ছে সব চেয়ে বড় কাজ। আর বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বাজারের কন্ট্রোল যাদের হাতে অর্থাৎ বার বার যেসব সিন্ডিকেটের কথা উঠে আসে মানুষের মুখে মুখে, সংবাদমাধ্যমে সেইসব সিন্ডিকেটের কোমর ভেঙে দিতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে এরচেয়ে বড় বিকল্প আর কিছু হতে পারে না।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় এখন এক এবং অদ্বিতীয়। দক্ষিণ এশিয়ার তো বটেই, বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতাদের একজন। তিনি চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারেন। তার ইচ্ছাশক্তিটা যথেষ্ট, সেটি নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী যদি শক্ত হাতে ভোগবাদী, অর্থলিপ্সু, দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর হন তাহলে জনআকাঙ্খা পূরণ হবে। এতে কারো মনে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই।
আমজনতার মতো আমিও বিশ্বাস করি, এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যার ইচ্ছাশক্তিই পারে মানুষকে স্বস্তি দিতে, ভালো রাখতে। দুর্নীতিকে নির্মূল করতে। একমাত্র তিনিই পারেন জনআকাঙ্খা পূরণ করতে। আর ইতোমধ্যে তিনি গত ১৫ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি করে দেখিয়েছেন। যার ফলে তার প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস আছে। একমাত্র তিনিই পারবেন। কারণ সাধারণ মানুষের দুঃখ শুধু তিনিই বুঝতে পারেন।
লেখক: সাংবাদিক