কেন্দ্রীভূত কর্মসংস্থান

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি বছর ২ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় দেড় কোটি বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার অর্ধেক অর্জন করা সম্ভব। সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন ‘তথ্য, সমন্বয় ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে প্রান্তিক গোষ্ঠীর যুবকদের কাছে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছায় না।’ না পৌঁছানোরই কথা। যেহেতু বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সিংহভাগই রাজধানীকেন্দ্রিক, ফলে অর্ধেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রাজধানীতেই হওয়ার কথা। দেশের অধিকাংশ প্রত্যাশিত চাকরির বাজার যখন ঢাকায়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই রাজধানীতেই সব কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে। বিকেন্দ্রীকরণ না হলে, এই অবস্থা আরও খারাপ হবে। যেহেতু রাজধানীকেন্দ্রিক সব কর্মযজ্ঞ, সেহেতু এখানেই হবে প্রত্যাশীদের ভিড়।

ঢাকায় বিনিয়োগে সুফল কম মিলছে জেলা ও উপজেলায় বিনিয়োগের চেয়ে। তবে এসব ভাবছে না সরকার। এতে বিনিয়োগে জিডিপি কমে যাচ্ছে ৬ থেকে ১০ শতাংশ। ঢাকার অতিবৃদ্ধি সারা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশের সব জেলা-উপজেলার কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী যখন দেখেন, ঢাকাতেই সব তখন নিকট ভবিষ্যতে পরিবহন থেকে শুরু করে চরম ঘনবসতির এক নাম হবে ঢাকা শহর। অথচ নগরায়ণ এবং কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ হলে পরিস্থিতি হতো অন্যরকম। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। এই কারণেই রাজধানীতে বাড়ছে পরিবহনের চাপ। দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত ‘দেশের অর্ধেক কর্মসংস্থান ঢাকায়’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ আসে ঢাকা থেকে এবং সারা দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মসংস্থান ঘটছে ঢাকায়। অথচ ঢাকায় ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নেই। ২৫ ভাগ সড়কের স্থানে রয়েছে মাত্র ৮ ভাগ এবং ৫২ শতাংশ মোটরযানই চলাচলের অযোগ্য। এসব কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে যানজট। নগরবাসীর বিভিন্ন মৌলিক নাগরিক সেবা অর্থাৎ, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, সড়ক, পরিবহন, বাসস্থানের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ক্রমাগত দখল ও দূষণে দেশের শহরগুলোর সবুজ ও জলজ অংশগুলো বিলীন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারা দেশের প্রায় অর্ধেক কর্মসংস্থান ঘটছে ঢাকায়। অপরিকল্পিত কার্যক্রমের ফলে সবক্ষেত্রে ঢাকার বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরে রাখা যাচ্ছে না। শনিবার রাজধানীতে ‘স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ : সমস্যা ও সমাধান’ বিষয়ক বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) বিশেষ সম্মেলনে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

অথচ এমন চিত্র কাক্সিক্ষত ছিল না। দেশব্যাপী কর্মসংস্থান না হলে, রাজধানীর চেহারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে কী ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে, তা কল্পনারও অতীত। বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বাপার সহসভাপতি ড. নজরুল ইসলাম বাপা-বেনের বিশেষ সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন। লিখিত প্রবন্ধে বলেন, ১৯৭৪ সালে দেশের নগর অঞ্চলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ বিগত ৪৮ বছরে দেশে নগর অঞ্চলের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। জনশুমারি ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ বসবাস করে।

দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ এখন শহরে বসবাস করে; এর মধ্যে ঢাকাতেই বসবাস করে ৩২ শতাংশ নগরবাসী। ২০৪১ সালে দেশের ৫০ শতাংশ নগর অঞ্চলে রূপ লাভ করবে। সরকার উন্নত দেশ গঠনের ঘোষণা দিলেও উন্নত দেশ যেসব প্রকল্প থেকে সরে আসছে, সেসব প্রকল্প ঢাকায় বাস্তবায়ন করছে। ঢাকায় অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করছে, দেশের অন্যান্য শহরও সেসব প্রকল্প দাবি করছে। সারা দেশ ঢাকাকে অনুসরণ করে। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই গণমুখী নয়, কিছু প্রকল্প শুধু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কথা বিবেচনা করে করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম থেকে সরে এসে সরকারকে গণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে, তাহলে তা পরিবেশবান্ধব হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পুরো দেশকে বাদ দিয়ে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক যেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে তাতে যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা আদৌ কি সম্ভব?