মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচন নীতিতে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে মুদ্রাবাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংককেই ধার করে চলতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণে যে প্রবৃদ্ধি ধরেছিল, তা কোনো মাসেই অর্জন করতে পারেনি। তাই দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে কমানো হচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি। পাশাপাশি ঘোষণা দেওয়ার পরও বাজারভিত্তিক হচ্ছে না ডলারের দর। ডলার সংকট সহনীয় পর্যায়ে না আসায় এ মুদ্রার দর বাজারের ওপর না ছাড়তে নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডসভায় মুদ্রানীতির খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। আগামী ১৭ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু কোনো মাসেই এ খাতের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। এমনকি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের পাঁচ মাসই প্রবৃদ্ধি ছিল এক অঙ্কের ঘরে। শুধু গত অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ হয়েছিল। মূলত, সংকোচন নীতির কারণে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট ও সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবারের মুদ্রানীতিতেও সংকোচন নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১০ দশমিক ৯ থেকে ৪০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১০ দশমিক ৫ ধরা হতে পারে।
তথ্য বলছে, দীর্ঘদিন থেকে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার দাবি তৈরি হলেও নতুন মুদ্রানীতিতেও এটি বাজারভিত্তিক হচ্ছে না। ক্রলিং পেগ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নীতি সুদহার বাড়ানোসহ নানা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে। নীতি সুদহারসহ ব্যাংক ঋণের সবরকম সুদ আরও বাড়িয়ে সংকোচনমুখী ধারা অব্যাহত রাখা হবে। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, ১৭ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে এবারের মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য চলমান সব ধরনের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব সংকোচনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও চলমান থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মুদ্রানীতির খসড়ায় মুদ্রানীতি কমিটিতে গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রয়েছেন অর্থনীতিবিদ সাদিক আহমেদ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান মাসুদা ইয়াসমীন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে মুদ্রানীতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। গত ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে ও আগামী জুনের মধ্যে তা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের। গত নভেম্বর শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়। মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের সুদহার কিছুটা বাজারভিত্তিক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি নীতি সুদের হারও বাড়িয়েছে। এতে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
এদিকে ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, রিজার্ভ ২০ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩৮ কোটি ডলার। প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ বর্তমানে ১৬ বিলিয়ন ডলারের কম।