চাহিদা অনুযায়ী দেশেই এখন নানা জাতের ফুলের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ছে। উৎপাদিত এসব ফুল স্থানীয় বাজারেই কেনাবেচা হয়ে থাকে। কিন্তু দেশে উৎপাদিত ফুল আত্মীয়স্বজনের হাত ধরে বিদেশ যাত্রায় ছিল সীমাবদ্ধ। রপ্তানির বাজার ছিল অধরা। এখন সে দুয়ার খুলেছেন, সাতক্ষীরার ইমরান হোসেন। সম্প্রতি তিনি দুবাইতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল রপ্তানি শুরু করছেন। গত মাসে ৫ হাজার ৭০০ পিস রজনীগন্ধা এবং ২ হাজার ৪০০ পিস জারবেরা ফুল রয়েছে। প্রতি কেজি ফুল বিক্রি হয়েছে সাড়ে তিন থেকে চার ডলার করে। চলতি বছর অক্টোবর থেকে দেশটিতে আরও বড় পরিসরে রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হবে। যা ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
এর আগে ২০১০ থেকে ২০১২ সালে দুবাইতে ফুল রপ্তানি করলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বাণিজ্যিকভাবে আর ফুল রপ্তানি হয়নি। অথচ খাতটিতে রয়েছে বড় একটি রপ্তানির বাজার এবং রঙিন সম্ভাবনা।
জানা গেছে, সাতক্ষীরার একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিডি ট্রেড। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইমরান হোসেন নিজ উদ্যোগে দুবাইয়ের বিটুবি মার্কেট প্লেসের কাছে এই ফুল রপ্তানি করেছেন। যেখানে দুটি চালানে ৮০০ কেজি ফুল রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৭০০ পিস রজনীগন্ধা এবং ২ হাজার ৪০০ পিস জারবেরা ফুল রয়েছে। প্রতি কেজি ফুল বিক্রি হয়েছে সাড়ে তিন থেকে চার ডলার করে।
জানা গেছে, ক্রেতা ফুলের মান পছন্দ হওয়াতে প্রতিনিয়তই অর্ডার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শিগগির গ্লাডিওলাস ও সূর্যমুখী ফুলও দেশটিতে রপ্তানির প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
বিডি ট্রেডের স্বত্বাধিকারী ইমরান হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, আমাদের অনেকগুলো সক্ষমতার ঘাটতির মধ্যেও বাণিজ্যিক রপ্তানি শুরু করতে পেরেছি। এর মাধ্যমে রপ্তানি পণ্যের নতুন বাজার উন্মুক্ত হলো।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ফুলগুলো তাদের মূল মার্কেটের জন্য নেওয়া হয়েছে। যেখানে দেশটির নির্দিষ্ট মানের বাইরে কোনো পণ্য নেওয়া হয় না। মান ঠিক রাখ ও সরবরাহ ঠিক থাকলে ফুলের রপ্তানির প্রতিনিয়ত বাড়বে।
জানা গেছে, রপ্তানি হওয়া ফুলগুলো উৎপাদন হয়েছে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায়। সেখান থেকেই উৎপাদন পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়া শেষ করে দুবাইতে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে দুবাই, কুয়েতে নামমাত্র পরীক্ষামূলক কিছু ফুল গেলেও সেগুলো বাণিজ্যিক রূপ পায়নি। বেশির ভাগ সময়েই এগুলো গিয়েছে নমুনা হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া, ইতালিতেও বিভিন্ন সময়ে নমুনা হিসেবে ফুল পাঠানো হলেও সেখানে রপ্তানি করা যায়নি।
উৎপাদন ও রপ্তানিকারকরা বলছেন, ফুলের রপ্তানির বাজার বেশ বড়। বিশেষ করে কাট ফ্লাওয়ার সেক্টরে বড় সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বজুড়ে ফুলের চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে। কারণ এখন ফুল শুধু উপহার না; হোটেল, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ওয়েডিং, করপোরেট ডেকোরেশন, সুপারশপ সব জায়গাতেই নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে। অবশ্য এসব কাজে স্থানীয় বাজারেও ফুলের বড় মার্কেট তৈরি হয়েছে। যা এখন প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বাজার।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নব্বইয়ের দশকে কাট ফ্লাওয়ার এর রপ্তানি বাজার ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের। যেটা ২০১৫ সালের ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। গ্লোবাল মার্কেট ইনসাইড অ্যান্ড গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্য বলছে, বর্তমান প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাট ফ্লাওয়ারের বাজার তৈরি হয়েছে। এখানে বড় রপ্তানিকারক দেশ নেদারল্যান্ডস। যারা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ৫০ ভাগই সরবরাহ করছে। এ ছাড়া কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, কেনিয়ার সঙ্গে বেলজিয়াম, ইথিওপিয়া এবং চায়নাও রপ্তানি বাজারে ভালো দখল তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এদিকে রপ্তানি বাজারের মধ্যে দুবাই, কাতার, সৌদি আরব, ওমানেরমতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সম্ভাবনাময় রপ্তানির গন্তব্য। শক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারলে যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ফুল রপ্তানি করা সম্ভব বলে জানান উদ্যোক্তারা।
তারা জানান, দেশে ফুলের পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকলেও উত্তম কৃষি চর্চার অভাব রয়েছে। যেটুকু হচ্ছে, সেটা আবার কার্গোতে তুলার আগ পর্যন্ত নানা সংকটে বাধার মুখে পড়ে।
রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরবরাহে পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা, রপ্তানির ৫ ঘণ্টা আগে কার্গো ভিলেজে পৌঁছানো এবং সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ না থাকা, বিমান পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ রপ্তানিতে বড় বাধা। একই সঙ্গে নতুন নতুন বাজারে রপ্তানি উৎসাহিত করতে সরকারের প্রণোদনা থাকাও প্রয়োজন বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
জানা গেছে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় ২০২১ সালে তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ আমেরিকা সৌহার্দ্য ফুল বিপণন কেন্দ্র। যা ইউএসএআইডির সহায়তায় নির্মাণ করা হয়। এই কেন্দ্র উৎপাদিত ফুলের উৎপাদন পরবর্তী ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহৃত হয়। যেখানে ফুল বাছাই থেকে শুরু করে প্যাকেজিং পর্যন্ত করা হয়েছে। গত মাসে এই কেন্দ্রের একটি কুলিং ভ্যানে করে রপ্তানি ফুলের চালান দুটি বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এ সময় উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত সব পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনও আন্তরিক ভূমিকা পালন করছে বলে জানান, ইমরান হোসেন।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার্স সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. আব্দুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্ধতি মেনে উন্নত মানের ফুলের উৎপাদন ও উৎপাদন পরবর্তী ব্যবস্থাপনাসহ রপ্তানি উপযোগী চালান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ আমেরিকা সৌহার্দ্য ফুল বিপণন কেন্দ্র। প্যাকেজিংসহ রপ্তানির আগের ধাপের কাজগুলো সেখানে করা যাচ্ছে।
জানা গেছে, দেশে এখন গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্ল্যাডিওলাস, টিউলিপ, রজনীগন্ধা, জারবেরাসহ নানা জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। দেশের বাজারের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই মেটায় ঝিকরগাছার গদখালীর গ্রামে উৎপাদিত ফুল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেব বলছে, গদখালী সাভারসহ সারা দেশে প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে। যেখানে প্রতি বছর ৩২ হাজার টন বা তারও বেশি ফুল উৎপাদন হচ্ছে।
