ধোঁয়া-ধুলার ছড়াছড়ি

বছরের নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার বাতাসের মান অস্বাস্থ্যকর থাকে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে বাতাসের মান খারাপ থাকে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি বরং মান আরও খারাপ হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বাতাসের মান বা এয়ার কোয়ালিটি স্কোর (একিউআই) ছিল ২৫০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে। বাতাসের এ মান খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, কয়েক দিন ধরে ঢাকায় সূর্যের আলোর দেখা মিলছে না। বৃষ্টিরও দেখা নেই। এ অবস্থায় কুয়াশা ও ধুলা মিলে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪ থেকে ৫ মাইল পর্যন্ত ধোঁয়াচ্ছন্ন। বাতাসের এমন অবস্থায় মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়ে থাকে। তবে এ অবস্থা চলে গেলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হবে।

তারা আরও জানান, শীতকালে ঢাকার বাতাসের মান বেশি খারাপ থাকে। আর বর্ষা মৌসুমে কিছুটা উন্নতি লাভ করে। বছরের জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ঢাকায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এসব কারণে তখন ঢাকার বাতাস অনেকটা নির্মল থাকে।

২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি কারণ হলো নির্মাণকাজে সৃষ্ট ধুলা, ইটভাটা ও যানবাহনের ধোঁয়া।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তথ্যমতে, বছরে ঢাকায় গড়ে ৫০০টি নতুন ভবন তৈরি হয়। এসব ভবনের নির্মাতাদের অধিকাংশই ধুলার উৎস প্রতিরোধ না করেই ভবন নির্মাণ করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোও এ ব্যাপারে বেখেয়াল থাকেন। প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার সড়কে বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি চলে। সেসব থেকেও প্রচুর ধুলা তৈরি হয়। চলতি মৌসুমে সিটি করপোরেশন এলাকায় নর্দমা, ফুটপাত, সড়ক, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগসহ বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজের জন্য ২০০ কিলোমিটারের বেশি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এসব সড়কের উন্নয়ন কাজের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারদের ধুলা নিয়ন্ত্রণ করে কাজ করার কথা থাকলেও তারা তা করছেন না। সিটি করপোরেশনও এ বিষয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন গুটিকয়েক গাড়িতে ধুলা নিয়ন্ত্রণে সড়কে পানি ছিটাতে দেখা যায়। সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য।

ঢাকার আশপাশে শত শত ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার ধোঁয়া ঢাকার বাতাসকে দূষিত করছে। সরকার উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে ইটের পরিবর্তে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা দিলেও তাতে তেমন সফলতা মেলেনি। ২০২৪ সালের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে শতভাগ ইটের পরিবর্তে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। স্বল্প পরিমাণ উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার শুরু করেছে। তবে আশার কথা বেসরকারি পর্যায়ের উন্নয়নে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ঢাকার বাতাস দূষণের আরেক বড় উপাদান মোটরচালিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া। ঢাকায় বর্তমানে অনুমোদিত বিভিন্ন ধরনের মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্যমতে, ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ মোটরযান অর্থাৎ, প্রায় সাত লাখ গাড়ি দূষণের কারণ। এ ছাড়া যানবাহনের নিম্নমানের জ¦ালানিও ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।

ভুক্তভোগী রাজধানীবাসীর অভিযোগ, এবার শীতের শুরু থেকেই ধুলাদূষণে একাকার হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। চলতি মৌসুমে বৃষ্টি কমার পর থেকে ঢাকায় ধুলা বাড়তে শুরু করেছে। এখন শীত বাড়ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধুলাও। ঠান্ডা ও ধুলা দূষণজনিত কারণে নগরবাসী নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

শহরের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি, যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আবর্জনার ফলে মূলত ঢাকায় ধুলার সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর গাছ ও লতাগুল্মের গোড়ার মাটি, অতিরিক্ত গাড়ি, অতিরিক্ত মানুষ, গাছের পাতা শুকিয়েও ধুলার সৃষ্টি হয়। ধুলা-ধূসরিত এ নগরে চলাচলের সময় ধুলায় একাকার হয়ে পড়ছে মানুষ। ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া যারা চলাচল করেন নগরীতে তারা খুবই অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েন। বাসা থেকে পরিষ্কার কাপড় পরে বের হয়ে অফিসে যেতে তা নোংরা হয়ে যায়। হাত, মুখ, চুল ও পোশাক ধুলার আস্তরণে ঢেকে যাওয়ার অবস্থা। অফিস শেষে বাসায় ফিরতে পোশাকের করুণ হয়ে যায়। নগরীর অতিরিক্ত ধুলার কারণে এক পোশাক দুবার পরার সাহস কেউ করতে পারেন না।

রাজধানীর ঢাকার প্রবেশমুখ গাবতলী, আবদুল্লাপুর, সায়েদাবাদ, পোস্তগোলা এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এসব সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়ার পথে মানুষ ধুলায় একাকার হয়ে যাচ্ছে। একই চিত্র গাবতলী-মোহাম্মদপুর-বাবুবাজার বেড়িবাঁধ সড়কেও। আর মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি প্রকল্পের কারণেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এসব খোঁড়াখুঁড়ির কারণেও নগর জুড়ে ধুলায় একাকার অবস্থা।

ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের অলিগলিতে নর্দমা, সড়ক ও সেবা সংস্থার বিভিন্ন প্রয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। বাড্ডার বিভিন্ন সড়ক, মিরপুর, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। আর ধুলা প্রতিরোধক ব্যবস্থা না করেই নির্মিত হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি ভবন; এসব ভবনের ইট, পাথর, বালু থেকে প্রচুর ধুলা হচ্ছে। পণ্যবোঝাই ট্রাক থেকেও প্রচুর ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার বাতাস বেশি অস্বাস্থ্যকর থাকে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসের বাতাসের মান সবচেয়ে বেশি খারাপ থাকে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও একই অবস্থা বায়ুদূষণের চিত্র একই রকমের। গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বাতাসের ‘একিউআই স্কোর’ ২৫০ থেকে ৩০০ পর্যন্ত থাকছে। এ সময়ের বাতাস খুবই অস্বাস্থ্যকর।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-পবার চেয়ারম্যান আবু নাছের খান বলেন, ঢাকার ধুলা দূষণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ। ছোট-বড় নানা রোগের উৎস বায়ুদূষণ। কিন্তু সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সেদিকে তেমন কোনো দৃষ্টিপাত নেই।

জানতে চাইলে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মোবারক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় বছরে গড়ে নতুন করে ৫০০ ভবন তৈরি হচ্ছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী সবার ধুলা নিয়ন্ত্রণ করে ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ মানুষই তা করেন না। রাজউক এসব ক্ষেত্রে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে।

রাজউকের অথরাইজড অফিসার (৪/১) প্রকৌশলী ইমরুল হাসান বলেন, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার ভবন নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে এখন নির্মাতা যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ করছে। তবে অন্যান্য এলাকায় কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ তথ্য দিয়ে জানিয়েছে, বায়ুদূষণের মৃত্যুর প্রধান কারণ স্ট্রোক, ক্যানসার, হৃদরোগ।

প্রসঙ্গত, বছরে পরিবেশ দূষণে বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ লোক মারা যায়। এসব মৃত্যুর প্রতি ১০ জনে ১ জন বায়ুদূষণে মারা যায়।