কারাগারে আটক বন্দিদের ডান্ডাবেড়ি পরানো নতুন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সমালোচনা সত্ত্বেও বড় ধরনের কোনো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত না হলেও প্যারোলে মুক্তিপ্রাপ্ত আসামিদের হাত-পা থেকে হাতকড়া এবং ডান্ডাবেড়ি খুলছেই না। বরং প্রায়ই ঘটছে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এ ধরনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। কখনো বাবা বা মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার সময়, আবার কখনো হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থাতেও ডান্ডাবেড়ি খুলে দেওয়া হয়নি। কারা কর্র্তৃপক্ষ ও পুলিশ জেল কোড বা বন্দি আইনের ‘অজুহাত’ দিলেও অনেকেই এগুলোকে ‘অমানবিক’ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেছেন। এমনই এক ঘটনায় ১০০ বছরের বেশি আগে ব্রিটিশদের তৈরি কারাবিধি (জেল কোড) এখনো সংস্কার না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল উচ্চ আদালত। মানবাধিকারকর্মীদের কারও কারও মতে, ঔপনিবেশিক আমলের এসব বিধি ও আইন কোনোভাবেই স্বাধীন দেশে প্রযোজ্য হতে পারে না এবং এ ধরনের ঘটনা উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা থেকে শুরু করে মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবীদের সমালোচনা কোনোকিছুই ডান্ডাবেড়ি খুলতে পারছে না।
সর্বশেষ, মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পিতার জানাজায় এক আসামিকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে হাজির করানোর ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত। হাইকোর্ট বলেছে, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমরা হয়তো আনসিভিলাইজড (সভ্য নয়) হিসেবে পরিচিত হব।’ হাইকোর্ট এ সময় যশোরে এক যুবদলের নেতাকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডান্ডাবেড়ি পরানো নিয়ে রিটের কথাও উল্লেখ করে। মাসখানেক আগে যশোরের ঘটনাটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল হাইকোর্ট। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ পদক্ষেপ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছিল আদালত। এর আগে ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিএনপি নেতা আলী আজম কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে মায়ের জানাজায় অংশ নিতে এসেছিলেন। তখন তার ডান্ডাবেড়ি পরে মায়ের জানাজা পড়ার ছবি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ ঘটনাকে ‘অমানবিক’ বলে অভিহিত করেছিল। ওই বছরের ১৫ জানুয়ারি একই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটে। এবার শরীয়তপুরে হাতে হাতকড়া আর পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় মায়ের জানাজায় অংশ নেন সেলিম রেজা নামের ছাত্রদলের এক কেন্দ্রীয় নেতা।
আলী আজম ও সেলিম রেজাকে ডান্ডাবেড়ি পরানোর ঘটনা নিয়েও উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছিল। তখন প্রিজনস অ্যাক্ট ও জেল কোডের সংশ্লিষ্ট বিধি ‘স্বেচ্ছাচারী ও অযৌক্তিকভাবে’ ব্যবহার করে সাধারণ বন্দিদের ডান্ডাবেড়ি ও হ্যান্ডকাফ পরানো কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছিল হাইকোর্ট। কয়েক বছর আগেও আসামিকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে (এজলাসে) না তুলতেও সতর্ক করা হয়েছিল।
ডান্ডাবেড়ি পরানো নিয়ে আদালতের রুল ও সতর্কতার পরও কেন একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কারা কর্র্তৃপক্ষ কি এটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না? কেন এ ধরনের ‘অমানবিক’ ঘটনা ঠেকানো যাচ্ছে না? সাম্প্রতিক সময়ে ডান্ডাবেড়ি নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোতে ‘ভুক্তভোগী’ সবাই বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে ডান্ডাবেড়ি সংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বা দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে আইন ও অন্যান্য বিধিতে কিছু সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু কোথাও অভিযোগের নামে কোনো নাগরিককে অসম্মান ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কথা বিন্দুমাত্র বলা নেই। আর সব আসামির ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা পুলিশের সমান তৎপরতা দেখি না। তাহলে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে?