গাজায় চালানো গণহত্যার জন্য ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যে অভিযোগ দায়ের করেছে, তা অতিরঞ্জন, অন্ধত্ব ও সব ধরনের পক্ষপাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। অভিযোগটি ৮৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত নথি। যার খসড়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করেছেন আন্তর্জাতিক গণহত্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একটা দল। মৌলিক প্রমাণের সঙ্গে এতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অনেক পার্শ্বপ্রমাণ। আইনের দৃঢ় যুক্তির ওপর তৈরিকৃত এ নথি অকাট্য, যাচাইকৃত ও ব্যাপক তথ্যপ্রবাহভিত্তিক একটি শক্তিশালী মামলার ভিত্তি তৈরি করেছে।
উক্ত নথিপত্রে এটা স্বীকার করা হয়েছে যে, ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে বেসামরিকদের বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধাপরাধের জন্য হামাস দায়ী ছিল। কিন্তু সেদিন যা ঘটেছিল, তার জন্য গাজার পুরো জনসংখ্যার বিরুদ্ধে গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন যা ঘটেছে তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
নথিটি সাতটি মূল পয়েন্টে পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যার প্রামাণিক যুক্তিতর্ক হাজির করে।
১. হত্যার মাত্রা : মৃত্যু ছাড়িয়েছে ২৩,০০০। যার ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। ২. শিশুসহ বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিকের সঙ্গে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ : তাদের গ্রেপ্তার করে চোখ বেঁধে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া। এমনকি তাদের পোশাক খুলতে ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বাইরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। ৩. ক্রমাগত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ : লিফলেট ও মাইকে গাজার স্থানীয় বাসিন্দাদের পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ। ৪. খাদ্য ও পানি প্রবেশে বাধা : এটি যুদ্ধাপরাধী ইসরায়েলের এমন অমানবিক নীতি, যা গাজার জনসংখ্যাকে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ৫. পর্যাপ্ত আশ্রয় সরঞ্জাম, পোশাক এবং স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রবেশে বাধাপ্রদান : স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনাকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের আক্রমণের ফলে ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৩টি টিকে আছে। সেগুলোও আংশিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে পারছে। ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধী বাহিনী হাসপাতালের জেনারেটর, সোলার প্যানেল, অক্সিজেন স্টেশন, পানির ট্যাঙ্ক, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসা কনভয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাচ্ছে। ৬. ধ্বংসযজ্ঞ : ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনের শহর, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পাঁয়তারা ও কার্যক্রমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ৭. ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের ঘোষণা : প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট হামাসের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসনকে ‘মানব পশুদের’ বিরুদ্ধে লড়াই বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এবং রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ স্পষ্ট বলেছেন, ‘এর জন্য দায়ী একটি সম্পূর্ণ জাতি’। এছাড়া ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কথাবার্তায় ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি স্পষ্ট। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বাইবেলের রেফারেন্স টেনে ইসরায়েলিদের দ্বারা আমালেকদের জাতিগত নির্মূলের গল্প উল্লেখ করে বিবৃতি প্রদান করেছেন।
গিডিয়ন লেভি সাংবাদিক ওয়েন জোনসকে বলেছেন, একটি জরিপের রেফারেন্সে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ইসরায়েলি নাগরিক গাজার জাতিগত নির্মূলকে সমর্থন করে এসেছে। কিন্তু ইসরায়েল এখন এটি আর স্বীকার করতে চায় না।
ইসরায়েল মূলত জাতিগত নিধন শুরু করেছে। গাজা উপত্যকায় বিদ্যুৎ, পানি এবং ডিজেলের সরবরাহ বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে দখলদার বাহিনী এটাকেও যথেষ্ট মনে না করায় অবরুদ্ধ অঞ্চলে বহিরাগত সাহায্যের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এসবের মাধ্যমে গাজার বাসিন্দাদের কার্যত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের সামনে দুটো পথ মাত্র খোলা গাজায় থাকতে চাইলে ক্ষুধার্ত ও আহত হয়ে কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুবরণ করতে হবে অথবা গাজা ছেড়ে মিসর ও অন্যান্য দেশে চলে যেতে হবে। তথাপি ইসরায়েল আশা করে গাজার অধিবাসীরা গাজায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে। এ পৈশাচিক আনন্দই তাদের পছন্দসই।
ইসরায়লের বিরুদ্ধে আইসিজে-তে গণহত্যার অভিযোগ দায়েরকারী দেশটি গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রামে সফল হওয়ার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ এই দক্ষিণ আফ্রিকা। আজকের ইসরায়েলের মতো, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকাও ছিল একটি পারমাণবিক শক্তি। সমস্ত প্রধান পশ্চিমা শক্তি দ্বারা সমর্থিত দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী সেনাবাহিনী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহকে দমিয়ে রেখেছিল প্রায় তিন দশক ধরে। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইসরায়েল উভয় দেশই আইসিজে’র বিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। এবং উভয়ই গণহত্যা কনভেনশনের চুক্তিতে সম্মত।
অভিযোগ দায়েরের পর থেকেই ইসরায়েল অযৌক্তিকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হামাসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলছে। অথচ এ দাবির সপক্ষে ন্যূনতম কোনো প্রমাণ নেই। উলটো ইসরায়েলের সরকারি মুখপাত্র আইলন লেভি ইসরায়েলি জনগণের বিরুদ্ধে হামাসের ‘গণহত্যার প্রচারণা’র সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ‘জড়িত থাকার অপরাধে’ অভিযুক্ত করেছেন। তার মতে, যে জাতি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেকে গর্বিত উদাহরণের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, সে জাতির জন্য ইহুদি-বিরোধী বর্ণবাদীদের পক্ষে লড়াই করাটা মর্মান্তিক বিষয়। ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে আইসিজের কাছে মামলাটিকে ছুড়ে ফেলার আবেদন জানিয়েছেন ইসরায়েলি আইনজীবীরা।
দক্ষিণ আফ্রিকার করা এ মামলার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের মিত্ররাও একই সুরে কথা বলছেন। যুক্তরাজ্যের প্রায় ৭০ ভাগ সাধারণ নাগরিক, প্রধান পোপসহ বিপুল সংখ্যক ধর্মীয় নেতা, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার আবেদন জানিয়ে এলেও তা কেউ কানে তুলছে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী সুনাক মনে করেন দক্ষিণ আফ্রিকার মামলাটি পুরোপুরি ভুল ও অন্যায্য। এ ধরনের আইনি পদক্ষেপকে শান্তি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করে ঋষি সুনাক বলেন, যুক্তরাজ্যের সরকার আন্তর্জাতিক আইনের সীমানা মেনেই ইসরায়েলিদের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে। হোয়াইট হাউজ ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র জন কিরবি দক্ষিণ আফ্রিকার মামলাটিকে আমলে নেওয়ার অযোগ্য, দুর্বোধ্য এবং সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। এছাড়াও ফিলিস্তিন নিয়ে বিভিন্ন গায়ক, শিল্পী, ব্যবসায়ী ও সেলিব্রিটিদের অবস্থান গণহত্যাবাদী, বর্ণবাদী এবং নির্লজ্জভাবে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছে। এমনকি তারা তাদের বর্ণবাদ নিয়ে গর্বিত। গাজা উপত্যকায় বয়ে যাওয়া নারী ও শিশুর রক্তের সঙ্গে তারা প্রকাশ্যে তামাশা শুরু করেছে।
আইসিজে, আইনের ধর্মালয়
যেকোনো ধর্মালয় বা উপাসনালয়ে ধর্মবোধ না থাকলে বা অধর্ম বাসা বাঁধলে তা অসাড় স্থাপনা হয়ে ওঠে। ন্যায়বিচারের বৈশ্বিক ও প্রধান ধর্মালয় আইসিজের অতীতের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে একে তেমনই এক অসাড় আদালত বলে মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং এর সমর্থক মালয়েশিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য দেশ গাজায় চলা গণহত্যা ও জাতিগত নিধন বন্ধের আবেদন জানালেও আইসিজে ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক শক্তিশালী মিত্রদের বিরোধিতার মুখে কতটুকু কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিজে আইনপ্রয়োগকারী কোনো সংস্থা নয়। আইসিজের নির্দেশনা মেনে নেওয়ার তাত্ত্বিক বাধ্যকতা থাকলেও কোনো দেশকে তা মেনে নিতে বাধ্য করার প্রায়োগিক ক্ষমতা এর নেই। আমাদের সামনে এর জলজ্যান্ত নমুনা বিদ্যমান। আইসিজে ২০২২ সালে রাশিয়াকে অবিলম্বে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ জারি করলেও রাশিয়া তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও দেশের কাছে আইসিজে’র মতামত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিলমাত্র। তবে এ দলিল বিভিন্ন বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার দায়েরকৃত অভিযোগের রায় কখন দেওয়া হবে, তা আইসিজের আওতাধীন। তবে, আইসিজে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য আপাতত ইসরায়েলকে গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল হয়তো নিধনযজ্ঞের কৌশলে রাজনৈতিক ও আইনি পরিবর্তন আনতে পারে, যেন পরবর্তী সময়ে এ নিধনযজ্ঞকে আইনিভাবে ‘গণহত্যা’ আখ্যা না দেয়ো যায়। অথবা আইসিজের নির্দেশনার প্রতি ইসরায়েল কোনো ধরনের কর্ণপাত না করে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে পারে। এ সমস্ত সম্ভাবনার বাইরে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজায় চলা যুদ্ধাপরাধের শাস্তি বিধান ইত্যাদি নিয়ে আইসিজে সম্ভবত মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে। ফলে, উপস্থিত নির্দেশনা ও রায় যাই আসুক না কেন, ইসরায়েলের জাতিগত নিধনকে গণহত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে ভিন্নপথে উদ্দেশ্য সাধনের সুযোগ করে দেওয়া ছাড়া আইসিজের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করা যায় না।
আইসিজে-তে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলা ছয় ঘণ্টার শুনানিতে উঠে এসেছে কয়েক দশকের নির্মম ইতিহাস। এ শুনানির মাধ্যমে অন্তত ফিলিস্তিনিদের করুণ বাস্তব চিত্রটা আইনি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমাদের কাছে আসতে পেরেছে। ফলে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যের আড়াল থেকে সত্যটা বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ, দক্ষিণ আফ্রিকা এ মামলার মাধ্যমে শুধু ইসরায়েলকে নয়; বরং নৈতিকতা ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী গোটা পশ্চিমা বিশ্ব এবং খোদ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকেই ন্যায়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
লেখক : কলাম লেখক ও অনুবাদক
fojleyrabbiii@gmail.com