ভিক্ষা করে ‘লাখ টাকা আয়কারী’ ছেলের পরিবার চালান মা

মো. আলা উদ্দিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পৌরসভার পন্থিছিলা এলাকার বাসিন্দা। থাকেন সৌদি আরবে। তার মাসে আয় ৯০ হাজার টাকা। বাড়িতে আছে মা, স্ত্রী ও কন্যা। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের জন্য পাঠান না একটি টাকাও। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ৭০ বছরের বেশি বয়েসী মা দেলোয়ারা নামেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। আর সেই ভিক্ষার টাকায় চলছে নিজের ও ছেলের বউ-সন্তানদের জীবন।

স্বজন ও স্থানীয়রা বলছেন, আলা উদ্দিনের এমন স্বভাব ও বিভিন্ন অপকর্মের কারণে তাকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে।

জানা গেছে, প্রবাসে লাখ টাকা আয়ের পরও খবর নেন না মা, স্ত্রী ও সন্তানের। যদিও বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে ছিল তার তৃতীয় বিয়ে। এর আগে, প্রথম দুই স্ত্রীকে তালাক দিয়েই বর্তমান স্ত্রীকে বিয়ে করে ঘরে তোলেন। সেই ঘরে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। যার বয়স এখন পাঁচ বছর। এই কন্যাসন্তান জন্মের আগেই বিদেশ পাড়ি দেন আলা উদ্দিন। এরপর গত ছয় বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের জন্য পাঠাননি একটি টাকাও।

উল্টো এখন মাকে ফোন করে বারবার জানাচ্ছে— ‘তৃতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ব্যবস্থা করতে’। এতে রাজি না হওয়ায় মাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন ছেলে। আলা উদ্দিনের এমন স্বভাবের কারণে বিয়েটা তার ‘নেশায়’ পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য পরিবার ও স্থানীয়দের।

আলা উদ্দিনের এমন স্বভাব ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে মা দেলোয়ারার। ছেলে পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ না দেওয়ায় সত্তরোর্ধ্ব দেলোয়ারা এখন ভিক্ষাবৃত্তি করেন। গত পাঁচ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করেই ভরণ-পোষণ চালিয়েছেন নিজের, ছেলের বউ ও নাতনির। অথচ বয়সের ভারে হাঁটতেও কষ্ট হয় তার। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। তবুও অসুস্থ শরীরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় ক্লান্ত পায়ে হেঁটে মানুষের দ্বারে-দ্বারে যাচ্ছেন। এভাবে সারাদিনে ভিক্ষাবৃত্তি করে যা পান; তা দিয়েই জীবন চালিয়ে নেন তিনি।

সবশেষ ভিক্ষাবৃত্তির জন্য উপজেলার নুনাছড়া বটতল পন্থিছিলা ও শেখপাড়া এলাকায় যান দেলোয়ারা। এ সময় দেলোয়ারার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। ‘এ বয়সে কেন ভিক্ষাবৃত্তি করছেন’— এমন প্রশ্ন করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দেলোয়ারা। তিনি (দেলোয়ারা) বলেন, ‘আমার আপন বলতে একমাত্র ছেলে মো. আলা উদ্দিন। সে এখন সৌদি আরব থাকে। মাসে ৯০ হাজার টাকা বেতন পায়। তবে গত ৬ বছর ধরে একটি টাকাও দিচ্ছে না। শুধু আমার নয়; তার (ছেলের) নিজের স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ের জন্যও কোনো খরচাপাতি দেয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সে (ছেলে) তিনটা বিয়ে করেছে। বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে তার (ছেলে) তৃতীয় বিয়ে হয়। এর আগে, প্রথম দুই স্ত্রীকে কোনো কারণ ছাড়াই তালাক দেয়। এরপর বর্তমান স্ত্রীকে বিয়ে করে। এই ঘরে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তার বয়স এখন ৫ বছর।’

দেলোয়ারা বলেন, ‘কয়েক বছর আগে সে ফোন করে তৃতীয় স্ত্রীকে তালাকের ব্যবস্থা করতে আমাকে চাপ দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় অশ্রাব্য ভাষায় আমাকে গালিগালাজ করে। এরপর বেশ কিছুদিন ফোন করা বন্ধ করে দেয়। এর কয়েকমাস পর হঠাৎ ফোন দিয়ে আবারও স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলে। আমি রাজি না হলে আবারও গালি দিতে থাকে। শুধু তাই নয়; দীর্ঘদিন খরচপাতি না দেওয়াতে বর্তমান স্ত্রীও বাবার বাড়িতে ভাইদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে, পাঁচ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের (ছেলের বউ ও নাতনি) ভরণ-পোষণ চালিয়েছি। তারা বাপের বাড়ি চলে গেছে। এখন নিজের জন্য বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে।’

স্থানীয় কামাল উদ্দিন ও আরও কয়েকজন জানান, আলা উদ্দিন দুষ্ট স্বভাবের। একটার পর একটা বিয়ে করা তার ‘নেশায়’ পরিণত হয়েছে। বিদেশ গিয়ে দীর্ঘদিন সে স্ত্রীদের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখে না। একপর্যায়ে স্ত্রীরা তাকে ছেড়ে চলে যায়। ফলে স্ত্রীদের পাওনা টাকাও (কাবিন) তাকে পরিশোধ করতে হয় না। একটার পর একটা বিয়ে করে যাচ্ছে সে। অন্যদিকে অনেক টাকা বেতন পেলেও মাকে কিংবা স্ত্রী-সন্তানকে একটা টাকাও পাঠায় না।

আলা উদ্দিনের স্ত্রীর ভাই মো. মিজান বলেন, বিয়ের আগে যদি জানতাম ‘বিয়ে করা’ আর ‘ছাড়া’ তার ‘নেশা’। তাহলে কখনো আমার বোনকে সেখানে বিয়ে দিতাম না। সে আমার বোন বা আমাদের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ রাখছে না। সে সংসার না করলে আমার বোনকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতাম। কিন্তু সে কিছুই বলছে না; এমনকি স্ত্রী ও কন্যার জন্য একটা টাকাও পাঠায় না।

স্ত্রী নার্গিস আক্তার বলেন, ‘বিয়ের পর একটা সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখে সবাই। আমার স্বামী বিদেশ যাওয়ার আগে সবই ঠিক ছিল। বিদেশ গিয়েই সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। শুনেছি সে আমার আগেও দুটি স্ত্রীর সাথে একই ঘটনা ঘটিয়েছিল।’

সমাজের সর্দার মফিজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান স্ত্রীকে তালাক দিতে আমাকে ফোন দেয় আলা উদ্দিন। আমি তাকে দেশে এসে যা করার করতে বলেছি। বিভিন্ন অপকর্মের কারণে তাকে আমরা সমাজচ্যুত করেছি।’

এদিকে, আলা উদ্দিনের এমন স্বভাব এবং তার বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেবেন বলেও জানান তিনি।