জাহাঙ্গীরনগরে ‘পাখিশূন্য’ পাখিমেলা 

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে জলাশয়ের পানিতে ভেসে থাকা শাপলা ফুলের আস্তরণের ওপর অতিথি পাখির জলকেলি, দলবেঁধে উড়ে চলে যাওয়া আবার ফিরে আসা, জলাশয়ের বুক চিরে পাখিদের একপাশ থেকে আরেক পাশে ছুটে চলে যাওয়া, সঙ্গে মনোমুগ্ধকর কিচিরমিচির শব্দ।

তিন বছর আগে মানিকগঞ্জ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখি মেলায় ঘুরতে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলোতে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করেছিলেন সাবরিনা রহমান। কিন্তু এবারের পাখি মেলায় এসে সেরকম কোনও দৃশ্য চোখে পড়েনি তার। তিনি বললেন, ‘সবশেষ তিন বছর আগে শীতকালে ক্যাম্পাসের জলাশয়ে যে চিত্র দেখেছিলাম এবার তা দেখা পেলাম না। আমি এর আগে শীতকালে কয়েকবার ক্যাম্পাসে এসেছি, কিন্তু আজকে এসে মনে হচ্ছে ক্যাম্পাস তার সেই চিরচেনা রূপ হারিয়েছে।’

পাখিমেলায় ঘুরতে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে আশানুরূপ পাখি দেখতে না পাওয়ার হতাশা ব্যক্ত করেন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ঘুরতে আসা কলেজছাত্রী তাজরীন ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চার বছর আগে বাবার সঙ্গে শেষ জাহাঙ্গীরনগরে ঘুরতে এসেছিলাম। তখন জলাশয়ে অনেক পাখি দেখেছিলাম। পানিতে ছিল অনেক শাপলা ফুল। ফুল আর পাখি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু আজকে এবার এসে সেই দৃশ্য দেখতে পেলাম না। পাঁচ-ছয়টি জলাশয় ঘুরে দেখলাম কিন্তু সেরকম পাখির দেখা পেলাম না। একটি জলাশয়ে অল্প কয়েকটি পাখি দেখলাম কিন্তু দেখার তৃপ্তি মিটল না।’

মেলা উপলক্ষে আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি দেখা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোনাজাত হোসেন। পাখি দেখার জন্য বেশ কয়েকটি জলাশয় ঘুরে পাখি দেখতে পাননি তিনি। পাখি মেলায় এসে কেমন লাগছে জিজ্ঞেস করলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘পাখি দেখা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু জলাশয়গুলো ঘুরে পাখির দেখা পেলাম না।’

আজ শুক্রবার সকাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ২২তম 'পাখি মেলা'। সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তন প্রাঙ্গণে উদ্বোধনের মাধ্যমে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়। পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মেলার আয়োজন করা হয়। এবারের মেলার আয়োজক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ।

উৎসবমুখর পরিবেশে দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস মেলা অনুষ্ঠিত হলেও পাখিশূন্য ক্যম্পাসে পাখি সংরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পাখি মেলার আয়োজন করাকে অহেতুক বিলাসিতা বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলো প্রায় অতিথি পাখি শূন্য। শীতকালে জাহাঙ্গীরনগরে অতিথি পাখি নেই। নানান অব্যবস্থাপনা আর খামখেয়ালীপনায় পাখি আসছে না। আসলেও উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেদিকে খেয়াল না করে 'উচ্ছ্বাসের মেলা' আয়োজন করছে। এটা নিতান্তই বিলাসিতা বলে আমি মনে করি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি আসা শুরু করে ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরের পাশের জলাশয়, স্কুল অ্যান্ড কলেজের খেলার মাঠের পূর্ব পাশের জলাশয়, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার সংলগ্ন জলাশয়, নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয় এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনসংলগ্ন জলাশয়ে অতিথি পাখিতে পূর্ণ থাকত। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে দুই শতাধিক পাখি দেখা যেত। কিন্তু আগের তুলনায় গত দুই-তিন বছরে পাখির আগমন অনেক কমে এসেছে। এবছর জানুয়ারি মাসেও জলাশয়গুলোতে পাখির দেখা নেই। নেই আগের মতো পাখিদের কিচিরমিচির। বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণ, সময় মতো জলাশয় সংস্কার না করা, লেকের পাড়ে জনসমাগম এবং কোলাহলের কারণে পাখি আসা কমে গেছে।

সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে, শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বসাধারণের প্রবেশের নিষিদ্ধ এলাকা ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার সংলগ্ন জলাশয় ছাড়া অন্য কোনো জলাশয়ে পাখি নেই।

মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৬ সালে প্রথম অতিথি পাখি আসে। ক্যাম্পাসে ২০০০ সালে প্রথম পাখি মেলা শুরু করেছিল ‘বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব'। ২০০৪ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সরাসরি সম্পৃক্ত হয়। ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলো লিজ দেওয়ার কারণে পাখি না বসায় এবং ২০২১ সালে করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার ফলে মেলা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় এ বছর ২২তম পাখি মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ বছর মেলা উপলক্ষে নানান কর্মসূচির আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি দেখা প্রতিযোগিতা, পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শিশু-কিশোরদের জন্য পাখির ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, টেলিস্কোপ ও বাইনোকুলারস দিয়ে শিশু-কিশোরদের পাখি পর্যবেক্ষণ, পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি চেনা প্রতিযোগিতা এবং সকলের জন্য উন্মুক্ত পাখি বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

এ ছাড়া মেলায় বিগ বার্ড বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড, সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ড, কনজারভেশন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও স্পেশাল রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। প্রতি ক্যাটাগরিতে একজনকে আ্যওয়ার্ড দেওয়া হয়।

মেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘গত দুই-তিন বছর ক্যম্পাসে পাখি কম আসছে। এর প্রধান কারণ হলো জলাশয়ের পাড়ে জনসমাগম। মানুষের ভিড়ে পাখিরা বিরক্ত হয়। ফলে তারা সেখানে বসতে আগ্রহ দেখায় না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, ‘প্রতিবছর পাখি মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ ছুটে আসে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। এ বছর ক্যাম্পাসে পাখি কম এসেছে। কারণ মানুষ জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে পাখিদের বিরক্ত করে। পাখিদের দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারে। বহিরাগতরা ঘুরতে এসে পানিতে প্লাস্টিকসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলে রেখে যায়। এতে জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়। আমরা চেষ্টা করছি বিষয়টি সমাধানের জন্য।’