ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চিন্তা বিএনপির

চলতি মাসের শেষের দিকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর নেতারা। তারা বলেন, নির্বাচনের আগে যুগপৎভাবে কর্মসূচি পালন করা হলেও এখন ঐক্যবদ্ধভাবে এক প্ল্যাটফর্মে থেকে কর্মসূচি পালনের চিন্তাভাবনা চলছে।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, আবার মাঠে নামার আগে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কারাবন্দি নেতাদের জামিনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজপথের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসবে।

নতুন কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মসূচি না থাকলেও আমাদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’ তিনি বলেন, কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে এবং নির্বাচন-পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠক হয়েছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। আলোচনা এখনো চলছে, শেষ করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

কী ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজপথের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি দলের নেতাদের মতামত নেওয়ার কাজ চলছে। নির্বাচনের আগে আমরা যুগপৎভাবে কর্মসূচি পালন করেছি। এখন নির্বাচনের পর ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালনের চিন্তাভাবনা রয়েছে। সভা-সমাবেশে রাজপথের শরিক দলগুলোর সবাই একমঞ্চে উঠে বক্তব্য রাখবেন। এগুলো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি।’

বিএনপির দপ্তরসংশ্লিষ্ট নেতারা বলেন, ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণার আগে রাজপথের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা। পাশাপাশি গত বুধবার দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিবসহ অন্যান্য পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। আগামী সপ্তাহে আন্দোলনের শরিক গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে আলোচনা শেষে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। দলের আইনজীবীরা নেতাদের মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।’

পাশাপাশি নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র তুলে আনা হচ্ছে জানিয়ে এই নেতা বলেন, নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবে উঠে আসা বিভিন্ন ভিডিও একত্র করে ভিডিওচিত্র তৈরি করা হয়েছে। এসব ভিডিওচিত্রের কপি ইতিমধ্যে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা বিভিন্ন দেশের পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি ঢাকায় বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিসে সরবরাহ করা হয়েছে।

গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলা দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাসসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া দলটির দাবি তাদের অন্তত ২০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ১১ হাজার। এর মধ্যে পুরনো মামলায় নেতাকর্মীদের সাজা হচ্ছে। ঢাকায় গত কয়েক মাসে হাজারের বেশি নেতাকর্মীর সাজা হয়েছে। নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার আগে নেতাকর্মীদের জামিনের উদ্যোগ নিতে চান বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। গত বুধবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে দলের ভেতর আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয় এবং নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন।

বিএনপি মহাসচিবের জামিনের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তার ব্যক্তিগত সহকারী ও কৃষক দল নেতা মো. ইউনুছ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৭ জানুয়ারি পল্টন থানায় দায়ের হওয়া মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালত থেকে জামিন হয়েছে। এখন প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা মামলার জামিন হওয়া বাকি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মামলার জামিনের শুনানির তারিখ হয়নি।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) রমনা ও পল্টন মডেল থানার পৃথক চার মামলায় আমীর খসরুর জামিন মঞ্জুর করেছে আদালত। এ নিয়ে ১০ মামলার মধ্যে ছয় মামলায় জামিন পেলেন তিনি।’

তিনি আরও বলেন, বুধবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের বাসভবনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পর্যবেক্ষক দল এনডিআই ও আইআরআইয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি নেতারা। এ সময় মঈন খান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দলের আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ ও সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী। এনডিআই ও আইআরআই প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন নাতাশা রথচাইল্ড, ক্রিস্পিন কাহেরু, মারিয়াম তাবাতাদজে, নেনাদ মারিনোভিক ইভো পেন্টচেভ ও কাজী শহীদুল ইসলাম।

সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে গত ৯ জানুয়ারি থেকে কয়েকটি ধাপে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে গত ১৩ জানুয়ারি গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা। বৈঠকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে এক দফা দাবিতে নতুন কর্মসূচি দিয়ে শিগগিরই মাঠে নামার সিদ্ধান্ত হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষে ছিলেন নাগরিক ঐক্য সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদউদ্দিন মাহমুদ স্বপন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও গণতন্ত্র মঞ্চ সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুম ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বাবুল।

আন্দোলন-সংগ্রামের পরবর্তী কর্মসূচি কবে নাগাদ আসতে পারে জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি পালন করায় সময় নিয়েছে। তাদের দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষ হলে আগামী সপ্তাহে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে আবার বৈঠকে বসবে বিএনপি। ওই বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।’

গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। বিএনপি তাদের পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করছি। আন্দোলন-সংগ্রামের পর্যালোচনা চলছে। চলতি মাসের শেষের দিকে নতুন কর্মসূচি আসতে পারে।’