সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে দিল্লি

ভারত শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না 

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩১ এএম

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে যা কিছু বলেছেন, ভারত সরকার তা সমর্থন করে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল গতকাল শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে দেশটির সরকারের এ আহ্বানের কথা জানান।

জয়সোয়াল গতকাল নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘একটি বেসরকারি গণমাধ্যমের উদ্যোগে আয়োজনটি হয়। তাতে [ভারত] সরকারের কোনো ভূমিকাই ছিল না। ওই মঞ্চ থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত (ডিউলি কনস্টিটিউটেড) সরকারের বিরুদ্ধে, তার কোনো কিছুই ভারত সমর্থন করে না।’ 

বাংলাদেশ সরকারের আপত্তির মুুখে গত বুধবার নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলেন শেখ হাসিনা অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। একই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় কথা বলেন।

ঢাকা থেকে একই দিন রাতে এক কড়া বিবৃতিতে সরকার পলাতক দ-প্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এ বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা ভারতের মাটিতে বসে যা বলেছেন, তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের আবমাননা, জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা

ছড়ানো এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।

এর আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে দেশটির সরকারকে জানানো হয়, শেখ হাসিনা ও তার লোকজন ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্মকা- চালালে তা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয় এবং তিনি একই দিন ভারতে আশ্রয় নেন। কড়া নিরাপত্তায় নয়াদিল্লির অবস্থান থেকে এর আগে তিনি ভারতভিত্তিক কয়েকটি গণমাধ্যমকে ই-মেইলে সাক্ষাৎকার দেন। এমন একটি সাক্ষাৎকারে তিনি চলতি বছর ডিসেম্বরে দেশে ফেরার অভিপ্রায়ের কথা জানান।

শেখ হাসিনার বিদায়ের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার অংশ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস আউটরিচ কর্মসূচিতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আগামী ১৪ সেপ্টেম্বরের ব্রিকস আউটরিচ কর্মসূচিতে যোগদানের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।  

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অবশ্য ঢাকায় বিভিন্ন সময় মন্তব্য করেছেন যে, শেখ হাসিনা ও তার দল দেশের রাজনীতিতে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ (ইরিলেভেন্ট) হয়ে গেছে। 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করেন, রাজনীতিতে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখা, সমর্থকদের চাঙ্গা রাখা এবং নিজের দল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সক্রিয় রাখার চেষ্টার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা গণমাধ্যমে নানা রকম বক্তব্য দিচ্ছেন।

টোকিও থেকে গতকাল প্রকাশিত নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে (৫ আগস্ট) গণমাধ্যমের সরাসরি যুক্ত হওয়ার অন্তত তিনটি কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, শেখ হাসিনার ধারণা বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় তার (হাসিনার) জন্য বেশি অনুকূল। কারণ, তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে নিজের অবস্থান তুলে ধরে নিজের নাম কলঙ্কমুক্ত করার চেষ্টা করতে পারেন।

তৃতীয়ত, ৭৯ বছর বয়সের রাজনীতিক শেখ হাসিনা ভারতে দীর্ঘদিন অবস্থানের পরিবর্তে দেশে ফিরে দেশেই মৃত্যুবরণ করতে চান।

বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই দলকে প্রস্তুত করা এবং বর্তমান সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান।

কুগেলম্যান নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে নিশ্চিতভাবে বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করা হবে। এটা তিনি জানেন। তবে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে দেশে অবস্থান করলেও দল এবং কর্মীরা সক্রিয় থাকবে। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে চাপে রাখা যেতে পারে।

উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছে। তাকে হস্তান্তর করা হলে সরকার তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত