সময়টা ২০১৭ সাল। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্লেয়ার্স ড্রাফটে খুলনা টাইটানস দলে নিল জোফ্রা আর্চার নামের ক্যারিবিয়ান এক পেসারকে। ইংলিশ কাউন্টিতে তখন মাত্রই খেলতে শুরু করেছেন ইংরেজ বাবা আর বার্বাডিয়ান মায়ের সন্তান আর্চার। তবে ব্রিটিশ পাসপোর্ট তখনো হয়নি, ইংল্যান্ড দলে খেলা তো দূরের স্বপ্ন। বছর দুয়েক পর সেই আর্চার ইংল্যান্ডকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতানোয় রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিপিএলে অনেক বিদেশি ক্রিকেটারই তাদের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সময়ে খেলেছেন, যারা পরবর্তী সময়ে দেশের হয়ে এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে হয়েছেন বড় তারকা। এবারের আসরেও আছেন তেমনি সম্ভাবনাময় কয়েকজন ভিনদেশি ক্রিকেটার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয়নি কিংবা অল্প সুযোগ পেয়েছেন বলে হয়তো তাদের পরিচিতি এখনো খুব একটা ছড়ায়নি। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তারা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন নিজেদের এবং বিপিএলটা হতে পারে তাদেরও বড় হয়ে ওঠার মঞ্চ।
সিডনি থান্ডার এবং অ্যালেক্স, এই তিনটা শব্দ মিলে গেলেই ক্রিকেটের পাঁড়ভক্তরা হয়তো মনে করবেন ইংরেজ ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স হেলসের কথাই। দুর্দান্ত ঢাকায় যোগ দিয়ে এই ক্রিকেটারও খেলেন সিডনি থান্ডারে, নামের প্রথমাংশে অ্যালেক্স তবে শেষে হেলস নয় রস। অফ-ব্রেক বোলিং আর লোয়ার-মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করেন রস। বছর বত্রিশের রস ২০১৬ সালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা তরুণ ক্রিকেটারের পুরস্কার জিতেছিলেন। একটা বছর ঘরোয়া ওয়ানডে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ছিল রসের, প্রথমজন ছিলেন ট্র্যাভিস হেড। বিশ্বকাপ ফাইনাল, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সেঞ্চুরি করা হেড পৌঁছে গেছেন অন্য উচ্চতায়। রসের এখনো অস্ট্রেলিয়া দলের ধারেকাছেও আসা হয়নি। তবে টি-টোয়েন্টিতে ১২৬ স্ট্রাইক-রেট আর ২৭ গড় নিয়ে জাতীয় দলে না হলেও বিপিএলে চলে এসেছেন ‘সুইপোলজিস্ট’, বিগ ব্যাশের ধারাভাষ্যকাররা তাকে এই নামে ডাকেন। এলপিএলে দাম্বুলা অরার হয়ে খেলেছেন, সিপিএলে জ্যামাইলা টালাওয়াহদের হয়ে। ঢাকার হয়ে বিপিএল খেলতে এসে কাল অনুশীলনের পর এই অস্ট্রেলিয়ান জানালেন, ‘সবকিছু খুব দ্রুতই হয়ে গেল, নিজেকে শেষ পর্যন্ত এই দলের অংশ হিসেবে দেখতে পেয়ে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আগের রাতে দলের খেলা দেখেছি টিভিতে।’ এলপিএলের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে দেবে বলে মনে করছেন রস, ‘গত বছর এলপিএলে খেলেছি। আজ (রবিবার) বেশ খানিকটা সময় অনুশীলন করলাম, মনে হচ্ছে সেই অভিজ্ঞতাটা কাজে দেবে। দ্রুতই আমাকে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাটা সাহায্য করবে।’ এখানে সুইপ শট খেলে রান করতে হবে বলেই মত ‘সুইপোলজিস্ট’-এর, ‘এখানে সুইপশটটা খুব কাজে দেবে। সেদিন টিভিতে খেলে দেখে এটাই মনে হয়েছে। এ-রকম লো-স্কোরিং উইকেটে সুইপ আর রিভার্স সুইপ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এবার বিগব্যাশেও কিছু ম্যাচ খারাপ উইকেটে হয়েছে। বল ঘুরেছে আর উইকেট একটু ধীরগতির ছিল। যতটা ভিন্ন মনে করেছি ততটা নয় আসলে।’
আরেক অস্ট্রেলিয়ান বেন কাটিং এসেছেন সিলেট স্ট্রাইকার্সে। এই অলরাউন্ডার অস্ট্রেলিয়া দলে ৭টা টি-টোয়েন্টি খেলেছেন, তবে সবশেষ ২০১৭ সালে। এরপর থেকেই নানান দেশে ঘুরছেন টি-টোয়েন্টির ফেরিওয়ালা হয়ে। ঢাকায় আসার আগে ছিলেন আবুধাবি টি-১০ লিগে। অনুশীলনে বড় বড় ছক্কা মারার গল্প করলেও প্রথম ম্যাচে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ব্যাটিংই পাননি কাটিং। রসকে ঢাকার ব্যপারে পরামর্শ দিয়েছেন, এখানে নাকি বেশ ভালো রেস্তোরাঁ আছে স্টেক খাবার! পড়ন্ত বেলার বছর ৩৭ এর কাটিং হতে পারেন কার্যকর। ডানহাতি ফাস্ট মিডিয়াম বোলিংয়ে বৈচিত্র্য আছে। দুনিয়ার বহু লিগেই খেলে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, এখানে টিকে থাকার মন্ত্র একটাই পারফরম্যান্স। ভালো পারফরম্যান্স মানেই অন্য কোথাও ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা। যেমনটা হয়েছে বেনি হাওয়েলের। ২০১৬ সালে খুলনার হয়েই বিপিএলে খেলেছিলেন, সেটাই তার জীবনের প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলা। ইংরেজ-অস্ট্রেলিয়ান বাবা-মা, জন্ম ফ্রান্সে, স্ত্রী আর্জেন্টাইন-আমেরিকান, বেসবল দেখতে গিয়ে ক্রিকেটের ব্যাটিং-বোলিং বদল; বেনি হাওয়েলের এসব গল্প হয়তো অজানাই থেকে যেত যদি না বাংলাদেশে ভালো মৌসুম কাটত তার। ২০২১-২২ মৌসুমের বিপিএলে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে তার দেড়শর বেশি স্ট্রাইক রেটে লোয়ার অর্ডারে ২০৭ রান আর ৪ উইকেট; চট্টগ্রামকে তুলে দিয়েছিল প্লে-অফে। হাওয়েল এখন যাযাবর ক্রিকেটার হয়ে আইপিএল সিপিএলসহ অনেক দেশেই খেলছেন, বিপিএলে পুরোটা মৌসুম এবার সিলেটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ।
ঢাকার হয়ে প্রথম ম্যাচে খেলে মাত্র ৫ রান করেই আউট লাসিথ ক্রুসপুলে। কিছুদিন আগেই ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটা খেলেছেন এই ডানহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। এলপিএলে ৮ ম্যাচে ২৩২ রান করা ক্রুসপুলে হতে পারেন দুর্দান্ত ঢাকা’র চমক। চেনা অচেনা একঝাঁক শ্রীলঙ্কানের ভিড়ে ক্রুসপুলে কি পারবেন উইল জ্যাকসের মতো স্মরণীয় বিপিএল দিয়ে ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে?
এছাড়াও পাকিস্তানের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় ভালো করা বাঁহাতি পেসার মোহাম্মদ ইমরান ফরচুন বরিশালের হয়ে প্রথম ম্যাচটায় ভালোই বল করেছেন। ৪১ ম্যাচে ৫২ উইকেট তার টি-টোয়েন্টিতে, ম্যাচে ৬ উইকেটও আছে। বিপিএলের মান-এ ইমরান বেশ শক্ত বোলারই হবেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে।
একসঙ্গে একাধিক লিগ চলায় বাংলাদেশ মূলত সেই সব ক্রিকেটারদেরই গন্তব্য যাদের অন্য কোথাও দল জোটেনি। তবে বিপিএলের একটা দুর্দান্ত মৌসুম বদলে দিতে পারে অনেক কিছুই। খুলনা টাইটানসের কোচ মাহেলা জয়াবর্ধনেই প্রথমে দেখেছিলেন আর্চারকে, নিয়েছিলেন বিপিএলে। পরের গল্পটা সবারই জানা।