কিছু পত্রিকা, একটা বাক্স ও এক টুকরো বিশ্বাস

বর্তমান সময়ে যখন একে অপরের মধ্যে বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন একজন পত্রিকার হকার মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাইছেন। আর সে বিশ্বাস থেকে তিনি রাস্তার ফুটপাতের একটি কোণে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা দিয়ে টেবিলে সাজিয়ে প্রতিদিন ভোরে একটি বাক্স রেখে দেন সেই টেবিলের ওপর। এরপর আর সারাবেলা সেখানে কেউ থাকেন না। চলতি পথে যাদের সংবাদপত্র কেনার প্রয়োজন তারা পত্রিকার দাম ওই বাক্সে রেখে তার কাঙ্ক্ষিত পত্রিকা কিনে নেন।

এধরনের ঘটনা ঢাকায় খুব একটা দেখা যায় না। তবে এমনভাবে ওই পত্রিকার স্টলটি চলছে প্রায় ১৮ বছর ধরে। রাজধানীর পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতাল থেকে পান্থপথ মোড়ে যাওয়ার পথে একটু এগোলেই দেখা মেলে ওই স্টলটির। আর এই বিশ্বাসের পেছনে কারিগর রয়েছেন একজন পত্রিকার হকার। তার নাম সাহেদ আহম্মদ।

আজ মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো স্টলটি জাতীয় দৈনিক দিয়ে সাজানো। পাশের একটি কাচের বাক্স। সেখানে কিছু টাকা।

কথা হয় স্টল-লাগোয়া সাস্লিস ফুড বেকারি ও সুইটস দোকানের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ খবিরের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০/১২ বছর ধরে এখানে এভাবেই চলছে স্টলটি। বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে স্টলটি ছেড়ে রেখেছেন সাহেদ আহম্মদ। তিনি সকালে ওই এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে পত্রিকা বিলিয়ে কিছু পত্রিকা এখানে রেখে চলে যান। ওই স্টলটির পাশেরই এক চা-সিগারেট বিক্রেতা আনোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি এখানে প্রায় ১০/১২ বছর ধরে চা-সিগারেট বিক্রি করেন। তখন থেকেই দেখছেন এটা এখানে। আসলে সাহেদ আহম্মদ ভাই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এটা চালাচ্ছে।

আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে আসে সাহেদের বড় ভাই মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, তার ছোট ভাই এটা চালায়। আমরা এই এলাকায় ২৫/৩০ বছর ধরে এ কাজ করছি। সবাই তাদের চেনে। এখানে এই বাক্স ও পত্রিকা থাকে। যার প্রয়োজন তিনি কিনে টাকা বাক্সে রেখে যান। বিশ্বাসের প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছু লোক বা টোকাই মাঝে মধ্যে ঝামেলা করে। টাকা নিয়ে যায়। তবে তাদের কপালতো নিতে পারে না। কিন্তু যারা পত্রিকা কেনেন তারা সাধারণত টাকা দিয়েই কেনেন। ভাংতি না থাকলে পাশে থেকে ভাংতি করে মানুষ পত্রিকা কিনে নেন।

মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কথা হয় সাহেদ আহম্মদের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার বাবা হকারি করেছেন। ছোটবেলা পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য তিনিও হকারি শুরু করেন। এরপর থেকে ভালোবাসা জন্মে। এখনও করে চলেছেন। তবে এই টাকায় সংসার চালানো অনেক কঠিন। তাই তিনি সকালে পত্রিকা বিলি করে মিরপুরে বাসায় চলে যান। পরে বিকালে এসে জুতা ও রেডিমেট গামের্ন্টের পণ্য বিক্রির ব্যবসা করেন। তাই সকালে টেবিলটি গুছিয়ে কাচের বাক্স রেখে যান, যা বিক্রি হয়।

প্রতিদিন এখানে ৫০ থেকে ৬০টি পত্রিকা বিক্রি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি সব সময় চেয়েছেন হালাল রোজগার খেতে। তাই এভাবে কষ্ট হলেও তিনি পথ থেকে বিচ্যুত হননি। 

ক্ষতি বা চুরি হয়ে যায় কি-না প্রশ্ন করলে সাহেদ বলেন, এটা সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ওপর দেই। তবে আশপাশে লোকজন সবাই তাকে চেনেন। তারাও খেয়াল রাখেন। তবে মাঝে মাঝে টোকাইরা টাকা নিয়ে যায় অগোচরে। কিছু লোক হয়তো টাকাও দেয় না। তবে কিসমততো নিতে পারবেন না। এতটুকু তিনি মেনে নিয়েছেন।