রাজধানীর মহাখালীর ৫০০ শয্যার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে ' সূচনায় পড়লে ধরা ক্যানসার রোগ যায় যে সারা' স্লোগান লেখা পোস্টার। তবে পোস্টারের সূচনায় চিকিৎসার কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে এই হাসপাতালে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও চিকিৎসা পান না ক্যান্সার আক্রান্তরা।
হাসপাতালে ভর্তি হতে আসা রোগী ও তার স্বজনরা লাইনে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে নানা অনিয়মের শিকার হয়ে দুর্ভোগে পড়েন। ক্যানসার চিকিৎসায় দেশের সর্ববৃহৎ এ চিকিৎসাকেন্দ্রটি ৩০০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যার হলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার হলেও বাস্তবে শয্যার প্রয়োজন ৫-৭ গুণ বেশি। প্রয়োজন অনুযায়ী ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই, ১২টার পর রিপোর্ট দেখা হয় না, ফার্মেসিতে ওষুধ নেই, দালালদের দৌরাত্ম্য।
দেশের ৬৪ জেলা থেকে ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে এসে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়েন তারা। এই হাসপাতালে ভর্তি হতে এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষায় থাকতে হয় রোগীদের। এতে করে আক্রান্ত রোগীর প্রাথমিক স্তর থেকে পুরো শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি অনেক দেরিতে গিয়ে যারা শরীরে ক্যানসারের উপস্থিতি বুঝতে পারেন তারা চিকিৎসা না পেয়েই মারা যান।
এই হাসপাতালে ভর্তি হতে আসা রোগীদের অভিযোগ, নানা ভোগান্তির পর ২-৩ দিন চেষ্টার পর টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসক দেখাতে পারলেও চিকিৎসার নিশ্চয়তা নেই রোগীদের। চিকিৎসকরা প্রথমেই তাদের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা দেন যা করাতেই ৭-১০ দিন লেগে যায়। রিপোর্ট নিয়ে পুনরায় দেখাতে গেলে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসকরা যখন ভর্তির পরামর্শ দেন তখন তারা হাসপাতালে সিট সংকটের কারণে ভর্তি হতে পারেন না। রোগীরা পরীক্ষা নিরীক্ষা ডাক্তার ও সিটের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্যানসার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যানসার হাসপাতালের একটি সিট পেতে হলে ১ মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এখানে যারা চিকিৎসা নিতে ভর্তি হন তাদের গড়ে এক-দেড় মাস হাসপাতালে থাকতে হয়, ফলে সিট খালি হয় না। কিন্ত প্রতিদিন এই হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন ৫০০-৬০০ মানুষ যারা সিট পেতে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে কথা হয় গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আগত সুমনা বেগমের সঙ্গে। সুমনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যানসার আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে এসেছি। গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে একটা শয্যা পাচ্ছি না। বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য নেই।
পাশে দাঁড়ানো ফিরোজ মিয়া নামের আরেক ক্যানসার আক্রান্ত রোগী অভিযোগ করেন, এই হাসপাতালে দালালদের টাকা না দিলে ভর্তি হওয়া যায় না। আমার পরে যারা আসছে তারাও ভর্তি হয়ে গেছেন।
ক্যানসার হাসপাতালের সর্বত্র ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। হাসপাতালের পরিবেশ এতই নোংরা যে অপারেশনের রোগীদের ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। উন্নত বিশ্বে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের অপারেশনের পর স্যানিটাইজড কক্ষে রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও এই হাসপাতালে স্যানিটাইজ তো দূরের কথা উল্টো নোংরা পরিবেশে হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। হাসপাতালের বিছানায় তেলাপোকা থাকে। হাসপাতালের অধিকাংশ বাথরুম ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে থাকে, কিন্তু পরিষ্কার করা হয় না। ৩০০ শয্যা থেকে এই হাসপাতাল ৫০০ শয্যার করা হলেও কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে ৫০০ বেডের হাসপাতালে প্রয়োজনের অর্ধেক জনবল দিয়ে কাজ চালাতে হয়। এমনকি এই হাসপাতালে স্ট্রেচার, হুইল চেয়ারেরও সংকট রয়েছে। বহিরাগতরা হাসপাতালে প্রশাসনের নাকের ডগায় স্ট্রেচার, হুইল চেয়ার রোগীদের টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেয়।
নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি হওয়া রোগীদের বিনা মূল্যে হাসপাতাল থেকে ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও গত ২ মাস ধরে মাঝেমধ্যেই ওষুধ স্বল্পতার কারণে ফার্মেসি বন্ধ থাকে। যেদিন গুলোতে ওষুধ দেওয়া হয় সেদিন ও নামমাত্র ওষুধ দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্টাফ জানান, প্রায় ৬ মাস আগে ওষুধ শেষ হয়ে যায় কিন্তু নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে তা কেনা হচ্ছে না।
ক্যানসার হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডাক্তার আবু হেনা মোস্তাফা জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে একজন রোগীকে অপেক্ষায় থাকতে হয় এটা সত্য কথা। কিন্তু সময়টা অতটা বেশি নয়। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটা চক্র গড়ে উঠেছে আমরা তা নির্মূল করার চেষ্টা করছি। হাসপাতাল থেকে রোগীদের অনেক ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে যা দূর করতে পারলে ক্যানসার চিকিৎসায় আমরা আরও এগিয়ে যাব।