‘ঢাকা গেট’ শহরের প্রবেশ দ্বার নাকি প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন?

ভারতের নয়াদিল্লি শহরের মাঝখানে অবস্থিত ‘দিল্লি গেট’। এটাকে ইন্ডিয়া মেমোরিয়াল গেটও বলা হয়। এটি একটি যুদ্ধের স্মারক এবং ভারতের একটি স্থাপত্যের বিস্ময়ের প্রতীকও। ফ্রান্সের প্যারিসে প্যারিস গেট নামে বাংলাদেশিদের কাছে খ্যাত ‘আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ’-ও তাদের যুদ্ধের স্মারক ও স্থাপত্যর প্রতীক।

এ ধরনের স্থাপত্যগুলো সে দেশের বা শহরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বহন করে। ঠিক তেমনি ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকা শহরে নানা স্থাপনার মধ্যে ‘ঢাকা গেট’-ও এ শহরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বহন করবে। পর্যটক বা ভিনদেশিরা বা শহরের মানুষ ও নতুন প্রজন্ম যখন শহরে প্রবেশ করে তখন তারা ওই শহরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চায় এবং এই ঢাকা ফটক তার কিছুটা হলেও তৃষ্ণা মেটাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনশ্রুতি রয়েছে যে এই ঢাকা গেট হচ্ছে ঢাকায় প্রবেশ গেট। ঢাকার সীমানা নির্ধারণ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এই গেট নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডয়’সের সময়ে গেট নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এই ‘ঢাকা ফটক’ শহরের একটি প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ, নির্দশন ও ঐতিহ্য বলে মনে করেন তারা।

দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে ও অবহেলায় থাকলেও সম্প্রতি সরকার এটি পুনরায় উদ্ধারের কাজ করেন এবং নতুন করে এর সংস্কার করেন। এই ঢাকা ফটক আজ বুধবার উদ্বোধন হচ্ছে।

আজ বিকেল ৪টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র ফজলে নুর তাপস গেটটি উদ্বোধন করবেন। সিটি করপোরেশন প্রায় ৭০ লাখ টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরে নতুন করে এর সংস্কার করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দোয়েল চত্বর পেরিয়ে টিএসসি যেতে চোখে পড়বে মোগল আমলের নান্দনিক স্থাপত্য এই ‘ঢাকা গেট’।

ঢাকায় কয়েকজন শিক্ষার্থী, চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলা হয় এই ঢাকা গেট সম্পর্কে তারা কী জানেন। তাদের সকলের উত্তর প্রায় একই রকম ছিল। তারা বলেন, তারা শুনেছেন এটা ঢাকার প্রবেশ পথ ছিল। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু জানেন না।

এশিয়াটিক সোসাইটির ঢাকা কোষ এবং অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে ‘ঢাকা গেট’ নির্মাণ করা হয়। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার সুবেদার হিসেবে পাঠানো হয় মীর জুমলা ঢাকার সীমানা নির্ধারণ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এই গেট নির্মাণ করেছিল।

তবে ‘ঢাকা গেট বা ফটক’ সংরক্ষণের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষক স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনশ্রুতি আছে যে এখানে মীর জুমলা গেট তৈরির বিষয়টি। তবে এর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। এখন যে অবয়বটি পূর্ণ সংস্কার করছেন তা ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডয়’সের সময়ে গেট নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

তিনি আরো বলেন, এখন এই গেটের তিনটি অংশ দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু শুরুতে এমনটি ছিল না। শুরুতে সড়কটি এক লেনের হওয়ায় গেটের দুটি অংশ ছিল। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে সড়কটি যখন দুই লেন করা হয়, তখন গেটের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়। তিন নেতার মাজারের অংশটি নতুন করে তৈরি করা হয়। সড়ক বিভাজকের অংশটি সেই ভাঙা অংশের একটি অংশ।

অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ আরো বলেন, মীর জুমলার কামান একসময় সদরঘাটে ছিল। পরে সেটা গুলিস্তানের ওসমানী উদ্যানে এনে রাখা হয়। সেখান থেকে কামানটি ঢাকা গেইটে এনে বসানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরেণ্য লেখক ও গবেষক মুনতাসীর মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পর্যটকরা বা নতুন প্রজন্ম সবাই যখন কোন শহরে আসেন তখন তারা ওই শহরের কালচার বা ঐতিহ্য দেখেন। কিন্তু আমরা এখানে এগুলো ধ্বংস করে ফেলছি। ঢাকা দক্ষিণের মেয়রকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ঢাকাকে ছয়টি পর্যটক রুটে ভাগ করা হয়েছে। লালবাগ কেল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে। এই ঢাকা গেট বা ফটক উদ্বোধনের মাধ্যমে এটা শুরু হলো। এটা একটা পাবলিক স্পেস হলো। এখানে বিভিন্ন লোকজন বসবে ও দেখবে। ঢাকায় এরকম আরো যে ঐতিহ্য আছে সেগুলোকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য এবং দায়িত্ব। জনএলাকা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ এসে বসবে ও দেখবে। এটা মানুষকে একটা বার্তা দিল যে আপনারা আসেন, এগুলো রক্ষাকরি।