রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সরকারি পর্যায়ে দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার খরচ বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু যন্ত্রপাতি না থাকায় কিংবা বিকল থাকায় সঠিক সময়ে, সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি এই হাসপাতালের ওপর নির্ভর করা রোগীরা। ফলে চিকিৎসার মাঝপথে বা চিকিৎসা শুরুর আগেই অনেক রোগী মারা যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যানসার হাসপাতালের রেডিওথেরাপির ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটি পুরোপুরি বিকল। বাকি দুটিও কখনো কখনো বিকল হয়ে পড়ে। একেকটি মেশিনের দাম ২৫-৩০ কোটি টাকা করে। ক্যানসার নির্ণয়ের অন্যতম যন্ত্র এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) বিকল হয়ে পড়ে আছে। নেই এক্স-রে (রঞ্জন রশ্মি), সিটিস্ক্যান মেশিনও। যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় এখানে বায়োপসিসহ ক্যানসার নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পরীক্ষা করা যায় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিকটবর্তী এই হাসপাতালটির সেবার সুযোগ ও মান দিনে দিনে ধসে যাচ্ছে।
সরকারি এই ক্যানসার হাসপাতালের যন্ত্রপাতি নষ্টের উদাহরণ আরও আছে। দেড় দশক আগে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য আটটি আর্টিফিশিয়াল রেসপিরেটরি ভেন্টিলেটর (এআরভি) কেনা হলেও তা এক দিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিটি এআরভি ৭০ লাখ টাকা করে কেনা হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নিজামুল হকের ব্যক্তিগত সহকারী রাজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ আটটি এআরভি গত বছর অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের রেডিওথেরাপির ছয়টি যন্ত্রের সব কটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এর মধ্যে চারটি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটরের (লিন্যাক) মধ্যে দুটি এবং বাকি দুটি কোবাল্ট থেরাপি যন্ত্রের দুটিকেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে মাত্র দুটি লিন্যাক দিয়ে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মসে সব কটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র বিকল জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসাসেবা বন্ধ ঘোষণা করেছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে দুটি লিন্যাক ঠিক করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী রেডিওথেরাপি নিতে আসেন। কিন্তু দুটি মেশিন দিয়ে মাত্র ২০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী দেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩৩টি আছে। এই ৩৩ কেন্দ্রের মধ্যে ১৯টিতে রেডিওথেরাপি মেশিন আছে।
ওয়ার্ল্ড ক্যানসার সোসাইটি, বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ হুমায়ূন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বলা হয়ে থাকে সরকারের টাকার অভাব নেই। তাহলে যন্ত্র কিনতে সমস্যা কোথায়? স্বাস্থ্য খাতে সরকারি সেবা কমিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।’
জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে এক দফা বা সাইকেল রেডিওথেরাপির খরচ মাত্র ২০০ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে খরচ হয় ৫-৭ হাজার টাকা কিংবা আরও বেশি। ১০ হাজার টাকা খরচে যে চিকিৎসা পাওয়া যায়, বেসরকারি হাসপাতালে একই চিকিৎসা পেতে খরচ হয় লাখ টাকার বেশি।
গত সপ্তাহের সাত দিন জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে ঘুরে এই প্রতিবেদক রেডিওথেরাপি দিতে আসা ২০-২৫ জন রোগীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের কেউই স্বাভাবিক উপায়ে সিরিয়াল পাননি। তারা এক, দুই মাস অপেক্ষা করেও সিরিয়াল পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর দালালদের টাকা দিয়ে রেডিওথেরাপি শুরু করতে পেরেছেন।
রোগীরা জানান, প্রথমে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে তিন-চার দিনের চেষ্টায় রেডিওথেরাপির জন্য রেজিস্ট্রেশন কার্ড করতে হয়। এখানেও অনেকে দালাল ধরেন। কার্ড পাওয়ার পর তাদের জানানো হয়, আপাতত শিডিউল নেই। ছয়-সাত মাস পরের একটা তারিখ দেওয়া হয়। ‘ভাগ্য ভালো’ হলে কেউ কেউ দুই-তিন মাস পরের তারিখ পেতে পারেন। কিন্তু তারিখ পেলেও থেরাপি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ রোগীরা জানান, রেজিস্ট্রেশন কার্ড পাওয়ার পর যে তারিখ দেওয়া হয়, সেই তারিখে গেলে আরেকটি তারিখ পড়ে। এভাবে থেরাপির তারিখ পিছিয়ে যেতে থাকে। যখন থেরাপি শুরু করা সম্ভব হয়, তত দিনে ৬ থেকে ৭ মাস পেরিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, দালালকে ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা দিলে দ্রুত থেরাপি নিতে পারে রোগীরা।
ক্যানসার হাসপাতালের রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রকিব উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেডিওথেরাপির জন্য দুটি নতুন মেশিন এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে কেনা হবে। আমাদের হাসপাতাল যেহেতু ক্যানসার চিকিৎসায় একমাত্র পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, তাই এখানে রোগীদের ভিড় অনেক বেশি। রেডিওথেরাপির জন্য রোগীদের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিগত বছরেও রেডিওথেরাপির দুটি নতুন মেশিন কেনার চেষ্টা করেও নানা কারণে ব্যর্থ হই। এ ছাড়া নতুন বছরে এমআরআই মেশিন কেনা আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় সবার ওপরে থাকবে।’
খুলনার ডেভিড কোম্পানিপাড়ার বাসিন্দা তাহমিনা আমিন ৭ জানুয়ারি রেডিওথেরাপি নিতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন। তিনি জানান,আমাকে বলা হয়, পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হবে। দুদিন ঘুরে একজনকে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পর ১৭ জানুয়ারি সিরিয়াল পেয়ে যাই।
একই জায়গায় কথা হয় নোয়াখালী থেকে আসা আইয়ুব আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এক বছর আগে তার ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর থেকে চিকিৎসা চলছে। ছেলে ওমানে থাকলেও চিকিৎসা করাতে করাতে তার হতদরিদ্র অবস্থা হয়েছে।
চিকিৎসকের পরামর্শে আইয়ুব আলীও এসেছেন রেডিওথেরাপি নিতে। ঢাকার মিরপুরে আত্মীয়ের বাসায় থেকে এক মাস ধরে হাসপাতালে এসে ঘুরছেন। কিন্তু থেরাপি নিতে পারছেন না।