আমরাও কিন্তু দেশের জন্যই খেলি

২০১৮ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে প্রো-বক্সিংয়ের রিংয়ে নেমেছিলেন সুরো কৃষ্ণ চাকমা। এরপর খেলেছেন সাতটি ম্যাচ। এখন পর্যন্ত হারেননি এক ম্যাচও। ২৯ বছর বয়সী বক্সার পেশাদার বক্সিংকে দেশে জনপ্রিয় করে তুলতে নিজেকে নিয়ে যেতে চান অন্য উচ্চতায়। থাইল্যান্ড থেকে ফোনে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর কাছে বলেছেন অনেক কথা

দুদিন আগেই ক্যারিয়ারের সপ্তম জয় পেলেন। নিশ্চয় খুব খুশি?

সুরো কৃষ্ণ চাকমা : একেকটা জয় আমাকে এগিয়ে যেতে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। বুধবার যে থাই বক্সারের বিপক্ষে খেলেছি, বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে তিনি আমার চেয়ে ঢের এগিয়ে। ১৪টি পেশাদার ম্যাচ খেলেছেন তিনি। সব মিলিয়ে সহজ ছিল না আমার জন্য। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল, সেরাটা দিয়েছি। তাই জয় পেয়েছি।

পেশাদার বক্সিং তো সেভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি দেশে। অ্যামেচার বক্সিং ছেড়ে কেন প্রো-বক্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাইছেন?

সুরো কৃষ্ণ : আমি লাইট ওয়েট শ্রেণিতে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০১৮ সালে ভারতের হরিয়ানের দুটি ম্যাচ খেলি। তবে এর তিন বছর আগেই প্রো-বক্সিং সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলাম আলী জ্যাকো নামে একজন প্রমোটারের মাধ্যমে। তখন তিনি আমাকে ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে ট্রেনিং করিয়েছিলেন। সেখানে গিয়েই বুঝতে পারি, বক্সিংয়ের আসল জগৎটা হলো প্রো-বক্সিং। আমি সেই ২০০৭ সালে বিকেএসপির ছাত্র থাকাবস্থায় অ্যামেচার বক্সিংয়ে যুক্ত হই। এরপর দীর্ঘদিন দেশের হয়ে অনেক খেলায় অংশ নিয়েছি। অ্যামেচার বক্সিংয়ের সঙ্গে পেশাদার বক্সিংয়ের অনেক পার্থক্য। কোনো একটা টুর্নামেন্ট বা গেমসকে সামনে রেখে দুই-তিন মাসের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা অ্যামেচার বক্সিংয়ে অংশ নিতাম। তবে পেশাদার বক্সিংয়ে সারা বছরই আপনাকে তৈরি থাকতে হয়। কারণ দেখা যায় প্রতি মাসেই এক-দুইটা ম্যাচ থাকে। নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যক্তিগত ট্রেইনার যেমন প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি নিতে হয় সঠিক নিউট্রিশন। এর জন্য অনেক খরচ করতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে যে ম্যাচগুলো খেলছি, তা থেকে খুব বেশি টাকা পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে র‌্যাঙ্কিং যখন ভালো হবে, বড় বড় প্রতিপক্ষের সঙ্গে যখন খেলব এবং জিতব, তখন টাকা উপার্জনের সুযোগ বাড়বে। আমার লক্ষ্য লাইট ওয়েট ক্যাটাগরিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া। নিজেকে সেভাবে যদি প্রস্তুত করতে পারি, ভালো সহযোগিতা যদি দেশ থেকে পাই, তবে এটা অসম্ভব কিছু নয়। মনে রাখতে হবে, আমরাও কিন্তু দেশের জন্যই খেলি। তবে এখানে ব্যক্তিগতভাবে অংশ নিতে হয়।

অর্থাৎ খেলা চালিয়ে নিতে স্পন্সর ভীষণ জরুরি?

সুরো কৃষ্ণ : স্পন্সর ছাড়া আসলে পেশাদার বক্সিং চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আমার প্রমোটার এক্সেম ম্যানেজমেন্টের কর্ণধার আদনান হারুন ভাই নানা জায়গায় খেলার সুযোগ করে দিচ্ছেন ঠিক। কিছু আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতাও করছেন। তবে তাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। খেলাটার সম্ভাবনা বুঝতে পেরে গত বছর বিকাশ আমাকে স্পন্সর করেছে। তারা নানাভাবে আমাকে সহায়তা করেছে। তবে আহামরি কিছু পাইনি। আসলে বৈশ্বিক দিক চিন্তা করলে আপনার অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিগত ট্রেনার যেমন লাগে, আপনাকে অনেক ভালো পুষ্টির প্রয়োজন হয়। সেগুলো নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন অনেক টাকা। বিকাশ গত বছর সহায়তা করেছিল বলে নিয়মিত খেলতে পেরেছিলাম। বিকাশের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে আরও অনেকেই পেশাদার বক্সিংয়ে আগ্রহী হবে। আমার ওয়েট ক্যাটাগরিতে এখন বাংলাদেশের ছয়জন পেশাদার বক্সিং করছি। এই সংখ্যাটা বাড়বে যদি স্পন্সর পাওয়া যায়। আসলে শুরুতে এই সহায়তাটুকু পেলে খেলাটা ধীরে ধীরে দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

আপনি বললেন, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নের কথা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সেটা কি সম্ভব?

সুরো কৃষ্ণ : অবশ্যই সম্ভব। দেখুন আমার বয়স এখন ২৯ বছর। এখন আর অ্যামেচার বক্সিং খেলব না। পেশাদার বক্সিংটাই আরও বহু বছর খেলতে পারব। যদি ভালোমানের ট্রেনারের অধীনে কাজ করতে পারি, পুষ্টিবিদের সহায়তা যদি পাই এবং অনেক বেশি বেশি ম্যাচ খেলতে পারি, তবে আমার র‌্যাঙ্কিং বাড়বে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওয়েট ক্যাটাগরিও হয়তো পরিবর্তন হবে। এভাবে এগোতে থাকলে একটা সময় বিশে^র সেরাদের সঙ্গে খেলার সুযোগ চলে আসবে। এভাবেই আসলে শিখরে পৌঁছাতে হয়।

সে ক্ষেত্রে তো আপনাকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে?

সুরো কৃষ্ণ : আমার ওজন শ্রেণিতে দুনিয়ার প্রায় ২ হাজার ৬০০ পেশাদার বক্সার আছে। আমি খুব কম সময়ের মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে ৮০০-এর ঘরে চলে এসেছি। সাত ম্যাচের ছয়টিই হারিয়েছি বিদেশি প্রতিপক্ষকে। এর মধ্যে ভারত, নেপাল ও থাইল্যান্ডের প্রতিপক্ষ আছে। যারা বেশিরভাগই র‌্যাঙ্কিংয়ে আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে। সুতরাং এভাবে এগোতে পারলে বিশ্বসেরা হওয়া সম্ভব। তবে এর আগে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেতে হবে। যেটা ছাড়া আসলে বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। যেহেতু আমরা দেশের জন্যই লড়াই করি, সেহেতু সরকারের কাছেও অনুরোধ থাকবে সহায়তা করার।

সামনের মাসে আপনার ভারতীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলার কথা শুনেছি...

সুরো কৃষ্ণ : আমি এখনো থাইল্যান্ডে আছি। কোনো ম্যাচের সূচি ঠিক হলে আমি সাধারণত থাইল্যান্ডে একটি ট্রেনিং একাডেমিতে অনুশীলন করি। দেশে ফিরব ২৯ জানুয়ারি। এখনো সামনের ম্যাচের সূচি ঠিক হয়নি। তবে একজন ভারতীয় বক্সারের সঙ্গে আমার প্রমোটারের কথা চলছে।