বিদেশিরা পারেন দেশিরা কেন পারেন না

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড সফরে প্রায় মাস দেড়েক কাটিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন বাবর আজম। রাতটা ঘুমিয়ে পরদিন দুপুরেই খেলেছেন ম্যাচ জেতানো ৫৬* রানের ইনিংস। এক বছরেরও বেশি সময় আগে জাতীয় দলের হয়ে সবশেষ টি-টোয়েন্টি খেলা আভিস্কা ফার্নান্দো বিপিএলের এবারের আসরের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক, কাল ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে করেছেন ৫০ বলে ৯১*। সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি এখন পর্যন্ত ৬ উইকেট নেওয়া কার্টিস ক্যাম্ফার, কাল ২০ রানে এই আইরিশ অলরাউন্ডার নিয়েছেন ৪ উইকেট। শুধু আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক এখন পর্যন্ত মুশফিকুর রহিম, ৪ ম্যাচের ভেতর যারা হেরেছে ৩টিতেই। মুশফিকের স্ট্রাইক-রেট ১৩৬.৩৬। ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের পর এই সংস্করণ থেকে অবসরে যাওয়া মুশফিকের ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশের হয়ে সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি দলে নিয়মিত খেলা কোনো ব্যাটসম্যান। বিপিএলের দশম আসরের ১১টা ম্যাচ মাঠে গড়ানোর পর তাই উইকেট নয়, রান না হওয়ার পেছনে আঙুল উঠছে দেশীয় ক্রিকেটারদের সামর্থ্যরে দিকেই।

ফরচুন বরিশাল-চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স ম্যাচের দুই দলের একাদশের দিকে তাকালে আর ফলের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যাবে ঘাটতিটা কোথায়। বাংলাদেশ সবশেষ টি-টোয়েন্টি খেলেছে নিউজিল্যান্ড সফরে, বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা কোনো ক্রিকেটারই নেই চট্টগ্রাম দলে। উল্টোদিকে বরিশাল দলে আছেন সেই সফরের দলে থাকা সৌম্য সরকার ও মেহেদী হাসান মিরাজ। এছাড়া আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়ানো তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে টি-টোয়েন্টি দলের বাইরে থাকা মাহমুদউল্লাহও আছেন। দিন শেষে চট্টগ্রামকে জিতিয়েছেন শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান আভিস্কা  ফার্নান্দো (৫০ বলে ৯১*) আর আইরিশ অলরাউন্ডার কার্টিস ক্যাম্ফার (৩-০-২০-৪)।

চট্টগ্রামের ৪ উইকেটে করা ১৯৩ রানের জবাবে বরিশাল যেভাবে ব্যাট করেছে তাতে পরিণতি এমনটাই হওয়ার কথা। ১২০ বলের খেলায় ১৯৪ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে হলে ইনিংস রান রেট হতে হবে ১৬২। সেখানে তামিম, মুশফিক ও সৌম্য সরকার; তিন জনই কাক্সিক্ষত রান রেটে ব্যাট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তামিম করেছেন ৩০ বলে ৩৩ রান, ২টা মাত্র চার আর একটা মাত্র ছক্কা মেরেছেন। স্ট্রাইক রেট ১১০। সৌম্য সরকার করেছেন ১৬ বলে ১৭ রান, বাউন্ডারি মাত্র ২টা। মুশফিকুর রহিম করেছেন ২২ বলে ২৩ রান, ২ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায়। স্ট্রাইক রেট ১০৪.৫। তাদের এই সম্মিলিত ব্যর্থতার পরও হারের ব্যবধানটা যে মাত্র ১০ রানের, সেটা মেহেদী হাসান মিরাজের ১৬ বলে ৩৫ আর আহমেদ শেহজাদের ১৭ বলে ৩৯ রানের ইনিংসের কারণে।

দশম মৌসুমে পা রেখেছে বিপিএল। বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটাররা শুরুর আসর থেকেই খেলছেন বিপিএলে। বেশিরভাগ সময়ই তারা ছিলেন ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যতম প্রধান ক্রিকেটার, পারিশ্রমিকের অঙ্কটাও ছিল চড়া। একাদশে জায়গা পাওয়া নিয়েও ভাবতে হয়নি। কিন্তু সেই তুলনায় এক দশকে তাদের টি-টোয়েন্টি সুলভ ব্যাটিং দক্ষতা তৈরি হয়নি, এমনটাই মনে করেন বিকেএসপির ক্রিকেট বিশ্লেষক নাজমুল আবেদীন ফাহিম। গত আসরে ফরচুন বরিশাল দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জানালেন, ‘টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংটা ওয়ানডে ব্যাটিং থেকে আলাদা। এই দক্ষতাটা হয় কারও মধ্যে আছে অথবা নেই। আমাদের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এই দক্ষতাটা শুরু থেকে ছিল না, খুব একটা প্রচেষ্টাও দেখা যায়নি বিপিএলের প্রথম দিকে। যেটা সবশেষ দুইটা আসর থেকে দেখতে পাচ্ছি। মুশফিক এখন অনেক শট খেলছে যেগুলো আগে সে খেলত না।’

৩০ বলে ৩৩, ২২ বলে ২৩, ১৭ বলে ১৬ এসব ইনিংস ওয়ানডের মানদ-ে হয়তো ভালো। তবে ১২০ বলে ১৯৪ রান তাড়ায় যে এসব উলটো ক্ষতিকর,সেটাই জানালেন ফাহিম, ‘প্রায় দুইশ রান তাড়া করতে নেমে হয় এটা করতে হবে (উঁচু স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করা) অথবা মরতে হবে। ইম্প্রোভাইজ করতে হবে, ঝুঁকি নিতে হবে। হয় করতে হবে অথবা মরতে হবে। আজকের ম্যাচে (শনিবার) শুরুতে তামিমের আরেকটু দ্রুত গতিতে ব্যাট করা উচিত ছিল। শুরুতে খেলাটা ধীরগতির করে ফেললে পরের দিকে চাপ তৈরি হয়। তামিমের ঝুঁকি নেওয়া এই কারণে উচিত ছিল যে তার সঙ্গের ব্যাটসম্যান (আহমেদ শেহজাদ) প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর এতটা চড়াও হয়েছিলেন যে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে গিয়েছিল। তামিম সেই সুযোগটা নিতে পারতেন। প্রথম ৫ ওভারে শেহজাদ ১৫ বল খেলে করেন ৩৫ রান আর তামিম ১৫ বলে করেন ১৩ রান। পার্থক্যটা তৈরি হয়ে যায় সেখানেই।

শুধু এই একটা ম্যাচেই নয়, এখন পর্যন্ত মাঠে গড়ানো সবগুলো ম্যাচেই দেখা গেছে স্থানীয় এবং বিশেষ করে জাতীয় দলের আশপাশে থাকা ক্রিকেটারদের ব্যর্থতা। জাতীয় দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান রনি তালুকদারের এখন পর্যন্ত ৪ ইনিংসের রান ৫, ৬, ১৫ আর ১১। তাওহীদ হৃদয় ৪৭ রানের ইনিংস খেলে শুরু করলেও পরের ২ ইনিংসে করেছেন ০ এবং ৯। নাজমুল হোসেন শান্ত’র রান ৩ ইনিংসে ৫৫, স্ট্রাইক-রেট ৯৩.২২। ৩ ইনিংসে লিটন দাসের মোট রান ৩৫, সেরা ১৪। অথচ নাজিবউল্লাহ জাদরান, এভিন লুইসরা খেলছেন কার্যকর সব ইনিংস। চাপের মুখে দলকে জেতাচ্ছেন ম্যাচ।

কার্যকারিতায় বিদেশি ক্রিকেটারদের তুলনায় কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা? এমন প্রশ্নের জবাবে মিরাজ কাল ম্যাচ শেষে বলেছেন, ‘আমাদের দলেই দেখেন, এখানে কিন্তু বিদেশি খেলোয়াড়ের চেয়ে দেশি খেলোয়াড়ের দায়িত্ব বেশি, বিদেশি ৪ জন আর স্থানীয় ৭ জন। আমরা কিন্তু পাওয়ার হিটিং-এর জন্য হারছি না, হারছি বোলারদের এক্সিকিউশন করতে না পারার কারণে।’

একই সঙ্গে একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ চলায় অনেক তারকা ক্রিকেটারই বিপিএলের বদলে বেছে নিয়েছেন ভিন্ন গন্তব্য। যারা এসেছেন তাদের অনেকেরই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে লম্বা সময় আগে। কিন্তু বিপিএলে এসে তারা ঠিকই রান পাচ্ছেন। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ৭ ইনিংসে ৮৫ রান করা এভিন লুইস বিপিএলে এসে ২১ বলে করেন হাফসেঞ্চুরি, পিএসএলে জায়গা না পাওয়া আহমেদ শেহজাদ এসে প্রথম ম্যাচেই করেন ১৭ বলে ৩৯ রান। দেড়শো স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করে ৪ ম্যাচে ১৩৫ রান নাজিবউল্লাহ জাদরানের। দেশের ব্যাটসম্যানদের কাউকেই এমন ভূমিকায় এখনো দেখা যায়নি।

এর পেছনে কারণ হিসেবে নাজমুল আবেদীন ফাহিম মনে করেন অতিরিক্ত ওয়ানডে নির্ভরতাকেই, ‘ওয়ানডের মানসিকতাটাই হয়তো তারা টি-টোয়েন্টিতেও নিয়ে আসে। তবে টি-টোয়েন্টির কিন্তু নিজস্ব একটা ব্যাকরণ আছে, একটা ধরন আছে। এটা যাদের মধ্যে আছে, তাদের আছে। তারা যখন খেলে, তাদের খেলায় সেটা খুব স্বাভাবিক মনে হয়। তারা খুব সহজেই বাউন্ডারি খুঁজে পায়। আমাদের এরা মূলত টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় না। তাদের একটা চেষ্টা আছে, তবে সত্যিকারভাবে এরা কেউই টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান না।’

সামর্থ্যরে পার্থক্য আছে। তবে এটা স্পষ্ট যে মূল সমস্যা সামর্থ্যে নয়, মানসিকতায়।