বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হারের ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলের আগ্রাসী ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ এবং বাজে স্পোর্টসম্যানশিপের জন্য বিশ্লেষক ও সমালোচকরা তাদের তীব্র ভর্ৎসনা করছেন। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা দলের যে ‘খলনায়ক’ মূর্তি তৈরি হয়েছিল, ফাইনালের ঘটনাটি যেন তাতে চূড়ান্ত সিলমোহর দেয়। তবে আর্জেন্টাইনদের দাবি তারা কেবল ফুটবলের প্রতি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে ভুল বোঝার শিকার।
সোমবার রাতে বুয়েনস আইরেসে জাতীয় দলকে স্বাগত জানাতে এজেইজা বিমানবন্দরের কাছে হাজার হাজার সমর্থক ভিড় জমায়। সেখানে থাকা বুয়েনস আইরেসের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা ও পেশায় আইনজীবী ৫৫ বছর বয়সী লিও সিমন বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেকে যে আমাদের পছন্দ করেন না, তার কিছুটা দায় আমাদেরও রয়েছে। কারণ আমাদের মধ্যে একটা অহংকারী ভাব আছে এবং আমরা সবাইকে যেন একটু ওপর থেকে নিচু নজরে দেখি।’ পাশে থাকা লিও সিমনের স্ত্রী মন্তব্য জুড়ে দিয়ে বলেন, ‘তারা আমাদের এই আত্মমর্যাদা ও গর্বকে অহংকার বলে ভুল বোঝে।’
কিংবদন্তি লিওনেল মেসি পুরো বিশ্বজুড়ে ভালোবাসায় সিক্ত হলেও, এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার প্রতি ফুটবল বিশ্বের অন্যদের নেতিবাচক মনোভাব কেবল বেড়েই গেছে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল আর্জেন্টিনা হলো ফিফার ‘প্রিয় পাত্র’ এবং তারা পেনাল্টি ও প্রতিপক্ষকে দেওয়া কার্ডের ক্ষেত্রে রেফারিদের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। এরপর এলো সেই ফাইনাল ম্যাচ যা ভরপুর ছিল ফাউল, মাঠের হাতাহাতি এবং স্পেন যখন বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরছিল, তখন পুরো আর্জেন্টাইন দলের পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে। আর্জেন্টিনা দলের এই আচরণকে ‘বিরক্তিকর, খিটখিটে ও কুৎসিত পারফরম্যান্স’ বলে বর্ণনা করেছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা। জার্মানির সাবেক ফুটবলার থমাস হিটজলসপারগার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, আর্জেন্টিনা দলে ছিল ‘নিকৃষ্টমানের খেলোয়াড়’। অন্যদিকে ব্রিটিশ টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব পিয়ার্স মরগান বলেন, ‘তারা মূলত মাঠে নেমেছিল যত বেশি সম্ভব স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের পিটিয়ে ছাতু করার উদ্দেশ্যে।’
আর্জেন্টিনা দলকে সংবর্ধনা দিতে আসা ৩৫ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেদিয়া এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সবসময়ই সমালোচিত হয়েছি, এটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ আমরা মাঠে সবসময় নিজেদের সেরাটাই উজাড় করে দিই।’
অনলাইনে অনেক আর্জেন্টাইনই এই সমালোচনাগুলোকে তাদের গর্বের প্রতীক বা সম্মানসূচক পদক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সাংবাদিক পেদ্রো রোসেমব্লাট তার ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘আর্জেন্টাইনদের এই নির্ভীকতার বিষয়টি তারা সহ্য করতে পারে না। আমাদের এই বিদ্রোহী মনোভাব তাদের রাগান্বিত করে, ক্ষিপ্ত করে তোলে... তারা আমাদের উদ্ধত, প্রতারক, নোংরা বলে গালি দেয়। আর আমরা এটা দারুণ উপভোগ করি, এটি আমাদের বুক গর্বে ভরিয়ে দেয়।’
ক্রীড়া সাংবাদিক এজেকিয়েল ফার্নান্দেজ মোরেস এএফপি-কে বলেছেন যে, কিছু সমালোচনা অবশ্যই যুক্তিসংগত ছিল : ‘মাঝে মাঝে আমরা মনে করি আমরাই বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু ঈশ্বর এবং আমাদের নিজেদের অস্তিত্বই যেন একমাত্র আর্জেন্টাইন।’ তিনি জানান, স্থানীয় ফুটবলে উসকানি দেওয়া, ব্যঙ্গ করা কিংবা বড়াই করার যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা বৈশ্বিক দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ‘আমরা আশা করতে পারি না যে পুরো বিশ্ব আমাদের ভাবাবেগ, অনুভূতির প্রকাশ এবং জীবনযাত্রার ধরনকে হুবহু বুঝে নেবে’ তিনি বলেন। তবে, ট্রফি দেওয়ার সময় স্পেনের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি ‘একেবারেই ঠিক হয়নি’ বলে স্বীকার করেন তিনি।
আইনজীবী সিমন অবশ্য মাঠের কঠোর ও শারীরিক ফুটবলকে ‘সহিংসতা’ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। ‘আর্জেন্টিনা এমন একটি দল যা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে, প্রায় সব দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের ধরনই এমন। আর স্পেনও তো কৌশলী ফাউল করেছে’ তিনি যোগ করেন। ‘এটা ফুটবল : গায়ের ধাক্কা সহ্য করতে না পারলে ভলিবল খেলতে যান।’
এক দশক ধরে আর্জেন্টিনায় বসবাসকারী ৪৭ বছর বয়সী ভেনেজুয়েলান স্নায়ুবিদ এভেলিও রুবিও মনে করেন, আর্জেন্টিনার বাইরে থেকে ‘এখানকার মানুষ কীভাবে ফুটবলকে অনুভবে ধারণ করে’ তা বোঝা অসম্ভব। যে ভেনেজুয়েলা কখনো ট্রফি জেতেনি, সেখানকার মানুষ হয়ে আর্জেন্টিনায় এসে এই উন্মাদনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করাকে তিনি ‘অসাধারণ এক অনুভূতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
আর্জেন্টাইন সমর্থক এবং এমনকি কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধেও বর্ণবাদের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে যেমন অতীতে ফ্রান্সের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে তাদের বর্ণবাদী গান গাওয়ার ঘটনা, যা বোঝাতে চেয়েছিল তারা ‘প্রকৃত ফরাসি’ নয়। এছাড়া ক্লাব ফুটবলেও দীর্ঘদিনের ইতিহাস রয়েছে ব্রাজিলীয় সমর্থক বা কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে গ্যালারি থেকে কলা ছুড়ে মারা কিংবা বানরের মতো অঙ্গভঙ্গি করার।
এবারের বিশ্বকাপ চলাকালে, একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক ‘আশোস্পিড’ নামে পরিচিত এক কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন ইনফ্লুয়েন্সারকে লাইভস্ট্রিম চলাকালে ‘চিড়িয়াখানায় গিয়ে কাঁদতে’ বলার পর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল।
সান মার্টিন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী ইভান সুলিয়াকের মতে, ফুটবলের সঙ্গে জড়িত বর্ণবাদকে পুরো আর্জেন্টাইন সমাজ ও ইতিহাসের ওপর সাধারণভাবে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, এই বর্ণবাদের অস্তিত্ব রয়েছে এবং তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই তকমাগুলো এমন সব ঔপনিবেশিক দেশগুলোর কাছ থেকে আসে, যারা নিজেরাই আজও বর্ণবাদের বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান করতে পারেনি।’