শামার জোসেফ ছুটছেন। ব্রায়ান লারা কাঁদছেন। কার্ল হুপার কাঁদছেন। জশ হ্যাজেলউডের স্টাম্প ভেঙে গেছে, ৯১ রানে নটআউট থাকা স্টিভেন স্মিথ মাঠের মাঝখানে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে। ব্রিসবেনে গোলাপি বলের টেস্টটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে গেছে ৮ রানে। পার্থে কার্টলি অ্যামব্রোসের হাত ধরে পাওয়া জয়ের ২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জিতল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এবারের জয়ের নায়ক শামার জোসেফ। মিচেল স্টার্কের ইয়র্কারে যার পায়ের হাড়ে চিড় ধরিয়েছে, প্রথম ইনিংসে মাঠ থেকে হাসপাতালে যাওয়া জোসেফের পরের ইনিংসে খেলারই কথা না। সেই জোসেফই ৬৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে স্রেফ গুঁড়িয়ে দিলেন টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী অস্ট্রেলিয়াকে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে দলটা অস্ট্রেলিয়াতে পা রেখেছে টেস্ট খেলতে, তাদের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই অনভিজ্ঞ। ক্যারিবীয় কিংবদন্তি জেফ্রি ডুজন জ্যামাইকান এক পত্রিকায় নিজের কলামে লিখেছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার আমাদের মতো অবস্থা সইতে হয় না, বোধহয় ওদের ক্রিকেটারদের দেশপ্রেম অনেক বেশি। এই অবস্থায় এমন একটা দল পাঠানো মানে কসাইখানায় ভেড়া পাঠানোর সমান।’ ডুজনের কথাটা নিয়ে কেউ খুব একটা আপত্তি তোলেনি কারণ প্রথম টেস্ট অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ১০ উইকেটে। অ্যাডিলেডে দুই ইনিংসের কোনোটিতেই দুইশ রানও করতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ব্রিসবেনে গোলাপি বল আর ফ্লাডলাইট কি এতটাই বদলে দিল ক্যারিবীয়দের যে এই অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্মে টানা ৪ ম্যাচ জিতে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা প্যাট কামিন্সের দলটাকে তারা নামিয়ে আনল মাটিতে? নাকি শামার জোসেফ নামের এক তরুণের জীবনের গল্পটাকে বদলে দিতেই ক্রিকেট দেবতার এই আয়োজন!
গায়ানার গহিনে এক গ্রাম, বারাকারা। সেখানে ইন্টারনেট সুবিধা গেছে ২০১৮ সালে। গোটা গ্রামে একটা সাদা কালো টিভি। সেখানেই কার্টলি অ্যামব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশের বোলিং দেখে দেখে, লেবু পেয়ারা এসব গোলাকার ফল দিয়ে বোলিং করতে করতে বেড়ে ওঠা শামারের। জঙ্গলে কাঠ কাটার কাজ করতেন পরিবারের সঙ্গে। একদিন অল্পের জন্য গাছ মাথায় পড়ে মরার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার পর সেই কাজ ছেড়ে পাড়ি জমালেন শহরে। সেটাও প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দূরে, নিউ আমস্টারডামে। সেখানে এসে নির্মাণ শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করে নিজের আর পরিবারের খরচ চালিয়েছেন। সঙ্গে চালিয়েছেন ক্রিকেটও। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার রোমারিও শেফার্ড ছিলেন জোসেফের প্রতিবেশী। তিনিই জোসেফকে পরিচয় করিয়ে দেন গায়ানার কোচের সঙ্গে। এরপর সিপিএলে গায়ানা আমাজনস দলের নেট বোলার হয়ে শুরু, আস্তে আস্তে প্রথম শ্রেণির দলেও সুযোগ পাওয়া। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে চারদিনের ম্যাচের সিরিজে ১২ উইকেট নিয়ে জোসেফ জায়গা পান অস্ট্রেলিয়াগামী দলে। অ্যাডিলেডে ব্যাট হাতে গড়েছিলেন প্রতিরোধ, ব্রিসবেনে বল হাতে স্রেফ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। অথচ কাল তার মাঠেই নামার কথা নয়!’ আমার আজ (রবিবার) মাঠেই আসার কথা নয়। সমস্ত কৃতিত্ব আসলে ডাক্তারের, অসাধারণ ডাক্তার সে! আমাকে বলা হয়েছিল মাঠে এসে সমর্থন দিতে। কিন্তু আসার সে আমার পায়ের পাতায় কী যেন একটা করল, কী করল আমি জানি না। তাতেই আমি পারলাম মাঠে নেমে বল করতে আর দলকে জেতাতে’, ম্যাচের পর জানিয়েছেন জোসেফ।
৭ উইকেট নিয়েছেন জোসেফ, তবে অস্ট্রেলিয়ার মনোবল ভেঙে দিয়েছেন পর পর দুই ডেলিভারিতে ক্যামেরন গ্রিন আর ট্র্যাভিস হেডের স্টাম্প ভেঙে দিয়ে। গতির কাছে পরাস্ত হয়ে দুজনেই দেখেছেন, পেছনে স্টাম্প ছত্রখান। জোসেফ যেন মনে করিয়ে দিলেন শোয়েব আখতারকে, ১৯৯৯’র ইডেনে পর পর দুই বলে দুই ইয়র্কারে যেভাবে বোল্ড করেছিলেন শচিন টেন্ডুলকার আর রাহুল দ্রাবিড়কে। জোসেফের এমন আগুনে বোলিংয়ের পরও ভূমিকা বদলে ওপেনার বনে যাওয়া স্টিভেন স্মিথের দৃঢ়তায় মনে হচ্ছিল টেস্টটা জিতেই যাবে অস্ট্রেলিয়া। কে জানে, হ্যাজেলউড জোসেফের ওভারের পঞ্চম বলে বোল্ড না হয়ে যদি আরও দুটো বল খেলে দিতেন, তাহলে পরের ওভারেই ৯১ রানে অপরাজিত থাকা স্মিথ হয়তো ঘুচিয়ে দিতেন ৮ রানের ব্যবধানটা। কিন্তু দিনটা যে জোসেফের, এই অস্ট্রেলিয়া সফরটাই যে তার জীবনে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। হ্যাজেলউডের ব্যাটের পাশ দিয়ে যাওয়া বলটা যখন স্টাম্পে আঘাত করল, জোসেফ তখন ছুটছেন ১০০ মিটারের দৌড়বিদের মতো। পেছনে বাকি সবাই! ধারাভাষ্যকক্ষে লারা কাঁদছেন, হুপার কাঁদছেন। ২৭ বছরের অপেক্ষার অবসান হলো বছর চব্বিশের এক তরুণের হাতে। ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়াকে যেবার হারিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সেটা জোসেফের জন্মেরও বছর তিনেক আগে। এমন সব কিছু ঘটে বলেই তো ক্রিকেট এতটা সুন্দর!