বাংলাদেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার হিসেবে ‘খাতুনগঞ্জ’ খ্যাতি পেয়েছে। খাতুনগঞ্জ আসলে দেখতে কেমন? তার বিস্তৃতি কতটুকু, কিভাবে এখানে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়? এসব বিষয়ে কোটি মানুষের কৌতূহল। বর্তমানে খাতুনগঞ্জ বলতে বোঝায় চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ-আছদগঞ্জ। এই তিন মিলেই খাতুনগঞ্জ। কেডিএস, এস আলম, টি কে গ্রুপ, এনজি সাহাসহ দেশের সব সেরা শিল্প উদ্যোক্তাদের অফিস এখানে। বাংলাদেশের সকল সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের শাখা রয়েছে তিন বর্গকিলোমিটারের এই এলাকায়। কর্ণফুলী নদীর তীরে চাক্তাই খালের পাড়েই এই বাণিজ্যিক এলাকা।
এই বর্ণনা তুলে ধরা হলো হাজার বছরের পুরনো এই ব্যবসাকেন্দ্রের ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য। কর্ণফুলী নদীর পাড়ে চাক্তাই। সেই চাক্তাইয়ে জমিয়ে ব্যবসা করতেন পটিয়ার হাজী মীর আহমদ সওদাগর, হাটহাজারীর নূর আলী সওদাগর, বোয়ালখালীর নূরুল হক সওদাগর। স্বাধীনতার আগে-পরে এরা তিনজনেই চট্টগ্রামের বনেদি সওদাগর। বলা হয়ে থাকে, এরা তিনজন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের তিন নক্ষত্র। বোয়ালখালীর নূরুল হক সওদাগর মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। তারও আগে মারা গেছেন নূর আলী সওদাগর। আর গত শনিবার মারা গেছেন মীর আহমদ সওদাগর। তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। সাত ছেলেমেয়ের জনক তিনি। মীর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক।
মীর আহমদ সওদাগরের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করেন হাজারখানেক কর্মী। মারা যাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকে ব্যবসা থেকে দূরে ছিলেন মীর আহমদ সওদাগর। কিন্তু ব্যবসার খোঁজ-খবর নিতেন নিয়মিত। ধার্মিক, শিক্ষানুরাগী, দানবীর, মানবিক, সুশৃঙ্খল মানুষের পথিকৃৎ— এরকম অসংখ্য গুণের কথা বলা যাবে তার সম্পর্কে। পটিয়ায় নিজ বাড়ির জানাজায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।
মীর আহমদ সওদাগর সম্পর্কে লেখার উদ্দেশ্য হলো তিনি এমন কায়দায় ব্যবসা করেছেন যেটি ইতিহাসের অংশ হতে পারে। আজ থেকে ১০০ বছর পরে খাতুনগঞ্জের রূপ, প্রকৃতি ও ব্যবসার ধরনসহ অনেক কিছু বদলে যাবে। কিন্তু চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের যারা ‘মেকার’ ছিলেন তাদের ভূমিকা কি ছিল, কেমন ছিল— সেটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে থেকে যাবে অজানা।
টিনের চালার নিচে বসে চৌকির ওপর তোষক পেতে সাদা বিছানা চাদর ও সাদা কাপড়ের ঢাকা বালিশ পাশে রেখে ব্যবসা চালাতেন মীর আহমদ সওদাগর। সাদা পাঞ্জাবি, সাদা লুঙ্গি এই ছিল তার পোশাকের চিরপরিচিত রূপ। পটিয়া থেকে সকালে চলে আসতেন ১৫ কিলোমিটার দূরের খাতুনগঞ্জে। দুপুরে রান্না হত দোকানেই। কেনাবেচার ফাঁকে খেয়ে নিতেন দুপুরের খাবার। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতেন সন্ধ্যায়।
সুপারি, শুকনো মরিচ, মশলার ব্যবসা দিয়েই যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে পেট্রোল পাম্প, তেলের মিল, কাগজের মিল, পণ্য আমদানি ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত হন। ব্যাংক ঋণের ধারে-কাছে ছিলেন না। আজ যারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা তাদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন মীর আহমদ সওদাগর। নগদ টাকায় আর ব্যবসার ধরনে তার কাছাকাছিও ছিলেন না ওইসব ব্যবসায়ী। যদিও এখন তারা মীর আহমদ সওদাগরকে ছাড়িয়ে গেছেন ধনসম্পদে।
সৎভাবে পরিশ্রম করে নিজের ব্যবসার আয়তন বড় করেছেন, নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন মীর আহমদ সওদাগর। কোনো ধরনের বিতর্কে জড়াননি ব্যবসা নিয়ে। ব্যবসা করে টাকা কামিয়েছেন এটা যেমন সত্য তেমনি অসংখ্য স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বার্মর (মিয়ানমার) থেকে সুপারি এনে বিক্রি করতেন। এই সুপারি বিক্রির লাভের টাকায় তার ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। চাক্তাই থেকে সরে এসে এক কিলোমিটার দূরে খাতুনগঞ্জে অফিস করেছেন। সে অফিসে থেকে বড় ছেলে মোহাম্মদ আবদুস সালাম নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছোট তিন ভাই মীর মোহাম্মদ হাসান, মীর মোহাম্মদ হোসেন ও মীর মোহাম্মদ নাছিরকে নিয়ে। কিন্তু নতুন অফিসে আসতেন না মীর আহমদ সওদাগর। বসতেন তার চাক্তাইয়ের পুরনো দোকানে।
খাতুনগঞ্জের ট্র্যাডিশনাল ব্যবসার বাইরে গিয়ে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিয়ে কিছু কথা শোনা যায়। আধুনিক জমানার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানো আর ব্যবসার পরিধি বড় করতে হলে ব্যাংক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা দরকার বলে প্রথমে মনে করেছিলেন। নগদ টাকার কারবারি মীর আহমদ সওদাগর পরে বুঝলেন ব্যাংক ব্যবসা তার জন্য নয়। ছেলে মোহাম্মদ আবদুস সালাম সে কথা অকপটে স্বীকার করেন, ‘এরকম জটিল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হব সেটি বুঝতে পারিনি আগে। তবে এসব নিয়ে আমাদের আক্ষেপ নেই।’
মীর আহমদ সওদাগরের ঘটনাবহুল জীবন। প্রাইমারি স্কুল পাস। জীবিকার সন্ধানে খাতুনগঞ্জের পাশের মিয়াখান নগরে এক প্রতিষ্ঠানে মাত্র দুই বছর চাকরি করেছেন। তারপর শুরু করেন ব্যবসা। ৬৫ বছর ধরে টানা ব্যবসা করেছেন তিনি। চালের ব্যবসায় তিনি এমন এক নজির সৃষ্টি করেছেন যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাল বেপারিরা তাকে এক নামে চেনে ও বিশ্বাস করে। তিনি চাক্তাইয়ের চাল নিয়ে আসা বেপারিদের নিজের খরচে রাখতেন-খাওয়াতেন। পরে পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে তাদের নিজ জেলায় ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। গল্পের এখানে শেষ নয়। এক টাকার ব্যবসা দিয়ে শুরু তার। এক হাজার কোটি টাকার ব্যবসাও করেছেন তিনি।
ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে বিশাল সংসার আনন্দেরই ছিল মীর আহমদ সওদাগরের। আদরে-ভালোবাসায় সামলে রেখেছেন প্রায় সবাইকে। ব্যবসাসফল প্রবীণ মীর আহমদ সওদাগরকে সবাই ‘গুরু’ মানতেন। ধনসম্পদের গৌরব অহঙ্কার করেননি কখনো। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এই মানুষ মানবতার জয়গান গেয়েছেন নীরবে। রাজনীতি করেননি কখনো। তাও রাজনীতিবিদরা তাকে সম্মান করতেন। এক জীবনে একজন মীর আহমদ সওদাগর এত কিছু অর্জন করেছেন যা আসলেই তার প্রাপ্য। খাতুনগঞ্জে এখন যারা ব্যবসা করছেন তারা হয়তো মনে মনে একজন মীর আহমদ সওদাগর হতে চাইবেন ভবিষ্যতে।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা না করেও একজন সামান্য ব্যবসায়ী থেকে পুরো ব্যবসায়ী হয়ে সমাজে আলো ছড়িয়েছেন। তার জীবনের আলোকিত গল্প মানুষের মুখে মুখে থাকবে অনেক বছর। জনাব মীর আহমদ সওদাগর আপনাকে স্যালুট। পরপারে আপনি শান্তিতে থাকুন।
লেখক: আবাসিক সম্পাদক, একুশে টিভি, চট্টগ্রাম