আরও যেসব যুদ্ধের শঙ্কা

এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যই সবচেয়ে অস্থিতিশীল, যেখানে কয়েকটি ফ্রন্টে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের শিয়া মতাবলম্বী হিজবুল্লাহর এবং ইয়েমেনের শিয়া মতাবলম্বী হুতিদের সঙ্গে ইসরায়েলের লড়াইয়ের আশঙ্কা জোরালো। কারণ ফিলিস্তিনে অব্যাহত নৃশংসতা থেকে সরে আসার কোনো আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধ উত্তেজনার বাইরে নেই ইউরোপও। নাগার্নো-কারাবাখ নিয়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের উত্তেজনা যেকোনো মুহূর্তে ছড়াতে পারে। কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যে সীমান্ত ও জাতিগত উত্তেজনা স্তিমিত মনে হলেও এর চেহারা বদলে যেতে পারে। এদিকে আফ্রিকা মহাদেশে নতুন নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় দুটি যুদ্ধের আশঙ্কা এশিয়ায়। একটি কোরীয় উপদ্বীপে, আরেকটি তাইওয়ান প্রণালিতে।

যুদ্ধ অধ্যয়নের চমকপ্রদ তথ্যটি হলো, ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই থেকে কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধবিরতি চলছে। এখনো দুই দেশ যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে, শুধু অস্ত্র চালনাই বাকি। দুই কোরিয়ার উত্তেজনা সংবাদমাধ্যমের নিত্যদিনের শিরোনাম। উত্তর কোরিয়া এখন পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত একটি দেশ, সামরিক শক্তিতে এর ব্যাপক বিনিয়োগ। ক্ষেপণাস্ত্র, হাইপারসনিক অস্ত্র থেকে শুরু করে, সমুদ্রের অতলে ড্রোন, আন্তঃমহাদেশীয় যুদ্ধাস্ত্রে ভর করে সুদূর মার্কিন মুল্লুকে হামলা চালানোর কৌশল আয়ত্ত করেছে উত্তর কোরিয়া। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া এই হুমকি মোকাবিলায় ঐতিহাসিকভাবেই পশ্চিমা বিশে^র অনুগামী। যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্রদের অন্যতম দক্ষিণ কোরিয়া।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন দেশগুলো মিলে কোরীয় উপদ্বীপকে ৩৮তম অক্ষরেখা বরাবর বিভক্ত করে। স্নায়ুযুদ্ধের দুই মেরু সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে শুরু থেকেই। ঐতিহাসিকভাবে কমিউনিস্টশাসিত উত্তর কোরিয়া চীনের সমর্থনও পেয়েছে। সোভিয়েত জমানার মিত্র হিসেবে রাশিয়াও উত্তেরর পরম বন্ধু। শোনা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে অস্ত্র দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। ১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়ার সেনারা ৩৮তম অক্ষরেখা পার হয়ে আক্রমণ চালায় দক্ষিণ অংশে। সেই থেকে শুরু। পরে চীন ও সোভিয়েত সেনারা লড়াই করে উত্তরের হয়ে। আর দক্ষিণের হয়ে লড়াইয়ে নামে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশি^ক বাহিনী। তবে এই বাহিনীতে ৯০ শতাংশের বেশি সেনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।     

উত্তর কোরিয়ায় এখন কিম জং উনের শাসন চলছে। তিনি শাসক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। ২০১১ সালে বাবা কিম ইল জংয়ের মৃত্যু হলে কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা হন কিম জং উন। ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া প্রথম পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। সেই থেকে যেন দুই কোরিয়ার উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধের উত্তেজনা দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলেন, কোরীয় যুদ্ধ আবার শুরু হলে তা এই শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে। দুই কোরিয়ার সংঘাত যেন একটি সুতার ওপর ঝুলে থাকা মানুষের মতো, যেখানে যেকোনো মুহূর্তেই যুদ্ধের দামামা বাজবে। 

কোরীয় উপদ্বীপের পর তাইওয়ান উত্তেজনা কয়েক দশক ধরে চীনের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ১৯৪৯ সালে মাও সে-তুংয়ের নেতৃত্বে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর উৎখাত হওয়া কুওমিনতাং পার্টির শাসকরা আশ্রয় নেন তাইওয়ান দ্বীপে। জাতিসংঘে সত্তরের দশকের আগ পর্যন্ত চীনের বৈধ প্রতিনিধিত্ব ছিলেন তাইওয়ানের শাসকরাই। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট শাসকরা চীনের প্রতিনিধিত্ব আদায় করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বও এ নিয়ে আপত্তি তোলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু পরে তাইওয়ানের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সমুন্নত রাখার পক্ষে সব সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও পশ্চিমা বিশ্ব আওয়াজ তুলেছে। মূল ভূখন্ডের সঙ্গে তাইওয়ানের একত্রকরণ নিয়ে চীনের হুমকির বিরুদ্ধে তাইপেকে প্রতিরক্ষা সহায়তা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ওয়াশিংটন। ঘটনাচক্রে অবশ্য সেই কুওমিনতাং পার্টি এখন চীনপন্থি। তবে তাইওয়ানের আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে  এবং চীনের পক্ষে সংযুক্তির পক্ষের আলাদা জনমত রয়েছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সফরকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সামরিক মহড়া শুরু করে বেইজিং। তাইওয়ানকে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও মূল ভূখন্ড ভুক্ত করার অঙ্গীকার বেশ জোরালোভাবে ব্যক্ত করে চীন। চীন যদি তাইওয়ানে শক্তি প্রয়োগের পথে হাঁটে, তবে পশ্চিমা অক্ষের সঙ্গে চীনের লড়াই বেধে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী।

এদিকে ইউরেশিয়া অঞ্চলের আরও এক সংকট নাগার্নো-কারাবাখ। এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী আর্মেনীয়। কিন্তু ছিটমহলটি আজারবাইজানের ভূখন্ড হিসেবে স্বীকৃত। আর্মেনিয়ার মানুষের সঙ্গে কারাবাখের মানুষের আত্মীয়তা, যোগাযোগ প্রবল। এ কারণে কারাবাখে আজারবাইজান সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরব থাকে আর্মেনিয়া। আবার কারাবাখের মানুষও আর্মেনিয়ার প্রতি অনুরাগী। সেখানে স্বশাসন ও স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন সক্রিয় রয়েছে। দুটি দেশই সাবেক সোভিয়েতের অংশ ছিল। সোভিয়েত পতনের পরই নব্বইয়ের দশকে এই অঞ্চল নিয়ে যুদ্ধে জড়ায় তারা। সর্বশেষ ২০২০ সালে দুই দেশ যুদ্ধে জড়ায় অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে। আজারবাইজানের অভিযোগ, কারাবাখের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেয় আর্মেনিয়া। যুদ্ধের একপর্যায়ে কারাবাখকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোষণাকারীদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যায় আজারবাইজান। এতে অন্যতম অংশীদার ছিল আর্মেনিয়া। আর মধ্যস্থতার ভূমিকা নেয় রাশিয়া।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুদ্ধবিরতি এড়িয়ে কারাবাখে সেনা অভিযান চালায় আজারবাইজান। আত্মসমর্পণ করে কারাবাখের স্বঘোষিত সরকার। এ সময় কারাবাখ থেকে বহু শরণার্থী আর্মেনিয়ায় চলে যায়। এই সংঘাত আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, কারাবাখ নিয়ে আর্মেনিয়া তার সংবেদনশীলতা পরিত্যাগ করতে পারবে না এবং আজারবাইজানও কারাবাখের দখল ছাড়বে না। গত মাসেও দুই দেশের নেতাদের কথার লড়াই দেখা গেছে। স্থায়ী কোনো চুক্তি এখনো সম্পাদিত হয়নি।

ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় গেলে এখন সংঘাতের সবচেয়ে উর্বরভূমি বলা যায় ইথিওপিয়াকে। হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের দেশ ইথিওপিয়া স্থলবেষ্টিত। সম্প্রতি তারা সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যাতে এডেন সাগর ও লোহিত সাগরে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। কিন্তু সোমালিল্যান্ড স্বাধীন সরকার চালালেও আন্তর্জাতিকভাবে দেশ হিসেবে তাদের স্বীকৃতি নেই। ইথিওপিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সমুদ্র ব্যবহারের সুবিধার বিনিময়ে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেবে আদ্দিস আবাবা এবং বহির্বিশে^ও স্বীকৃতির জন্য তদবির করবেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী শান্তিতে নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব আবি আহমেদ।   

এডেন সাগর ঘেঁষে সোমালিয়ার দক্ষিণ উপকূল বরাবর ভূখন্ডটি সোমালিল্যান্ড। আন্তর্জাতিকভাবে এটি সোমালিয়ার ভূখন্ড। সোমালিল্যান্ডের আলাদা সংবিধান, সরকার ও প্রশাসন রয়েছে। সোমালিয়ার সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এই অঞ্চলে। ইথিওপিয়া তাদের সঙ্গে চুক্তি করার পর ফুঁসে উঠেছে সোমালিয়া। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নিয়ে উত্তেজনা যুদ্ধে গড়ালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ওই চুক্তিকে এরই মধ্যে অবৈধ আখ্যা দিয়েছে সোমালিয়া।

ইথিওপিয়ার আরেকটি সংকট স্তিমিত বারুদের মতো হয়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ২০২০ সালে দেশটির তিগ্রে অঞ্চলের বিদ্রোহী সংগঠন ‘তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)’-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। দেশের শাসনক্ষমতায় তিগ্রে অঞ্চলের প্রভাব হ্রাসের প্রেক্ষাপটে সংঘাত শুরু হয়। এই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, নিহত হয় হাজার হাজার। ২০২২ সালের ৩ নভেম্বর সরকার ও টিপিএলএফের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়। যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যসংকট এখনো কাটেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, তিগ্রে অঞ্চলের সঙ্গে আদ্দিস আবাবাকেন্দ্রিক প্রশাসনের বিভাজন ঐতিহাসিক। এর টেকসই সমাধান না হলে আবার ছড়াবে সংঘাত।

ইউরোপের একটি ছোট্ট সংকট হচ্ছে কসোভো-সার্বিয়ার জাতিগত বিবাদ। ২০০৮ সালে একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় কসোভো। মুসলিম-অধ্যুষিত কসোভো স্বাধীন সার্বিয়ার একটি অঞ্চল ছিল। কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও সার্বিয়ার মিত্র চীন ও রাশিয়ার কারণে তারা এখনো জাতিসংঘের সদস্যপদ পায়নি। তবে কসোভোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সম্পর্ক উষ্ণ এবং তারা কসোভাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কসোভোর আবানিয়ান জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সার্ব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নৃতাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সার্বিয়ানদের সঙ্গে কসোভান আলবেনিয়ানদের এই রাজনৈতিক বিভাজনের ইতিহাস বেশ পুরনো।

যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর অনেকগুলো দেশ স্বাধীন হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ‘সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো’। ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কসোভান আলবেনিয়ানদের সংগঠন কসোভো লিবারেশন আমির্র (কেএলএ) সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় সার্ব শাসকরা। কসোভানদের হয়ে ন্যাটো জোট তৎকালীন সার্ব সরকারের বিরুদ্ধে বোমা হামলা শুরু করে। পরে সার্ব সেনারা তৎকালীন কসোভো প্রদেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এখনো সেখানে ন্যাটো সেনা মোতায়েন রয়েছে শান্তিরক্ষী হিসেবে। ঘটনাক্রমে সাার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো আলাদা দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে সার্বদের শাসন টিকে রয়েছে। কসোভান আলবেনিয়ানরা স্বাধীনতার জন্য সার্ব জাতিগোষ্ঠীর শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে চালাতে ২০০৮ সালে এসে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

কিন্তু কসোভোর উত্তরাঞ্চলে সার্ব জাতিগোষ্ঠীরাই প্রধান। সার্বিয়াসংলগ্ন অঞ্চলটির সঙ্গে বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় অবাধ যাতায়াত হয় সার্বদের মধ্যে। সেই এলাকার সার্ব জনগোষ্ঠী কসোভোর শাসনকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। বলা যায়, তারা কসোভোর স্বাধীনতাকে অগ্রাহ্য করে সার্বিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। সার্বদের সঙ্গে কসোভোর সরকারের সম্পর্ক কেমন তা বোঝা যাবে ২০২২ সালের একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। সার্বরা গাড়িতে কসোভোর সরকারের নম্বরপ্লেট ব্যবহার না করে সার্বিয়া সরকারের লাইসেন্স ব্যবহার করে। কিন্তু ওই সময় কসোভো সরকার এটি বন্ধ করতে চাইলে উত্তেজনা বাধে। আবার গত বছরের অক্টোবরে উত্তর কসোভোর এক থানায় হামলা চালিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার জন্য সার্ব অস্ত্রধারীদের দায়ী করা হয়। কসোভো অভিযোগ করে, এই ঘটনার হামলাকারীদের আশ্রয় দিয়েছে সার্বিয়া। এ নিয়ে সর্বশেষ যুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রম হয়।