সবুজ স্বর্গে আবর্জনার স্তূপ

সবুজ প্রকৃতি আর জলাশয়ের জন্য 'সবুজ স্বর্গ' হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস। কিন্তু গত দুই বছরে যত্রতত্র প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্যসহ নানান ধরনের ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কয়েকগুণ দূষিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্যাম্পাসের পরিবেশ দূষণ রোধে সচেতনা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জনবহুল স্থান বটতলায় অভিনব এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষার্থী—ফারিহা জামান নিকি, সরদার ইসফার সাদী, ইমরান হাসান শুভ, জুয়াইরা মেহজাবিন, নওশাদুল সাবেরিন, আনিকা রাহি ও মাহিব মহিউদ্দিন জামান। তারা প্রদর্শনীর নাম দিয়েছে ' জাহাঙ্গীরনগর সবুজ স্বর্গ।

মানুষ অবিবেচকের মতো ক্যাম্পাসে যততত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে সবুজ প্রকৃতি দূষিত করছে বলে এই নাম দিয়েছেন তারা। গত ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রদর্শনীর কাজ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। যা আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।

প্রদর্শনীতে গিয়ে দেখা যায়, একটি গাছে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে শতাধিক প্লাস্টিকের প্লেট ও প্লাস্টিকের খাবারের প্যাকেট। আরেকটি গাছে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন ময়লা আবর্জনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী সপ্তম ছায়ামঞ্চের পাশ থেকে কুড়ানো এসব বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের গ্লাস, পলিথিন, সিগারেটের প্যাকেট, কাঁচের ও প্লাস্টিকের বোতল ইত্যাদি। এছাড়াও কয়েকটি ভাঙা জানালার গায়ে আঠা দিয়ে লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা রয়েছে ময়লা-আবর্জনার ফেলে রাখা বিভিন্ন স্থানের ছবি । ছবিগুলো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান থেকে তোলা বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

প্রদর্শনীর আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে তারা ক্যাম্পাসের একটি স্থানে ভাঙা জানালাগুলো দেখতে পায়। তারপর তারা চিন্তা করে কিভাবে জানালাগুলো সেখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথায় রাখা যায়। পরবর্তীতে তাদের মাথায় আসে সচেতনতামূলক একটি প্রদর্শনী করার। তারপর তারা দুইদিন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ময়লা-আবর্জনার ছবি তোলেন। এরকম প্রায় দুই হাজার ছবি তোলে তারা। ছবিগুলো থেকে বাছাইকৃত ছবিগুলো নিয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ।

আয়োজকরা বলেন, মূলত করোনা পরবর্তী সময় থেকে প্লাস্টিকের প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহারটা বেড়ে গেছে। শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা খাওয়া-দাওয়ার পর এসব প্লেট ও গ্লাস যেখানে-সেখানে ফেলে রেখে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকার ফলে সেগুলো রিসাইক্লিং বা অন্যত্রে সরিয়ে ফেলায় হয় না। ফলে সেগুলো দেখা যায় খাবারে দোকানের পেছনে জলাশয়ের পাড়ে স্তুপ করে রাখা হয়।

প্রদর্শনীর আয়োজক সরদার ইশফার সাদী বলেন, ‘আমাদের এই প্রদর্শনীটি প্রতিবামূলক ও সচেতনতামূলক। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যাতে তারা সচেতন হয়।’

সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা, সপ্তম ছায়ামঞ্চ, পরিবহন চত্ত্বর, শেখ রাসেল হলের পেছনে, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, চারুকলা সম্প্রসারিত ভবন প্রাঙ্গন ঘুরে দেখা গেছে যত্রতত্র প্লাস্টিকের প্লেট, গ্লাস, বোতল ও খাবারের প্যাকেট, পলিথিন ও কাগজসহ বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা স্তুপ করে রাখা আবার কোথাও  ছড়ানো-ছিঁটানো। জলাশয়ের পাড়গুলোতেও আবর্জনা  স্তুপ করে রাখা।

ক্যাম্পাসে যত্রতত্র এভাবে ময়লা ফেলে রাখার ফলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যার বিরুপ প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব-বৈচিত্র্যের উপর পড়ছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দীন রুনু ।

তিনি বলেন, ‘ ক্যাম্পাসে যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্যসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলার ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বায়ু দূষিত হচ্ছে।  জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে। ফলে অতিথি পাখির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনীটি প্রসংশার দাবিদার। আশা করব তাদের এই কাজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা তৈরি করবে। পাশাপাশি আমরাও সচেতন হবো যাতে যত্রতত্র ময়লা ফেলে পরিবেশকে হুমকির মুখে না ফেলি।’

বিশ্ববিদ্যালয়কে ময়লা-আবর্জনা মুক্ত রেখে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসম্য বজায় রাখার লক্ষ্যে 'জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা' ও 'গ্রামীন শক্তি'র হাত ধরে ২০১২ সালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে  ক্যাম্পাসের বর্জ্য ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী  অরুণা পল্লী ও বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ প্রায় ৫শ' উৎস থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে পচনশীল বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করা হতো। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান বাবুল বলেন, ‘ আমরা বিষয়টি দেখব। যেখানে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে সেখান থেকে পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করব।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা ক্যাম্পাসের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে থাকে। এস্টেট শাখাকে বলে দিচ্ছি কোথায় ময়লা-আবর্জনা থাকলে তা যেন দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলা হয়। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেনি। তবে আমরা ভাবছি সুষ্ঠু সমাধানের জন্য।’