সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে বাবাকে কেমোথেরাপি দিতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার বিভাগে এসেছেন সিদ্দিক গাজী। পরিবারে উপার্জনক্ষম তিনি ও তার দুই ভাই। তারা সবাই কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
সিদ্দিক গাজী বলেন, গত ছয় মাস আগে তার বাবা হুসাইন গাজীর (৭২) ক্যান্সার ধরা পড়ে। তার বাবাকে ছয় মাসে ছয় বার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবার কেমোথেরাপি দিতে পরীক্ষা ও ওষুধসহ ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। তবে প্রতিবারই কোম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে এসব ওষুধ কিনতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধই দেওয়া হয় না। কেমোথেরাপি ছাড়া অন্যকোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না।
সিদ্দিক গাজী আরও বলেন, হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে কেমোথেরাপির পর এখন রেডিওথেরাপি দিতে হবে। সেজন্য ঢাকার সাভারে ইনাম মেডিকেল হাসপাতালে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার বলেছে সেখানে এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু এত টাকা কোথায় পাব?
লিভারে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন খুলনার মহেশ্বরপাশার বাসিন্দা অনামিকা রায় (৫৮)। তার স্বজনরা বলেন, সরকারি হাসপাতাল হিসেবে কিছু ওষুধ পেলে রোগীও তার স্বজনরা বেঁচে যেতেন। প্রতিবার কেমোথেরাপি দিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করা লাগে। এছাড়া খুলনায় রেডিওথেরাপি হয়না। সেটি ঢাকা বা ভারতে গিয়ে করতে মোটা অঙ্কের টাকা দরকার হয়।
শুধুই হুসাইন গাজী বা অনামিকা রায়ই নয়, ক্যান্সারের চিকিৎসা খুলনা বিভাগে নাগালের বাইরে থাকায় প্রতিনিয়তই এই অঞ্চলের হাজার হাজার রোগী ও স্বজনরা এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর রেডিওথেরাপি ও অনকোলজি বিভাগ (ক্যান্সার ইউনিট) চালু হয়। ইউনিটে ৮টি শয্যা রয়েছে। বহির্বিভাগ হিসেবে পরিচিত এই ইউনিটে শুধু কেমোথেরাপি, নতুন রোগী দেখা ও ফলোআপ কার্যক্রম চলে। এ ইউনিটে ৫ জন ডাক্তার ও ৩ জন সেবিকা নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিবছর সেখানে রোগীর চাপ বাড়ছে। বছরে গড়ে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ হাজারের মতো রোগী সেখানে সেবা নেন।
সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, কেমোথেরাপি ছাড়া হাসপাতাল থেকে তেমন সহযোগিতা করা হয় না। রোগীদের সরকারিভাবে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। প্রত্যেক রোগীকে নির্দিষ্ট কোম্পানির কেমোথেরাপির ওষুধের লিস্ট দেওয়া হয় চিকিৎসকের রুম থেকেই। লিস্টের নিচে দেওয়া ওই কোম্পানির প্রতিনিধির ফোন নম্বর। তাদের ফোন করে বাড়তি দামে রোগীদের ওষুধ কিনতে হয়। তা ছাড়া কেমোথেরাপির পর রোগীদের রেডিওথেরাপি দিতে হয়। সেটা খুলনার বাইরে করা অনেক ব্যয়বহুল। আস্তা সংকটে অনেক রোগী চিকিৎসায় ভারতে যেতেও বাধ্য হচ্ছেন।
খুমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. হুসাইন শারাফাত বলেন, ক্যান্সার রোগীদের জন্য হাসপাতালে আলাদা একটি ইউনিট রয়েছে সত্যি। তবে সেখানে শুধুই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানায়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবে ক্যান্সার ইউনিটে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। ক্যানসারের চিকিৎসায় ২০১২ সালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি শক্তিশালী রেডিওথেরাপি যন্ত্র দেওয়া হয়েছিল। ২৪ কোটি টাকা দামের লিনিয়র অ্যাকসেলেটর যন্ত্রটির বাক্সও খোলা হয়নি।
খুমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. হুসাইন শারাফাত বলেন, যন্ত্রটি স্থাপনের জন্য যে অবকাঠামো ও যন্ত্রটি চালানোর মতো দক্ষ জনবল এই হাসপাতালে নেই। সেজন্য বাক্সবন্দি থেকে গেছে। তবে একশত শয্যার ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ কাজ চলছে। সেটি চালু হলেই সব সমস্যার সমাধান ঘটবে।
বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল
১৭৫ কোটি ৭২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে বিভাগীয় শহরে সরকারি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অভ্যন্তরে নির্মিত হচ্ছে একশত শয্যার একটি ক্যানসার হাসপাতাল। এই ভবনে শুধু ক্যান্সার রোগীদের সেবাই নয়, সেবা পাবে কিডনী ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরাও। ভবণে ২টি বেজমেন্ট ও ১৫ তলা ভবনসহ ১৭ তলা পাইল ফাউন্ডেশন হবে। বেজমেন্ট-২ থেকে ৭ম তলা পর্যন্ত হবে ক্যান্সার ইউনিট। এতে থাকবে লিনিয়র এক্সলেটর, সিটি সিমুলেটর, ব্রাকিথেরাপি, কেমোথেরাপি।
এছাড়া ৮ম তলা থেকে ১১তলা পর্যন্ত হবে কিডনী ইউনিট। এখানে থাকবে কিডনী ডায়ালাসিস ইউনিট, কিডনী ট্রান্সপ্লান্ট ওটি, পোস্ট ট্রান্সপ্লান্ট ও আইসিইউ। আর ১২ তলা থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত হবে হৃদরোগ ইউনিট। এই ইউনিটে থাকবে সিসিইউ, আইসিইউ, কার্ডিয়াক ওটি, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি ও ক্যাথ ল্যাব।
ভবণ কাজ বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত বিভাগ-১। এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার বিশ্বাস জানান, ভবন নির্মাণে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের চুক্তি হয়েছিল ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর। ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ মেয়াদে কাজ এগিয়েছে ৩৫ শতাংশ।
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও নানা কারণে বাস্তবায়ন কাজে অগ্রগতি কম। তবে বর্তমানে কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে বর্ধিত এই মেয়াদে কাজ সমাপ্ত হবে।