পাবনার বেড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনা মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানায় ধামাচাপা চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে চাকলা ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। গত ৩১ জানুয়ারির এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় রবিবার থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী, গ্রেপ্তার হয় অভিযুক্ত।
স্থানীয়রা জানান, প্রধানমন্ত্রীর উপহারে গত বছর আগস্ট মাসে পাবনার বেড়া উপজেলার চাকলা আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ২ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে সুখের বসতি গড়েন ভূমিহীন দরিদ্র এক চা দোকানি। তবে, সেই সুখের সংসারে হঠাৎ এক ঝড়ে যেন নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা।
চা দোকানির অভিযোগ, গত ৩১ জানুয়ারি দুপুরে প্রতিবেশী শফিকুল ঘরে ঢুকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে তার স্ত্রীকে। বাড়িতে এসে তিনি দরজায় ধাক্কা দিলে পালিয়ে যায় শফিকুল। বিচারের আশায় স্বামীকে সাথে নিয়ে ওই দিনই চাকলা ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদারের কাছে যান ভুক্তভোগী নারী। তবে, মামলা বা আইনি সহযোগিতার পরিবর্তে সালিশ ডেকে অভিযুক্ত শফিকুলকে মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা, নাকে খত ও কান ধরে উঠবস করিয়ে জোরপূর্বক মীমাংসা করে দেন ইদ্রিস চেয়ারম্যান। এমন সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালে চেয়ারম্যান ভয়-ভীতিও দেখান, অভিযোগ ভুক্তভোগীর।
ভুক্তভোগী নারীর স্বামী জানান, গত রবিবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে চাকলা ইউনিয়ন পরিষদে সালিশ বৈঠকে বসে ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী। এরপর কয়েকজন ইউপি সদস্যসহ তার অনুসারীদের নিয়ে একটি সালিশি বোর্ড গঠন করে বিচারকার্য পরিচালনা করেন ইউপি চেয়ারম্যান। ধর্ষককে জুতা পেটা, নাকে খত ও কান ধরে উঠাবসা করার শাস্তি দেন ওই সালিশি বোর্ড। একইসাথে অভিযুক্ত ধর্ষককে এক হাজার টাকা জরিমানা করে মীমাংসা করে দেন ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদার। কিন্তু ভুক্তভোগী নারীর স্বামী তৎক্ষণাৎ এ মীমাংসা মেনে না নিয়ে থানায় মামলা করার কথা বললে তাকে হুমকি দিয়ে মামলা করতে নিষেধ করেন চেয়ারম্যান।
ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বলেন, আমার স্ত্রীর ইজ্জতের দাম এক হাজার টাকা নির্ধারণ করে রায় দেন ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদার। রায় দেওয়ার সাথে সাথে আমি জানিয়েছি, এ রায় মানি না। আমি থানায় মামলা করব। তখন চেয়ারম্যান ধমক দিয়ে বলেন, এতবড় সাহস তোর, আমার রায় মানিস না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে রটিয়ে দেব বউ দিয়ে ব্যবসা করে খাস। এছাড়া গালাগালি ও নানারকম হুমকিও দেন চেয়ারম্যান। আমার স্ত্রীকে জোর করে ধর্ষণ করেছে শফিকুল। তার শাস্তি না দিয়ে উল্টো তার পক্ষ নিয়ে আমার সাথে অন্যায় করা হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে। এরপরও আমি থানায় মামলা করেছি। পরে পুলিশ ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমিজমাসংক্রান্তসহ নানা ঝামেলার মীমাংসা করতে স্থানীয়রা চাকলা ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদারের শরণাপন্ন হলে উভয় পক্ষকে জিম্মি করে টাকা খেয়ে সালিশ করে থাকেন। সালিশে স্বজনপ্রীতি ও টাকা খেয়ে অন্যায়ের পক্ষে রায় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ধর্ষণের বিচার কোনো সালিশি বৈঠকে সম্পন্ন করার বিধান নেই জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। এ ব্যাপারে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আহসান হাবিব বলেন, ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ। এটি গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া সালিশি রায়ে অভিযুক্তকে কায়া শাস্তি (শারিরীক শাস্তি) দেবার এখতিয়ারও কারো নেই। এদিক থেকে এ সালিশি কার্যক্রম সঠিক হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ হোসেন বলেন, ধর্ষণ অপরাধের মীমাংসা এক হাজার টাকা জরিমানায়। এটি কোনোভাবেই সঠিক মীমাংসা হতে পারে না। এছাড়া এটি ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের জন্য খুবই দুঃখজনক।
অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে চাকলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদার বলেন, উভয় পক্ষের সম্মতিতে সালিশ করা হয়েছে। সালিশি কাগজপত্রে স্বাক্ষরও করেছেন তারা। এর বাইরে একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারাই এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরছে।
বেড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্যদের পুলিশকে অবহিত করার দায়িত্ব রয়েছে। সালিশের এখতিয়ার কারো নেই। সালিশ বা মীমাংসার বিষয়েও তদন্ত চলছে। এক্ষেত্রে অনিয়ম হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।