বিশ্ববিদ্যালয় মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে জ্ঞানচর্চা, সংরক্ষণ এবং আদান-প্রদান হয়। এই জ্ঞান মানুষের উৎকর্ষে কাজে লাগে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়, যার নামকরণেই বোঝা যায় যে, এমন একটি স্থান, যেখানে জ্ঞানপিপাসু ছাত্র ও শিক্ষকরা মিলিত হন। বিশ্ববিদ্যালয় সার্থক হয়ে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যে। কিন্তু, দেশ রূপান্তরের এক সংবাদে জানা যায় যে, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) নাকি ১২ মাসের মধ্যে সাত মাসই বন্ধ থাকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের বেরোবির অ্যাকাডেমি ক্যালেন্ডার অনুসারে সাপ্তাহিক ছুটি, সরকারি ছুটি, বিশেষ দিনের ছুটিসহ বন্ধ থাকবে ২০১ দিন।
এমনিতেই এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সপ্তাহে দুদিন ছুটি থাকে। বছর জুড়ে নানা রকম অন্য ছুটি তো আছেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ছুটি। মানে, বছর জুড়ে আরও ৫২টা দিনই ছুটি। এই প্রথা চালু হয়েছে ২০২২ সাল থেকে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়। এর দোহাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, সশরীরে পাঠদান, পরিবহন সেবা, মেডিকেল সেবা, লাইব্রেরিসহ অন্য সবকিছু বন্ধ রাখা হয় প্রতি বৃহস্পতিবার।
একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নামে সপ্তাহে একদিন করে বাড়তি বন্ধ রাখাটা বিস্ময়কর। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চিতভাবেই কলকারখানার মতো বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় না। এমনিতেই আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা মূলত সার্টিফিকেট অর্জন এবং তা দিয়ে চাকরি পাওয়ার মূল উপায়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে ছাত্রদের আরও কম কম শ্রেণিকক্ষে যাওয়াটা শিক্ষাকে আরও বেশি শিক্ষার মূল ধারণা থেকে দূরে নিয়ে যাবে।
তবে প্রতিবেদন অনুসারে জানা গেছে, সমস্যা আরও আছে। প্রশাসনিক ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বৃহস্পতিবার ঠিকই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, বর্তমান ব্যবস্থায় যেনতেনভাবে পরীক্ষা নিয়ে সেমিস্টার শেষ করাই এর প্রধান কারণ। এতে, একে তো ছাত্ররা কম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে যারা দূর থেকে আসেন তারা বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চালু না থাকায় বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে বেরোবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি বিজন মোহন চাকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তীব্র শিক্ষক সংকটের পরও বৃহস্পতিবার আমরা ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছি, যেন কোনো জটের মধ্যে না পড়ি। বৃহস্পতিবার বন্ধের ফলে সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তা ছাড়া আমরা এর ফলে জট নিরসন এবং সরকারের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হতে পেরেছি। মূলত যেসব জায়গায় আর্থিক ব্যয় বেশি হয়, সেখানে আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধনের জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া।’ প্রায় একইরকম কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মজিব উদ্দিন আহমদ। তিনি জানান কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্তটি সরকারের, এই বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই।
বিজয় মোহন চাকীর কথা থেকে আরও একটি বিষয় বোঝা গেল যে, দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংকট রয়েছে। ট্রেজারার নিশ্চিত করেন যে, সরকার কৃচ্ছ্রসাধন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরই খড়গহস্ত হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে কোনোভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যেনতেনভাবে চালানোর জন্যই?
বেরোবির মতো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম নানা অসংগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অনেক স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলেও সেগুলো আদতে কীভাবে চলছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রায়শই। উচ্চশিক্ষা নিয়ে এমন অবহেলা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।